এ কাজ করতে গিয়ে যদি আমি মৃত্যুবরণ করি? তাহলে কি করবে? জিজ্ঞেস করলো লক্ষণ।
তাহলে, তোমার জ্বলন্ত চিায় নিজেকে জ্বালিয়ে দেবো, বললো শিলা।
মাহমূদকে হত্যার দৃঢ় সংকল্পে প্রতীজ্ঞাবদ্ধ হয়ে শিলা ও লক্ষণ রাজ দরবারের দিকে অগ্রসর হলো। রাজা রাজ্যপাল মুনাজের রাজা রায়চন্দ্র ও উভয় রাজ্যের সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে মাহমূদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিকল্পনা করছিলেন বলে দারোয়ান তাদের প্রবেশে বাধা দিলো। কিন্তু বাধা অগ্রাহ্য করে শিলাকে নিয়ে দরবার কক্ষে প্রবেশ করলো লক্ষণপাল। রাজ্যপাল এই অবাঞ্চিত প্রবেশে উন্মা প্রকাশ করে তাদের বেরিয়ে যেতে বললেন।
আপনারা যে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করছেন, আমরা সে কাজেই এসেছি। বললো লক্ষণ। অনধিকার প্রবেশের জন্যে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনারা যে বিষয়টিই ভেবে থাকুন না কেন, এসব চিন্তা রেখে একটু আমাদের কথা শুনুন। আপনারা কি ভেবেছেন, মাহমূদকে মাথুরাতেই হত্যা করা যেতে পারে? তাকে হত্যা করতে পারলে তার সকল সৈন্যকেই বন্দী করা সম্ভম।
এক আনাড়ী লক্ষণের কণ্ঠে এমন আজব কথা শুনে দরবারে উপবিষ্ট লোকেরা একে অন্যের দিকে দৃষ্টি ফেরালো। লক্ষণের কথা শুনে রাজ্যপালের ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসির রেখা ফুঠে উঠলো। তিনি বললেন, না, বেটা, এ ব্যাপারটি নিয়ে আমরা কোন চিন্তা-ভাবনা করিনি। বললেন, রাজা রায়চন্দ্র একাজ করার জন্যে যেমন দু সাহসী লোক দরকার তেমনি তাকে বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী হতে হবে।”
এর পাশাপাশি তাকে এমন ব্যক্তিত্বও হতে হবে যে নিজের জাত শত্রু মনে করবে মাহমূদকে। বললো লক্ষণ। বেতনভোগী হত্যাকারী দিয়ে এ কাজ করানো সম্ভব নয়। বেতনভোগী কর্মচারীকে একাজে পাঠালে দেখা যাবে সে হত্যা করতে গিয়ে ওদের টোপ গিলে টাকা-পয়সা নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে ওদের চর হিসেবে থেকে যাবে। একাজ কোন রাজ কুমারের পক্ষেই করা সম্ভব।’
“কে আছে এমন রাজ কুমার? জিজ্ঞাসু কণ্ঠে জানতে চাইলেন রাজ্যপাল।
“সেই রাজ কুমার আপনার সামনেই দাঁড়ানো, বললো লক্ষণ। আমি সেই রাজকুমার …… লক্ষণপাল।
রাজা রায়চন্দ্র লক্ষণের কাঁধে হাত রেখে বললেন, সাব্বাশ লক্ষণপাল! তুমি তোমার বাবার মাথাকে আরো উঁচু করে দিয়েছে। আজ যদি আমার কোন যুবক ছেলে থাকতো তাহলে আমিও তাকে তোমার সঙ্গে পাঠাতাম।
লক্ষণ! সত্যিই যদি তুমি একাজ করতে পারতে তাহলে গযনীর এই কালসাপও মরতো, আমার সেনাবাহিনীর লোকগুলোর প্রাণ দিতে হতো না।’
আপনি কি এ কাজটিকে মামুলী মনে করছেন? মহারাজ! বিস্মিত কণ্ঠে বললো এক বয়োজ্যেষ্ঠ সেনাপতি। আপনি কি ভাবছেন, রাজকুমার এখানে যেমন নির্বিঘ্নে দাঁড়িয়ে আছে এমন নির্বিঘ্নেই সে মথুরা যাবে আর মাহমূদের বুকে খঞ্জর বসিয়ে দিয়ে নিরাপদে চলে আসবে?
