লক্ষণ পাল ….! আমি ব্যাপারটা ভালো ভাবেই বুঝি, আমার প্রতি আসলে তোমার কোন ভালবাসা নেই। তুমি আমার রূপ সৌন্দর্যকে ভোগ করতে চাও। কিছু দিন পর যখন আমার রূপ সৌন্দর্যে ভাটা পড়বে, তখন আমাকে দূরে ফেলে তুমি অপর কোন সুন্দরীকে ঘরে তুলবে। তোমার বাবাও বৃদ্ধ বয়সে আমার মতো এক তরুণীকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সেই ভালোবাসার চম্পারাণী এখন কোথায়? গযনীর এক গোয়েন্দাকে নিয়ে পালাতে গিয়ে মারা পড়েছে। তুমি তো তোমার বাবার পথেই চলবে। অযথা আমার সাথে প্রেমের অভিনয় করছো কেন?
“তাই যদি মনে করে থাকো, তাহলে আমার খবরে তুমি এখানে এসেছে কেন? জিজ্ঞেস করলো লক্ষণপাল।
আমি এসেছি একটি শর্ত নিয়ে। এই শর্ত যদি পূরণ করতে পারো তাহলে আমি তোমার ঘরের বধু হবো। তখন যদি আমার ভাই তোমার কাছে আমাকে বিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায় তবুও আমি তোমার কাছে চলে আসবো।
তাই নাকি? বলো কি তোমার শর্ত? যাই বলবে তাই করে দেখিযে দেবো।’
“গযনীর সুলতানকে মথুরায় হত্যা করতে হবে। তুমি কি তা পারবে?”
“মথুরাতে কেন? তাকে আমি যুদ্ধের ময়দানে হত্যা করবো। তার মাথা কেটে এনে তোমার পায়ে লুটিয়ে দিবো।“
‘লক্ষণ! ভুলে যেয়ো না, তুমি মুনাজের এক রাজপুত মেয়ের সাথে কথা বলছো। আমাকে দাদা বলেছেন, মথুরার মন্দিরে ভারতবর্ষের সকল রাজা মহারাজা বাসুদেবের মূর্তির সামনে শপথ করেছিলেন, মাহমূদের দ্বিখণ্ডিত মাথা দেবমূর্তির পায়ে এনে ফেলে দেবে। মাহমূদের রক্তে কৃষ্ণ মূর্তিকে স্নান করাবে। কিন্তু কোথায় গেলো সেই বীরবাহাদুর রাজা মহারাজাদের শপথ! মুসলমানদের আক্রমনের মুখে সবাই শিয়ালের মতো পালিয়ে গেছে। আর রাজা হরিদত্ত তার তরবারী মাহমূদের পায়ের নীচে রেখে দিয়ে দশ হাজার প্রজাকে নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। আর আমাদের পুরোহিতরা যে মাটির উপর কৃষ্ণমূর্তিকে বসিয়ে ছিলো সেই কৃষ্ণমূর্তির পায়ের তলার মাটি পর্যন্ত ওরা সরিয়ে ফেলেছে।
এই মুসলমানরা সব লুটেরা। এরা মন্দিরগুলো থেকে সোনা লুটতে চায়, এ জন্য সব সময় মন্দির ধ্বংস করে’ বললো লক্ষণ।
মাথা ঠিক করে কথা বলো লক্ষণ! বললো শিলা। ভারত মাতার সম্মান রক্ষা করতে পারে একমাত্র রাজপুতেরা । আমি সেই রাজপুতদেরই মেয়ে। যে ব্যক্তি আমার পারিবারিক শিক্ষক ছিলেন, তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানী পণ্ডিত। আমি যখন প্রথম মুসলমানদের আক্রমণের কথা শুনলাম, তখন একদিন উস্তাদজীকে বললাম, লোকেরা বলে গযনীর মুসলমানরা লুটেরা। তারা মন্দিরগুলোর সোনাদানা লুট করার জন্যে বারবার ভারতে আক্রমণ চালায়। মুসলমানদের মথুরা দখলের খবর শোনার পর যখন তাকে বললাম, মুসলমানরা কি শুধু লুটতরাজ করতেই এসেছে? না কি তারা আমাদের এলাকাগুলো দখল করে নিতে চায়? তিনি আমাকে বললেন–
