* * *
রাজা রায়চন্দ্র, রাণীলক্ষী রেী, বোন শিলা এবং কুমারী মেয়ে রাধাকে সঙ্গে নিয়ে তখনই কনৌজের পথে রওয়ানা হলেন। রায়চন্দ্রের সাথে তার কতিপয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উজীর এবং নিরাপত্তারক্ষী। মাত্র সাতাইশ মাইল দূরে কনৌজ। সন্ধ্যার আগেই তারা কনৌজ পৌঁছে গেলেন।
রাতেই রাজা রায়চন্দ্র সার্বিক অবস্থা নিয়ে কনৌজ মহারাজা রাজ্যপালের সাথে আলোচনা করলেন। মহারাজ রাজ্যপাল তাকে বললেন–
আমরা সামান্য শক্তি নিয়ে উন্মুক্ত ময়দানে মাহমূদের বিশাল বাহিনীর মোকাবেলা করতে পারবো না। মহাবন ও মথুরা থেকে যে সব লোক পালিয়ে এসেছে, তারা জানিয়েছে, উন্মুক্ত ময়দানে গযনী বাহিনীর মোকাবেলা করা অসম্ভব। আমাদের কেল্লাবন্দি হয়ে লড়াই করতে হবে। আমার আশাংকা হচ্ছে, মাহমূদ আপনাকেও অবরোধ করবে। কিন্তু তার মূল দৃষ্টি কনৌজের দিকে। সে যদি আপনাকে অবরোধ করে তাহলে পেছন থেকে আমি আক্রমণ চালিয়ে ওদের দুর্বল করে দেয়ার চেষ্টা করবো। আর যদি সে সরাসরি কল্লৌজ অবরোধ করে, তাহলে আমি আপনার কাছে আশা করবো, আপনি ওদের পিছন দিকে আক্রমণ অব্যাহত রাখবেন।
মুনাজের রাজা রায়চন্দ্র নিজেদের ব্যর্থতার জন্যে ক্ষোভে আক্রোশে উত্তপ্ত অবস্থায় ছিলেন। সকল ঐতিহাসিকগণই একবাক্যে একথা লিখেছেন, মুনাজের রাজপুত বংশের বীরত্বগাথা ছিল সে যুগে কিংবদন্তিতুল্য। রাজপুতদের মেয়েরাও পুরুষদের মতো লড়াই করতে জানতো। তারা ছিল খুবই আত্মভিমানী বীরদপী। উন্মুক্ত ময়দানে রাজপুতদের কাবু করার ব্যাপারটি সহজসাধ্য ছিল না। ব্রাক্ষণের প্রতি রাজপুতদের কিছুটা উষ্ম ছিল। রাজা রায়চন্দ্র যে ব্রাক্ষণ পুরোহিতদের ধর্মোপদেশ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তা ছিল পুরোহিতদের কাপুরুষতার বিপরীতে বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ।
***
রাজা রায়চন্দ্রের বোন শিলা ও কন্যা রাধা উভয়েই ছিল কুমারী এবং সুন্দরী। তাদের রূপ সৌন্দর্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল বহুদূর পর্যন্ত। মহারাজা রাজ্যপালের ছেলে লক্ষণ পাল। কিন্তু রায়চন্দ্র শিলার বিয়ে লাহোরের রাজা ভীমপালের ছোট ভাই তারালোচনের সাথে ঠিক করে রেখেছিলেন। মাহমূদ গযনীর এবারের ভারত অভিযান না হলে এতো দিনে এই বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়ে যেতো।
রাতের বেলায় রাজা রায়চন্দ্র এবং মহারাজা রাজ্যপাল রাজপ্রাসাদে যখন মাহমূদ গযনীর আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যাপারে পরিকল্পনা আঁটছিলেন এবং তাদের মন্ত্রীবর্গও সামরিক কর্মকর্তারা আক্রমণ প্রতিরোধের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত ছিল তখন রাজ্যপালের ছেলে লক্ষণ পাল রাজপ্রাসাদের বাগানের এক অন্ধকার কোনে দাঁড়িয়ে একজনের আগমনের অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পর দু’জন নারী অন্ধকার ভেদ করে মূর্তির মতো সে দিকেই অগ্রসর হলো। একটু পথ গিয়ে একজন থেমে অপরজনকে বললো, আপনার জন্যে রাজকুমার অপেক্ষা করছেন। আপনি যান।