মোটেও সহজ নয় এ কাজ, তা আমি জানি। কিন্তু ভারতমাতার জন্যে আমি জীবন বিলিয়ে দেয়ার শপথ নিয়েছি। বললো লক্ষণ।
তুমি যেমন শপথ করেছো, মাহমূদও শপথ করেছে ভারতের কোন মন্দির ও রাজধানী সে অক্ষত রাখবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে মাহমূদের হাত খুবই লম্বা। আমাদের কোন কথা কোন সিদ্ধান্তই তার কাছে গোপন থাকে না। আপনারা সবাই জানেন, যে নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে আমরা সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য মনে করতাম, রাজমহলের যে সব বিষয় রাজকুমাররা পর্যন্ত জানতে পারতো না, সে তার সব কিছুই জানতো। অথচ সে ছিল গযনী সুলতানের একজন পাকা গোয়েন্দা। বললেন রাজ্যপাল।
আমি তা জানি। তবে এর পরও আমি তাকে হত্যা করতে যাবো। দৃঢ়তার সাথে বললো লক্ষণ। অবশ্য এ ধরনের অভিযানের কোন অভিজ্ঞতা ও ধারণা আমার নেই। আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা আমাকে বলে দিবেন, এই অভিযান আমাকে কি ভাবে চালাতে হবে? বয়স্ক সেনাপতির উদ্দেশ্য বললো লক্ষণ।
লক্ষণের সংকল্প ও দৃঢ়তা দেখে রাজা রাজ্যপাল প্রধান সেনাপতি ও উজিরকে নির্দেশ দিলেন, তারা যেনো এই অভিযানের জন্যে লক্ষণকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে কৗেজের রাজা বললেন, ধরিত্রির সেবা ও ধর্মের কল্যাণের জন্য আমি ভগবানের নামে আমার পুত্রকে উৎসর্গ করছি।’
পরদিন রাজার নিযুক্ত দু’জন অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তা লক্ষণকে তার অভিযানের জন্যে প্রস্তুত করার জন্যে উদ্যোগ নিলো। প্রশিক্ষকদের একজক লক্ষণের উদ্দেশ্যে বললো
লক্ষণ! তুমি একজন ডাকাত ও লুটেরার সাথে মোকাবেলা করতে যাচ্ছো, তোমার মাথা থেকে এই চিন্তা বের করে দাও। তোমাদের বুঝতে হবে মাহমূদ সত্যিকার অর্থেই একজন লড়াকু যোদ্ধা। তার বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধের একটি ভিন্ন অর্থ আছে। মাহমূদ শুধু যুদ্ধ করতে আসেনি, সাথে নিয়ে এসেছে একটি আদর্শ। তাকে সম্মুখ সমরে পরাজিত করা সহজ ব্যাপার নয়। আমাদের রাজা মহারাজারা তার দূরদর্শিতার ধারে কাছেও যেতে পারেননি। সেই সাথে তার মুখোমুখি হয়ে তাকে হত্যা করে ফেলবে, এমনটিও কেউ কল্পনা করেনি।
তোমার একটি কথা মনে রাখতে হবে, একজন পুরুষ যতোই ধর্মানুরাগী হোক না কেন, আসলে সে তো একজন মানুষ। মানুষ হওয়ার কারণে পুরুষের মধ্যে স্বভাবতই থাকে নারীর প্রতি দুর্বলতা। তদ্রূপ মানুষ হিসেবে একজন নারীর জন্যে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা পুরুষ। তোমার লক্ষ্য অর্জনে তুমি সাধু সন্নাসী কিংবা উপজাতির বেশ ধারণ করে তুমি মথুরা যাবে।
