তোমরা বহুরূপী বেশ ধারণের অর্থ হবে তুমি বনে জঙ্গলে বসবাসকারী কোন উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সর্দার।
তুমি যে গোত্রের গোত্রপতির বেশ ধারণ করবে, সেই গোত্রের লোক সংখ্যা পনেরো হাজার। তুমি সেখানে গিয়ে বলবে, কনৌজের মহারাজা তোমার গোত্রের সকল মানুষকে গযনী সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে নিজের পক্ষে নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সর্দার হিসেবে তুমি গযনী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে রাজি নও। গযনী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই না করে তুমি বরং রাজা হরিদত্তের মতো গোত্রের সকল লোকজনকে নিয়ে মুসলমান হতে চাও।
লক্ষণ! তোমাকে মনে রাখতে হবে, সরাসরি সুলতান মাহমূদ পর্যন্ত যেতে তোমাকে তার লোকেরা দেবে না। তোমাকে বলতে হবে, সুলতানের সাথে তোমার দু’টি একান্ত কথা আছে যা তুমি তার সাথে একান্তে বলতে চাও। এর পরও যদি তারা তোমাকে সুলতানের কাছে নিয়ে না যায়, তখন তুমি তাদের বলবে, গুপ্ত ঘাতকের হাতে সুলতানের নিহত হওয়ার আশংকা আছে। একথা বললে আশা করি, তারা তোমাকে সুলতানের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ করে দেবে।
আপনি বলে ছিলেন নারীর দুর্বলতার কথা’ একথা বলে আপনি কি বুঝাতে চাচ্ছেন? প্রশিক্ষককে জিজ্ঞেস করলো লক্ষণ।
“তোমার সাথে অন্তত দু’জন সুন্দরী নারী থাকা দরকার। তাদেরকে তুমি নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেবে রহস্যজনক কণ্ঠে জবাব দিলো প্রশিক্ষক। “তোমার সঙ্গীনী নারীরা যদি বুদ্ধিমতী হয় তাহলে তারা সুলতানের সেনা অফিসারদেরকে একজনের বিরুদ্ধে অন্যজনকে শত্রুতে পরিণত করতে পারবে। আমি তো মনে করি, সুলতান নিজেও সুন্দরী নারীদের দেখলে বিমুগ্ধ হয়ে যেতে পারে। সুলতান নিজে যদি তোমার স্ত্রী পরিচয়দানকারী নারীদের নিজের কাছে রাখার আগ্রহ প্রকাশ করে তাহলে কৌশলে তাতে তুমি সম্মতি দেবে। তোমার সঙ্গীনীদের কাছে বিষ রাখতে হবে যাতে সুযোগ মতো তারা এই বিষ পানি বা শরবতে মিশিয়ে দিতে পারে। আমরা তোমাকে এমন দু’জন সুন্দরী তরুণী দিয়ে দেবো। তুমি তাদেরকে উপজাতীয় পোষাক পরিয়ে নেবে।
সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক ও প্রবীণ উজির লক্ষণকে তার অভিযান সফল্যের জন্য নানা ধরনের কূটকৌশল শিখিয়ে দিতে শুরু করলো। তারা লক্ষণকে বুঝালো কি ভাবে সে সুলতান মাহমুদকে হত্যা করে সেখান থেকে পালিয়ে আসবে।
লক্ষণ তার প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে অভিযানের দীক্ষা নিয়ে যখন শিলার কাছে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলো, তখন শিলা বললো, অন্য কোন নারীর দরকার নেই। আমি তোমার সাথে থাকবো, আর আমার ভাতিজী রাধা থাকবে। শিলা রাতের বেলায় তার ভাতিজী রাধাকে তার ও লক্ষণের অভিযানের কথা জানিয়ে বললো, এই অভিযানে আমরা তোমাকে সাথে নিতে চাই।