অপরজন তার হাতে একটি মুদ্রার থলে দিয়ে বললো, কেউ যেন জানতে পারে আমি এখানে রাজকুমারের সাথে একান্তে মিলিত হতে এসেছি।
এ ছিল রায়চন্দ্রের বোন শিলা। সে রাজমহলের এক সেবিকাকে বলে কয়ে রাজকুমারের সাথে মিলিত হওয়ার জন্যে নিভৃত্বে এখানে এসেছিলো।
শিলা তার ভাবী লক্ষী ও ভাতিজী রাধার অজান্তে রাজকুমার লক্ষণের সাথে একান্তে মিলিত হতে আসে। তারা সবাই রাজা রায় চন্দ্রের সাথে কনৌজে এসেছিল।
শিলাকে আসতে দেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো লক্ষণ পাল। সে শিলার উদ্দেশে বললো, আমার সংশয় ছিলো তুমি আসবে কি-না? আমি কতবার মুনাজে তোমার কাছে পয়গাম পাঠিয়েছি, কিন্তু তুমি প্রতিবারই আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে আমাকে তোমার পছন্দ নয়। আচ্ছা, আমার মধ্যে কি এমন ঘাটতি আছে, আমি কি তোমার পতি হওয়ার যোগ্য নই? অবশ্য আমি জানি, মহারাজা ভীমপালের ছোট ভাইয়ের সাথে তোমার বিয়ের কথা চলছে, কিন্তু তুমি তো ইচ্ছা করলে এই কথাবার্তা বন্ধ করে দিতে পারো। তুমি কি তাকেই পছন্দ কর?
লক্ষণ! তুমি সুদর্শন যুবক তাতে সন্দেহ নেই। বিয়ের ব্যাপারে আমার নিজস্ব কোন পছন্দ নেই। তবে এটা বলতে পারি এ মুহূর্তে তোমাকে আমার মোটেও পছন্দ নয় এবং আমার বিপরীতে তোমাকে যোগ্য পাত্রও আমি মনে করছি না। কারণ, গযনীর মুসলমানরা ঝড়ের মতো ধেয়ে আসছে। মথুরা ও মহাবন ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি হাজার হাজার মৃতদেহ নদীতে ভেসে আসতে দেখেছি। মথুরার মন্দিরগুলোতে এখন মুসলমানরা আযান দিচ্ছে। গযনীর সৈন্যরা শ্রীকৃষ্ণ ও মহাদেবের স্মৃতি নিয়ে গেছে। বুলন্দ শহরের দশ হাজার হিন্দু ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে। এই সময়ে তোমার মতো রাজকুমার আমার মতো একটি নগণ্য মেয়েকে বিয়ে করার জন্যে পেরেশান হয়ে গেছে। তোমার মধ্যে কি একটুও আত্মমর্যাদাবোধ নেই? তুমি কি জান না মুসলমানরা এখন মুনাজ ও কনৌজ দখল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে?
আমি সবই জানি। আমি এসব ব্যাপারে বেখবর নই। কিন্তু তোমার প্রেম আমাকে পাগল করে তুলেছে। আমি যে দিন থেকে জানতে পেরেছি, ইচ্ছা করলেই তুমি বিয়ের সিদ্ধান্ত বদল করতে পারো, সে দিন থেকেই তোমাকে পাওয়ার জন্যে আমার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। বললো রাজকুমার লক্ষণ পাল।
কারো প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। মহারাজা ভীমপালের ভাইয়ের প্রতিও আমার কোন টান নেই, তোমার প্রতিও আমার কোন আকর্ষণ নেই। যার সাথেই আমার বিয়ে হবে আমি তাকেই আমার সবকিছু ঢেলে দেবো।
