রাজা জয়পাল তন্মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটির বাজু ধরে পণ্ডিতকে বলল, একে বলিদান করুন।
‘আমি আপনার পায়ে জীবনোসর্গ করতে প্রস্তুত মহারাজ’ স্বগতোক্তি করল মেয়েটি। আমি দেবীর পদতলে জীবন উৎসর্গ করবো তাতে আপত্তির কী আছে! কিন্তু মহারাজ! আমি যে কুমারী নই।
তোমার বিয়ে হয়েছে, তবে মন্দিরে এলে কেন?
“আমি কারো বিবাহিতা স্ত্রী নই মহারাজ। এই মন্দিরের দাসী। কিন্তু পণ্ডিতজী আমার সতীত্ব…।” অপকটে বললো মেয়েটি।
বলিদানের জন্যে একটা বিশেষ ধরনের দৈহিক গড়ন, অঙ্গসৌষ্ঠব আর কুমারী নারী দরকার মহারাজ! মেয়েটির কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল বড় পণ্ডিত। এই গুণ এখানকার কুমারীদের মাঝে অনুপস্থিত। বলিদানের জন্যে উপযুক্ত মেয়ে আমরা খুঁজে নেব, এজন্য আপনি নিশ্চিত থাকুন। সেই কুমারীকে আমরা এই চাঁদের পূর্ণিমা থেকে আগামী চাঁদের পূর্ণিমা পর্যন্ত আমাদের হেফাযতে রাখব। ওকে বিশেষ ধরনের খানা, বিশেষ পোশাক পরাতে হবে এবং বিশেষ ধরনের তালিম দিতে হবে। সে নিজে থেকেই বলি হওয়ার জন্য আর্জি পেশ করতে থাকবে। সে আপনার আকাক্ষা সফলের জন্য আশীর্বাদ করবে। তাকে এখানে নয় একটা বিশেষ স্থানে নিয়ে বলীদান করা হবে মহারাজ!
এ কাজ খুব জলদি হওয়া দরকার। বলল রাজা।
আপনি বলিদানের ইচ্ছে ব্যক্ত করার সাথে সাথেই দেবতা খুশি হয়ে গেছেন। তার রাগ কমে গেছে। দেখলেন না, আপনি বলিদানের কথা বলার সাথে সাথে দেবতা শান্ত-নিরব। বন্ধ হয়ে গেছে গর্জন। থেমে গেছে ঝড়। আকাশ একেবারে পরিষ্কার।
রাজা জয়পাল মন্দির থেকে বেরিয়ে গেল। বলি হওয়ার ভয়ে মেয়েদের চেহারা পার বর্ণ ধারণ করেছিল। এরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। পণ্ডিতের কথায় অন্য কুমারী বলিদানে রাজা সম্মতি দিল। এরা রাজার কথায় আশঙ্কা করছিল, না জানি তাদের মধ্যে কাউকে আবার বলিদানের শিকার হতে হয়।
আজ তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে, কেন আমরা তোমাদের কুমারীত্ব নষ্ট করেছি। না হয় আজ তোমাদেরই বলি হতে হতো। নির্লজ্জের মত বলল বড় পণ্ডিত। কুমারীত্ব নষ্ট না করলে একের পর এক তোমাদেরকেই বলিদান বরণ করতে হতো। তোমরা তোমাদের শরীর বলিদান করে জীবন দান থেকে মুক্তি লাভ করেছে। বড় পণ্ডিত কুমারীদের উদ্দেশে এমন গম্ভীরভাবে কথাগুলো বলছিল, যেন সে বেদ পুরানের কোন শ্লোক আবৃত্তি করছিল।
রাজা জয়পালের বহর ভারী বর্ষণের ফলে কাদা-মাটির মধ্য দিয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে রওয়ানা হল। রাজার প্রস্থানে তার রক্ষী-প্রহরী সৈন্যরা মন্দির এলাকা ত্যাগ করল। বড় পণ্ডিত কুমারীদের পিছনের কামরায় চলে যেতে নির্দেশ দিয়ে নিজেও সেই কামরায় প্রবেশ করল। সদর গেট বন্ধ করে দেয়া হল।