শিলার প্রস্তাবে রাধা মহা উৎসাহে রাজি হয়ে গেলো। এরপর তিনজন মিলে রাজা রায়চন্দ্রের কাছে উপস্থিত হলো।
রাজা রায়চন্দ্র এই তিনজনকে একসাথে তার ঘরে প্রবেশ করতে দেখে কিছুটা বিস্মিত হলেন।
বাবা, আমাদের এখানে তরুণীদেরকে মন্দিরে নিয়ে বলিদান করা হয়। আপনিই বলুন, এসব বলিদানের দ্বারা আসলে কি কোন উপকার হয় না? আমিও ফিসি যে বলিদান করতে যাচ্ছি, তাতে আপনার অনেক কিছু অর্জন হবে। রাধা তার বাবা রাজা রায়চন্দ্রের উদ্দেশ্যে বললো, আমাদের ছাড়া লক্ষণপালের সাথে যদি অন্য কোন নারী যায়, তাহলে তারা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাকে ধোঁকা দিতে পারে।
রাজা রায়চন্দ্রের বোন শিলা ও তার ভাতিজী রাধার রূপ সৌন্দর্য ছিল গোটা অঞ্চলে আলোচিত বিষয়। তাদের সাহসিকতার বিষয়টি ছিলো সবার মুখে মুখে। ছোট্ট বেলা থেকেই এই দুই তরুণী অসীম সাহসিকতার অনেক পরিচয় দিয়েছে। এরা যখন লক্ষণের সাথে সুলতান মাহমূদকে হত্যার অভিযানে যেতে চাইলো, তখন একথা শুনে কেউ অবাক হলো না। কারণ, এরা ছিলো অত্যন্ত জাত্যাভিমানী। মাহমূদকে হত্যা করার বিষয়টি তারা কর্তব্য মনে করতো। তারা উভয়ে রাজা রায়চন্দ্রকে লক্ষণপালের সাথে অভিযানে যেতে রাজি করিয়ে ফেললো।
অভিযাত্রী তিনজনের জন্যে এমন এমন উপজাতীয় পোষাক তৈরী করা হলো, বাস্তবে এ ধরনের পোষাকধারী কোন উপজাতীয় গোত্রের অস্তিত্ব এতদঞ্চলে ছিলো না। তাদের সাথে যাওয়ার জন্যে এবং তাদের নিরাপত্তা ও সহযোগিতার জন্যে দু’জন অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তাকেও সহযাত্রী হিসেবে নেয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
শিলা ও রাধার জন্য এমন পোষাক তৈরী করা হলো যে পোষাকে তাদের পেট পিঠ, কাঁধ ও হাতের পুরো অংশ বিবস্ত্র থাকে। হাঁটুর নীচ পর্যন্ত সবটুকু পা খোলা থাকে। তাদের পোষাকের সাথে সঙ্গতি রেখে দু’জন সৈনিকের জন্যও উপজাতীয় পোষাক তৈরী করা হলো। তাদের মাথা সম্পূর্ণ খোলা রাখা হলো । বিশেষভাবে তৈরী এই উপজাতীয় পোশাক পরার পর তাদের রূপ সৌন্দর্য এমনভাবে ফুটে উঠলো যে, কোন পুরুষের পক্ষে তাদের দিক থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল।
লক্ষণ পালকেও অর্ধ উলঙ্গ উপজাতীয় পোষাক পরানো হলো। তাকেও উপজাতীয় পোষাকে সুদর্শন যুবক মনে হচ্ছিল। উপজাতীয় সর্দার হিসেবে মাহমূদ গযনবীকে উপহার দেয়ার জন্যে লক্ষণকে দুটি জ্যান্ত হরিণ, দুটি বাঘের চামড়া, দুটি মৃত মানুষের মাথার খুলি এবং একটি স্বর্ণের মূর্তি দেয়া হলো। মূর্তিটির উপরের অংশ ছিল মানুষের মতো এবং নীচের অংশ ছিল ঘোড়ার দেহের মতো। তাকে বলা হলো, এই মূর্তি দেখিয়ে তুমি বলবে, আমাদের গোত্র এই মুর্তিকে পূজা করে। কিন্তু এখন আমি গোত্রের সকল লোকজনকে নিয়ে মুসলমান হতে চাই।
