আপনাদেরকে মনে রাখতে হবে, হিন্দুস্তানের হিন্দুরা যদি নির্বিবাদে রাজত্ব করতে পারে তাহলে এখানকার মুসলমানরা কিছুতেই তাদের ঈমানী অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকতে পারবে না। এই দেশ সব সময়ই মুসলমানদের জন্যে বধ্যভূমি হয়ে থাকবে। আপনারা সাধারণ যোদ্ধাদের বুঝিয়ে দেবেন, তোমাদের আগে এখানে যুদ্ধ করতে এসে যে সব মুসলমান যোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেছে যাদের মৃত লাশ পর্যন্ত দেশের মাটিতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তোমাদেরকে তাদের শাহাদাঁতের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
আমি আপনাদের সতর্ক করতে চাই, হিন্দুস্তান খুবই বিভ্রান্তিকর জায়গা। এখানকার প্রতিটি মানুষ একেকটি জীবন্ত ধোকা। এখানকার মাটি মানুষ, ভূপ্রকৃতি, সব কিছুই যে কোন যোদ্ধাকে যে কোন সময় ধাঁধার মধ্যে ফেলতে পারে। আপনারা এখানকার নারীদের দেখেছেন। এদের রূপ যে কোন যোদ্ধাকে বিভ্রান্ত করতে পারে। আমাদের সৈন্যরা যাতে এখানকার নারীদের রূপসৌন্দর্যে বিভ্রান্ত না হতে পারে এ ব্যপারে প্রতিটি মুহূর্তে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। নারীর রূপজৌলুসে মত্ত কোন সেনাদল কখনো বিজয় লাভ করতে পারে না। আপনারা প্রতিটি সৈনিকের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দিন। সিপাহী হোক আর অফিসার হোক যেই আল্লাহর নাফরমানী করবে, আমি সাথে সাথে তাকে আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দিবো। এমনটি হলে পুরস্কারের পরিবর্তে পরকালে তাকে আগুনে জ্বলে পুড়ে ধ্বংস হতে হবে। কেউ কোন নারী কেলেংকারী করলে তার শাস্তি হবে নির্ঘাত মৃত্যুদণ্ড।
ইমাম ও খতীবগণকে বিদায় করে দিয়ে সুলতান মাহমূদ সেনা কমান্ডার ও সেনাপতিদের সামনে মথুরা থেকে কনৌজ পর্যন্ত মানচিত্র মেলে ধরে দেখালেন, কোন পথে তাদের যেতে হবে। চূড়ান্ত অভিযানের পরিকল্পনা করার আগেই তিনি তার বিশেষ গোয়েন্দাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নিয়ে ছিলেন। গোয়েন্দা তথ্য ছাড়াও তিনি সেনাবাহিনীর কয়েকজন কমান্ডারকে ছদ্মবেশে কনৌজ পাঠিয়েছিলেন পথ ও পারিপার্শিক অবস্থা সরে যমীনে দেখে আসার জন্য। সেনা অফিসারদের উদ্দেশ্যে মানচিত্র দেখিয়ে সুলতান বললেন
আমাদের গমন পথে মুনাজ নামের একটি ছোট্ট রাজ্য রয়েছে। এটি রাজপুতদের আবাসস্থল। রাজপুতেরা খুবই সাহসী ও লড়াকু জাতি। যুদ্ধ বিগ্রহে হিন্দুস্তানের অন্য কোন জনগোষ্ঠী এদের মোকাবেলা করতে পারে না। এদেরকে আগেই বাগে আনতে হবে। নয়তো আমরা যখন কনৌজ অবরোধ করবো তখন ওরা আমাদের পেরেশান করে তুলবে। তিনি আরো জানালেন, গোয়েন্দাসূত্র জানিয়েছে, লাহোরের রাজা ভিমপাল ছদ্মবেশে এই এলাকায় অবস্থান করছে। সে এই অঞ্চলের ছোট্ট বড় রাজা মহারাজাদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার জন্যে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ভিমপালের ছোট্ট ভাইও তার সাথেই রয়েছে। ভিমপালকে জীবন্ত গ্রেফতার করতে হবে। খবর এসেছে, ভিমপালের সেনাবাহিনীও এদিকে রওয়ানা হতে যাচ্ছে। আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে।
