রাতের বেলায় রাতের অন্ধকারে এলাকাটার অবস্থা বোঝা সম্ভব হয়নি। সময় ৯টা।
গোটা এলাকা জঙ্গলাকীর্ণ। ঝোঁপঝাড়, আর গাছ-গাছালীতে ঠাসা গোটা এলাকা। ভোরের আলো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ায় তারা জায়গাটি ভালোভাবে দেখতে পেল। এলাকাটি বলতে গেলে সমতল জঙ্গল। টিলা পাহাড়ের কোন চিহ্ন তাদের নজরে পড়লো না।
অনেকক্ষণ ধরে শিলা ও লক্ষণ পাশাপাশি হাঁটছে কিন্তু কেউই কোন কথা বলছে না। এক সময় লক্ষণকে থামিয়ে শিলা জিজ্ঞেস করলো
তুমি নীরব কেন লক্ষণ? অত্যধিক নীরবতা আতংকের লক্ষণ! তুমি কি ভয় পাচ্ছে?
ভয় নয় শিলা! থেমে শিলার আপাদমস্তকের দিকে একবার দৃষ্টি ফিরিয়ে বললো লক্ষণ। আমি একটা ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করছি।
কি নিয়ে চিন্তায় পড়েছে।
ভাবছি তুমি এমনিতেই সুন্দর। এর উপর এই উপজাতীয় পোশাকে তোমাকে কেমন দেখাচ্ছে তা বলে বুঝাতে পারবো না। আমার প্রশিক্ষক আমাকে বলেছিলেন, মানুষ যদি তার স্বভাবজাত অবস্থায় থাকে তবে বৃদ্ধ হলেও তার স্বাস্থ্য চেহারায় এতটুকু প্রভাব পড়ে না। শরীর সম্পূর্ণ অটুট থাকে। আকর্ষণীয় দেহাবয়ব অক্ষুণ্ণ থাকে। আমার মন বলছে, আমরা যদি এই বেশে, এই ঘৃণা, হিংসা, যুদ্ধ বিগ্রহের দুনিয়া ছেড়ে এমন জঙ্গলে নিরিবিলি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতাম!….
আমি কখনো কল্পনাও করিনি শিলা! তোমার চুল এতোটা রেশমী ও সুন্দর। তুমি রূপসী ঠিক, তাই বলে এমন অনিন্দ সুন্দুরী তা ধারণা করতে পারিনি। তোমার রূপের বর্ণনা দেয়ার মতো ভাষা আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
লক্ষণের এই কথায় শিলার মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না। সে যেমন ছিলো তেমনই রইলো। লক্ষণ রূপের এই যাদুকরী প্রতিমাকে তার বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নেয়ার জন্য তার দিকে দু’হাত প্রসারিত করল। কিন্তু শিলা দু’হাত পিছনে সরে গেল।
আবেগতাড়িত না হয়ে স্বাভাবিক হও লক্ষণ! অত্যন্ত দৃঢ় ও গম্ভীর কণ্ঠে বললো শিলা। লক্ষণ! স্মরণ করো, আমরা কোন উদ্দেশ্যে কি কাজে এখানে এসেছি। নিজের পৌরুষ ও বীরত্বের উপর নারীর রূপ সৌন্দর্যকে সাওয়ার করো না লক্ষণ। ভুলে যেয়ো না, আমরা মৃত্যুর সাথে খেলা করতে এসেছি।
আমি আমার কর্তব্য বিস্মৃত হইনি রাজকুমারী! আমি জানি, আমরা মৃত্যুর খেলায় নেমেছি। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, তোমার মতো অস্পরীকে নিয়ে মুসলমানরা খেলায় মেতে উঠবে।
হঠাৎ আবেগাপ্লুত হয়ে লক্ষণ বললো–
তোমরা এখানেই থাকো শিলা! আমি একাকী মথুরা যাবে। একাকী গিয়ে সোজা আরব বাহিনীর সেনাপতি মাহমূদকে হত্যা করবো। তোমরা এখান থেকেই ফিরে যাও। আমি একাই মরতে যাবো। কিন্তু যাবার আগে শিলা! একবার, শুধু একটি বার একটু সময়ের জন্য আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি ভয় পাচ্ছি শিলা! আমি আমার মুত্যুকে ভয় পাচ্ছি না, ভয় পাচ্ছি ওরা আমাকে হত্যা করে যখন রাধাকে ও তোমাকে নিয়ে যাবে সে সময়টার কথা ভেবে!
