রাতের প্রথম প্রহরে যার যার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে লক্ষণের কাফেলা মাহমূদ হত্যার অভিযানে কনৌজ থেকে রওয়ানা হলো। তারা সিদ্ধান্ত নিলো মহাবনের জঙ্গলে গিয়ে তারা যমুনা নদী পার হয়ে মথুরার সীমানায় প্রবেশ করবে। কনৌজ থেকে মহাবনের জঙ্গলের দূরত্ব ছিলো প্রায় শত মাইল। তাদের খাবার দাবার সামগ্রী দুটি গাঁধার উপর বহন করা হল। তারা সিদ্ধান্ত নিল, মহাবনের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে তারা মথুরা পৌঁছবে।
সুলতান মাহমূদ তখনো মথুরায় অবস্থান করছেন। মথুরা তার কাছে খুবই আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল। মথুরা ছিল অসংখ্য মন্দিরের শহর। বিজয় লাভের পর সুলতানের নির্দেশে মুসলিম সৈন্যরা মথুরার মন্দিরগুলোকে অগ্নি সংযোগ করছিলো। মথুরার প্রধান মন্দিরের আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে মুসলমান সৈন্যরা আযান দিয়ে জামাতে নামায আদায় করতে শুরু করেছিল। মথুরার হিন্দুরা এতোটা আত্মবিস্মৃত ছিলো না যে, তাদের চোখের সামনে তাদের দেবদেবী ও ধর্মের অবমাননা তারা নীরবে সহ্য করে নেবে। দেবদেবী ও মন্দির ধ্বংসের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে এর মধ্যেই কতিপয় হিন্দু কয়েকজন মুসলিম সৈন্যকে ধোকা দিতে আত্মহত্যা করে ফেললো। কিছু হিন্দু রাতের অন্ধকারে ধ্বংসাত্মক ঘটনাও ঘটালো। হিন্দুদের চক্রান্তের মূলোৎপাটন করতে সুলতান মাহমূদ নির্দেশ দিলেন যে, এই শহর ধ্বংস করা ছাড়া হিন্দুদের কাবু করা যাবে না। সুলতানের নির্দেশে তাই শহর ধ্বংসের কাজ শুরু হয়ে গেলো। অপর দিকে সুলতান তার সৈন্যদেরকে কন্নৌজের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্যে প্রস্তুত করতে শুরু করলেন।
একদিন দুপুরের দিকে সুলতানের সামনে তার সকল সেনা কর্মকর্তা, সেনাদের সাথে গযনী থেকে আসা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও ইমাম বসা ছিলেন। সুলতান ঘোষণা করলেন–
অচিরেই আমরা কল্লৌজের দিকে অগ্রসর হব। অভিযানের প্রস্তুতি ও অভিযান সম্পর্কে আপনাদের অবহিত করার আগেই আপনাদেরকে আমি কয়েকটি কথা বলা জরুরী মনে করছি। সকল সৈন্যকে একত্রিত করে বক্তৃতা করার সুযোগ এখানে নেই। আপনারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থ সেনাদেরকে আমার প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পৌঁছে দেবেন। যারা খতীব ও ইমাম আছে, তারা নামাযের পর আপনাদের মুসল্লীদেরকে আমার কথাগুলো সেদেবেন। আপনারা সৈন্যদেরকে বলবেন
চলমান যুদ্ধ আমার বা কারো কোন ব্যক্তিগত যুদ্ধ নয়। সেনাদেরও এর মধ্যে ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ জড়িত নেই। এটা রাজ্য দখলের লড়াইও নয়। নিতান্তই আমাদের এ অভিযান আল্লাহ ও রাসূলের জন্যে নিবেদিত অভিযান। আমরা এখানে কুফরীর সেই অভিশাপ দূর করতে এসেছি, যে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করো যতক্ষণ পর্যন্ত না এই কুফরীর সন্ত্রাস দূরীভূত হয়ে যায়।
আমি যদি বারবার হিন্দুস্তানে এসে হিন্দুদের উপর চড়াও না হতাম, তাহলে সব হিন্দু মিলে এতো দিনে গযনী দখল করে কাবা দখলের জন্য অগ্রসর হতে শুরু করতো। হিন্দুরা ছাড়া ইহুদীরাও বড় আপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। সব কিছু একসঙ্গে তো আর আমরা সামলাতে পারবো না। কিন্তু আমরা চেষ্টা করলে হিন্দুস্তান থেকে কুফরী দূরীভূত করে এটাকে ইসলামের যমীনে রূপান্তরিত করতে পারি এবং আমরা এ লক্ষ্যেই এখানে এসেছি।
রাজত্বের পরিধি বাড়ানোর কোন সিন্স আমার নেই। আপনারা দেখেছেন, লাহোরের মহারাজাদের কয়েকবার আমরা পরাজিত করেছি। কিন্তু আমাদের রাজ্যের সীমানা আমরা লাহোর পর্যন্ত বিস্তৃত করিনি।……
সকল সৈন্যকে এটা বুঝিয়ে দিন, আমরা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে এখানে এসেছি। আমরা এখানে আল্লাহর পয়গাম ও আমাদের ঈমান নিয়ে এসেছি এবং ঈমানকে লালন ও বিকাশ করছি এ জন্য তিনি আমাদের মদদ করছেন। আমার যদি সোনা দানা সহায় সম্পদের লোভ থাকতো, তাহলে বারবার এতো কষ্টকর অভিযানে আসার দরকার হতো না। একবারেই লুটতরাজ করে সোনাদানা কুক্ষিগত করে নিয়ে গিয়ে গযনীতে বসে আরাম আয়েশ করতে পারতাম। কিন্তু আপনারা দেখেছেন, প্রতিবারই আমি হিন্দুস্তানে আসি আমার জীবনের ঝুঁকিকে উপেক্ষা করে। প্রতিবারই আমার মনে হয় আমার পক্ষে আর গযনীতে জীবন্ত ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা প্রতিটি অভিযানেই আমাকে নতুন জীবন দান করেন। এতে আমার মনে হয়, হিন্দুস্তানে আত্মাহর দীন প্রতিষ্ঠার অভিযান আমরা শুরু করেছি, আল্লাহ হয়তো আমাদের হাতেই এর পূর্ণতা দেবেন।
এ মূহুর্তে আমি জানতে পেরেছি, কনৌজে আমাকে যে কোনভাবে হত্যা করার বহু নীল নকশা তৈরী করা হয়েছে। যে কোন মুহূর্তে যে কোন জায়গায় কিংবা আমার তাঁবুতে আমি নিহত হতে পারি। কিন্তু আল্লাহর প্রতি আমার শতভাগ ভসা আছে। আমার মন সাক্ষী দিচ্ছে অন্তত হিন্দুস্তানে আমি নিহত হবো না। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ইঙ্গিত। …..
আমি আবারো আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, প্রতিটি সৈন্যকে বলে দিন, নফল নামায রোযা থেকে জিহাদ শ্রেয়। আপনারা জানেন, নামায অবস্থায়ও যদি কারো সামনে সাপ এসে যায় তবে নামায ছেড়ে আগে সাপ মেরে ফেলার হুকুম রয়েছে। কেউ যদি মনে করে শুধু নামায রোযা ইবাদত বন্দেগী করে সে আল্লাহকে খুশী করে ফেলবে তবে সে বড় ভ্রান্তিতে রয়েছে। হিন্দুরূপী এ সব বিষধর সাপকে হত্যা করা ছাড়া আপনাদের কারো পক্ষেই আল্লাহকে খুশী করা সব নয়।