লোকেরা ভুল বলেছে। মাহমূদ গযনী লুটেরা নয়। সে আমাদের ধর্ম ধ্বংস করে তার ধর্ম ছড়িয়ে দিতে এসেছে। তোমার মনে রাখতে হবে লুটেরাদের কোন ধর্মজ্ঞান থাকে না। মাহমূদ যদি ভারতের ধন-সম্পদ হাতিয়ে নিতে চাইতো তাহলে রাজা হরিদত্তকে দলবলসহ ইসলামে দীক্ষা দেয়ার কোন প্রয়োজন হতো না।
আমি তাকে আরো জিজ্ঞেস করলাম, মুসলিম নারীরাও কি রাজপুত নারীদের মতো সাহসী? তিনি বললেন, নিজ ভূমি থেকে এতো দূরে এসে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে নেয় যেসব যুবক, তাদের মায়েরা সাহসী না হয়ে পারে না। নিশ্চয়ই তারা সাহসী। এই দুঃসাহসী মুসলমান মায়েরা তাদের ছেলেদেরকে যুদ্ধে পাঠিয়ে গর্ববোধ করে।
লক্ষণ! তুমি যাকে লুটেরা বলে উড়িয়ে দিচ্ছো, সে কোন সাধারণ লোক নয়। আমি নিজে তার মোকাবেলা করতে চাই, আমি দেশবাসীকে জানিয়ে দিতে চাই, রাজপুত মেয়েরাও কোন কোন পুরুষের চেয়ে বেশী সাহসী। এ মুহূর্তে আমার দরকার তোমার সহযোগিতা। তুমি যদি আমাকে সহযোগিতা
করো, তাহলে সেনাবাহিনীর যে কোন সিপাহীকে আমি সাথে নিয়ে নেবো এবং মাহমূদ গযনীকে হত্যা করবো। এরপর যদি আমি জীবিত থাকি, তাহলে সেই সিপাহীই হবে আমার জীবন সঙ্গী ….। এখন বলল, তুমি কি মাহমূদকে হত্যার অভিযানে আমাকে সঙ্গ দেবে?
হ্যাঁ, তোমাকে পাওয়ার জন্যে আমি তোমার সব শর্ত মানতে প্রস্তুত। বললো লক্ষণপাল।
ভুল বলেছো। আমার জন্যে নয়, বলো, তোমার ধর্ম ও দেশের খাতিরে তুমি আমার সঙ্গ দেবে। বললো শিলা। একাজে যদি পিছ পা হও, তা হলে আমি আমার ভাতিজি রাধা তোমার বোন এমনকি কনৌজ ও মুনাজের প্রতিটি তরুণী মুসলমানদের ঘরে থাকবে এবং মুসলমানদের সন্তান জন্ম দেবে।
ঠিক আছে শিলা! আমি মাহমূদকে হত্যা করেই তোমার সামনে দাঁড়াবো।
মথুরায় হত্যা করতে হবে। বললো শিলা। কারণ ওখানেই যদি তাকে হত্যা করা যায়, তাহলে মুসলমানদের অগ্রাভিযান থেমে যাবে, তার সেনাবাহিনী নেতৃত্বহীন হয়ে পড়বে এবং হতোদ্যম হয়ে গযনী ফিরে যাবে।
লক্ষণ! তুমি একজন অভিজাত ব্রাক্ষণ। আর ব্রাক্ষণদের ধর্মের প্রতি দায়িত্ব অনেক বেশী। আমার দেহে রাজপুতদের রক্ত প্রবাহিত। আমি কোন ভনিতার আশ্রয় না নিয়ে পরিষ্কার তোমাকে জানিয়ে দিচ্ছি, তুমি আমাকে যতোটা ভালোবাসো, আমি তোমাকে ততোটা ভালোবাসি না। কিন্তু আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তুমি যদি মাহমুদকে হত্যা করতে পারো, তাহলে সারাজীবন তোমার দাসী হয়ে থাকবো।