লক্ষণ! দূর হও এখান থেকে। বুঝতে চেষ্টা করো, আমি তোমার কাছে নিজেকে বিক্রি করে দেইনি। আমি তোমার সঙ্গ দিয়েছি একটি মহান উদ্দেশ্যে। এই উদ্দেশ্য সাধিত হলে আমি নিজেই নিজেকে তোমার পায়ে সোপর্দ করবো। কিন্তু এখন নয় লক্ষণ! তুমি জানো না, একবার যদি তোমার শরীর আমার চুল ও দেহের স্পর্শ পায়, তবে তুমি সব কর্তব্য ভুলে যাবে।
লক্ষণ! আমার চোখে তুমি গযনীর সুলতানকে দেখো, আমার চেহারায় আমার আত্মমর্যাদাবোধ দেখো। যাও লক্ষণ! নদীর তীরে গিয়ে কোন নৌকা আছে কি না তা দেখো, ভুলে গেলে চলবে না, আমাদেরকে যতো শিগগির সম্ভব নদী পার হয়ে যেতে হবে।
শক্ত সুঠাম দেহের অধিকারী যথার্থ সুপুরুষ লক্ষণ। তার শরীরে গঠনই বলে দেয় তরবারী ও অশ্বচালনায় পারদর্শী যুবক সে। শিলার কথায় তার দেহের ঘুমন্ত পৌরুষ সচেতন হয়ে উঠলো, শিলাকে এক দৃষ্টিতে আপাদ মস্তক দেখে বললো–
ঠিক আছে শিলা! আমি তোমাকে হতাশ করবো না। যে কোন ভাবে নৌকার ব্যবস্থা করে এখনই আসছি আমি।
এই বলে শিলাকে পিছনে রেখে সামনের দিকে দৌড়াতে লাগলো লক্ষণ। ঠায় দাঁড়িয়ে শিলা লক্ষণের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাছ-গাছালির আড়ালে হারিয়ে গেল লক্ষণ।
হঠাৎ পেছনে কোন মানুষের পায়ের শব্দ পেল শিলা। নির্ভয়ে নিরুদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে পেছন ফিরে তাকাল শিলা। শিলা ভাবছিল এই বিজন জঙ্গলে এ সময়ে কে থাকতে পারে! মথুরা এখান থেকে বিশ পঁচিশ মাইল দূরে অবস্থিত। মুসলমান সৈন্যরা সেখানে অবস্থান করছে। কিন্তু এখানে কোন জন মানুষের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা না থাকলেও বাস্তবে একজন লোক বিস্ফারিত দৃষ্টিতে শিলার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসছে। লোকটির চেহারায় কালো দাড়ি। এই এলাকার পোষাকেই লোকটি সজ্জিত। ভরাট চেহারার সবল সুঠাম দেহী একজন যুবক। লোকটি পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে একেবারে শিলার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।
শিলা! আমি ভুল করছিনা তো? তুমি কি মুনাজের রাজা রায়চন্দ্রের বোন শিলা না? তুমি তো কোন উপজাতি না। এইমাত্র যে লোকটি তোমার কাছ থেকে চলে গেল সে কি লক্ষণ নয়? গতকাল থেকেই আমি চুপি চুপি তোমাদের লক্ষ্য করছি।
আচ্ছা! তাই নাকি? তুমি কে? খুবই স্বাভাবিক কণ্ঠে জানতে চাইলো শিলা।
লোকটি তার দাড়িতে হাত বুলিয়ে দাড়ি খুলে ফেললে একজন টগবগে যুবকের চেহারা বেরিয়ে এলো। দেখতে হুবহু লক্ষণের মতো।