মথুরা বিজয়ের সপ্তম দিনে সুলতান মাহমূদ কনৌজে রওয়ানা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। যুদ্ধকালীন সরবরাহ ব্যবস্থা সফল রাখার জন্য তিনি মথুরায় কিছু সৈন্য রাখলেন এবং যারা যুদ্ধে নিজেদের বীরত্ব প্রদর্শনে আগ্রহী সেই সব উৎসাহী সৈন্যদেরকে অভিযানের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিলেন।
* * *
এ দিকে রাত পেরিয়ে সকালের সূর্য তখন পূর্বাকাশে উঁকি দিচ্ছে। ঠিক সেই সময় কনৌজের রাজপুত্র লক্ষণ, শিলা, রাধা ও তার সহযোগী দুই সৈনিককে নিয়ে মহাবনের জঙ্গলের পাশে পৌঁছাল। তাদের প্রত্যেকের গায়ে বিশেষ ভাবে তৈরী উপজাতীয় পোষক। লক্ষণের গায়ে গোত্রপতির বিশেষ ধরনের পোশাক। মহাবনে পৌঁছাতে পথিমধ্যে তাদের দু’রাত কাটাতে হয়েছে। এই বনের মধ্যেই তৃতীয় রাতটি কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলো তারা।
সময়টা ছিল অগ্রহায়নের শেষ ও পৌষের শুরু। প্রচণ্ড শীত। তারা এসে যে জায়গাটায় থামলো সেই জায়গাটি রাত হয়ে যাওয়ার কারণে ঠিক মতো দেখে নিতে পারেনি। যমুনা নদী এখান থেকে দূর দিয়ে প্রবাহিত হলেও এসে এখানকার বন-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বাঁক দিয়ে ঘুরে গেছে। জঙ্গলের ভেতরকার নদীটা অনেকটাই ঝিলের মতো। এখানে তেমন স্রোত নেই। নিথর শান্ত পানি। চারদেিক ঘনঝোঁপ ঝাড়। জঙ্গলী পশুদের মধ্যে এখানে জলহস্তিদের বেশী বসবাস। অত্যধিক শীত ও ঠান্ডার প্রকোপ না থাকলে এতোক্ষণে এদেরকে জলহস্তী গ্রাস করে ফেলতো।
এখানে এসে লক্ষণপালের ছোট্ট দলটি রাত যাপনের জন্য একটি যুতসই জায়গা বেছে নিল। এবং সবাই টানা ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করার জন্য বিশ্রাম নিতে বিছানো করে শুয়ে পড়লো। রাধা শিলা ও লক্ষণপাল কাছাকাছিই বিছানা করল আর তাদের সাথে আসা দুই নিরাপত্তারক্ষী একটু দূরে বিছানা করে শুলে পড়ল।
সকাল বেলায় ওদের ঘুম ভাঙ্গার পর লক্ষণ বললো–
এখানে নদী পাড়াপাড়ের জন্য ভাড়াটে নৌকা পাওয়া যায়। আমাদেরেকে এখনই নদী পাড় হতে হবে। আমি নদীর তীরে গিয়ে দেখি কোন নৌকার মাঝি পাওয়া যায় কি না।
শিলা বললো, আমিও তোমার সাথে যাবে।
তোমাকে সাথে নেয়া ঠিক হবে না ।
ঠিক আছে তোমার সাথে যাবো না কিছু দূর গিয়ে জায়গাটা দেখে ফিরে আসবো।
লক্ষণ ও শিলা পাশাপাশি নদীর তীরের উদ্দেশ্যে হাঁটছিলো।