রাজা যখন মন্দিরে গেলো তখন গজনীর দুই বন্দীকে রাজপ্রাসাদে আনা ল। রাজার হুকুম ছিল এখানে এদের হাজির করার। রাজার ফেরায় বিলম্ব দেখে একটি ঘরে তাদের বসিয়ে দেয়া হল। রাজার হুকুম ছিল, ওদেরকে কয়েদখানায় বিমানের আহার না দিয়ে ভাল আহার দেবে, আরাম বিছানার ব্যবস্থা করবে।
রাজার চেষ্টা ছিল ওদের প্রতি একটু সদয় ব্যবহার করে মুসলিমদের যুদ্ধ জয়ের গোপন রহস্য উদ্ধার করার। কারণ, রাজার কাছে তাদের যুদ্ধ কৌশলের রহস্য বলতে এরা অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
রাজা তার জেনারেলদের বলেছিল, বন্দীদেরকে আরাম-আয়েশে রেখে তাদের মন জয় করার মাধ্যমে রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করতে হবে। তাতেও যদি কাজ না হয় তবে কঠিন শাস্তি দিয়ে ওদের পেট থেকে রহস্য বের করে আনতে হবে।
তাদের জন্যে যখন আহার আনা হল তখন তারা বলল, এই খাবার কে বেঁধেছে? তাদের বলা হল, রাজ মহলের বাবুর্চিরা পাকিয়েছে এই খাবার। তারা বলল, তারা কোন হিন্দুর পাকানো খাবার খাবে না। তাদেরকে কোন মুসলমানের রান্না করা খাবার দেয়া হোক এবং খাবার কোন মুসলমানকে দিয়ে পাঠানো হোক। রাজার যেহেতু নির্দেশ ছিল মেহমানের মতো এই দুই বন্দীর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার, তাই রাজমহলের খানা ফিরিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ পর এক মুসলমানকে দিয়ে খাবার পাঠানো হল। বন্দীরা যখন নিশ্চিত হল, খানাবাহক প্রকৃতই মুসলমান তখন আগ্রহভরে আহার করল।
ওরা যখন আহার করছিল, তখন পাহারাদার সিপাই ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার পাশে চলে গিয়েছিল। এরা শিকলে বাঁধা, তাই পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল না। আহার বহনকারী মুসলমান কর্মচারী আহাররত বন্দীদের পাশে বসল। সে আড়চোখে দেখে নিল, প্রহরী ঘরের বাইরে চলে গেছে। সে নীচু স্বরে ফারসীতে বলল, তোমাদের খুব আদর-যত্ন করা হচ্ছে এই ভেবে তোমরা খুশি হয়ে যেয়ো না। এমন ব্যবস্থা ওসব বন্দীর বেলায়ই নেয়া হয় যাদের কাছে দামী কোন রহস্য থাকে।
উভয় বন্দী গভীরভাবে ওকে দেখল।
খানাবাহক বলল, আমার দিকে তাকিয়ো না, খানার দিকে চোখ রেখে নিঃশব্দে কথা বলো। এরা দেখলে সন্দেহ করবে, আমি তোমাদের লোক। যদি তোমাদের কাছে সত্যিই কোন রহস্য থাকে তবে তা কখনও প্রকাশ করো না, কিন্তু ওদের লোভ দেখাবে। ওদের ধোকা দিয়ে আস্থা অর্জন করো, যাতে ওরা তোমাদের পায়ের ডাণ্ডাবেড়ি ও কোমরের শিকল খুলে দেয়। সুযোগ পেলেই আমি তোমাদের পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবো। দেখো কোন প্রলোভনে পড়ে গোপন তথ্য ফাঁস করো না যেন। তাহলে তোমরা ফেঁসে যাবে। একবার ফেঁসে গেলে আর রক্ষা পাবে না। এমন কঠিন শাস্তি দেবে পরাণ ঠোঁটের সাথে ঝুলে থাকবে। মরেও মরবে না।
