মহারাজ! দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে বিলম্ব হলে বলিদানে কালক্ষেপণ করলে দেবীরা রুষ্ট হয়ে মুসলিম সন্তান জন্মদান করতে শুরু করবেন। আমাদের দেবদেবীদের কোলকে স্নেচের সন্তান ধারণ থেকে পবিত্র রাখার জন্যে আমাদের মহাদেবের চরনে একাধিক কুমারী বলি দিতে হবে।
পুরোহিতের কথায় রাজা রায়চন্দ্রের চেহারা থমথমে হয়ে উঠলো। চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল পুরোহিতের কথায় তিনি শুধু বিরক্তিবোধই করছেন না, রীতিমত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। ক্ষোভে উত্তেজনায় তার দীর্ঘ গোঁফ কাঁপছিল । তিনি কঠোর দৃষ্টিতে পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে পুরোহিতকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
“থামুন! আপনি কি এটা বুঝাতে চান সুলতান মাহমুদের সাথে যুদ্ধের ফায়সালা মন্দিরে হবে? কুমারী বলি দিলে কি হবে? আপনি এদেরকে ক’দিন আপনার কাছে রাখবেন এরপর বলি দিয়ে দেবেন? তাতে কি যুদ্ধ জয় হবে? আপনি কেন বলেন না, এখানকার প্রতিটি মানুষকে লড়াই করতে হবে।
ছি! ছি! মহারাজ! পুরোহিত দু’হাতে কান ধরে বললো, একথায় আপনি ধর্মের অবমাননা করছেন। এটিতে ব্রাক্ষণদের দুর্গ। ব্রাক্ষণরা তো ভগবানের সন্তান। আমরা যা জানি, আপনি তা জানেন না। আপনি আকাশের নক্ষত্রের গতিপথ বদলাতে পারবেন না। বলিদান আপনাকে করতেই হবে।
বলিদান! বলিদান! রাগ উপচানো কণ্ঠে স্বগতোক্তি করলেন রাজা! বলি শুধু দু’তিন জন কুমারীর হবে না, এখানকার ছোট বড় প্রতিটি মানুষই রক্ত দেবে। রাজপুতদের প্রতিটি কুমারীই জীবন বিলিয়ে দেবে।
মনে রাখবেন পণ্ডিতজী! এই দুর্গকে লোকেরা ব্রাক্ষণদের দুর্গ বলে। এটি কিন্তু রাজপুতদের কেল্লা। রাজপুতেরা শত্রুর মোকাবেলায় একটি ভাষাই বুঝে, হয় শক্রর মৃত্যু নয়তো নিজের আত্মদান। দরকার হলে রাজপুতেরা বিজয়ের জন্যে ধর্মকেও বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না।
মহারাজ! প্রজাদের উপর একটু রহম করুন। বললো পুরোহিত। আমি যে কথা বলছি তা মেনে নিন। ধর্মকে বিসর্জন দেয়ার কথা আর মুখে আনবেন না।
আমাদের পায়ে আর ধর্মের শিকল দিবেন না, পণ্ডিতজী! রাজধানী বেহাত হয়ে যাচ্ছে, লোকজন ক্ষুধা পিপাসায় মারা যাচ্ছে। আমাদের হাতে গড়া এই জীন সংসার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অথচ আপনাদের মতো ধর্মীয় নেতৃবর্গ আপনাদের ঢোলই বাজাচ্ছেন। কারণ, আপনাদের কখনো রনাঙ্গনে গিয়ে শত্রুর মুখোমুখি লড়াই করতে হয় না। মন্দিরে বসে বসে আপনাদের রসনা তৃপ্তিতে কোন বেঘাত ঘটে না, আর আপনাদেরকে মিষ্টি মণ্ডা খাইয়ে দিতে এবং শরীর মর্দনের জন্যে কুমারী তরুণীরও অভাব হয় না।
মহারাজ! মথুরার ধবংসযজ্ঞের খবর শুনে আর নদীতে ভাসমান বিপুল মরদেহের সারি দেখে আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো পুরোহিত। আপনি বুঝতে পারছেন না, আপনি আমাকেই অসম্মান করছেন না, আপনার নিজের ধর্মের অবমাননা করছেন।
কোন ধর্মের কথা বলছেন আপনি পণ্ডিত মহারাজ! আপনি কি সেই ধর্মের কথা বলছেন, যে ধর্মকে লাথি মেরে বুলন্দ শহরের রাজাসহ দশ হাজার হিন্দু মুসলমান হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানি মহারাজ। তারা তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য ধর্ম ত্যাগ করেছে। বললো পুরোহিত। ওরা সবাই ছিল কাপুরুষ। মুসলমানদের তরবারীর জোর দেখে ওদের হাতে গ্রেফতার নয়তো নিহত হওয়ার ভয়ে এরা ধর্ম ত্যাগ করেছে।
না, আপনার কথা ঠিক নয় পণ্ডিত মহাশয়! এরা শুধু আতংক ও কাপুরুষতার জন্যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। তারা দেখে নিয়েছে, হিন্দুদের মন্দিরের বিশাল বিশাল দেব-দেবীর মূর্তি এবং ভগবানদের তারা না নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে, না তাদের কোন পূজারী রাজা প্রজাকে রক্ষা করতে পেরেছে।
রাজা রায়চন্দ্র ও পুরোহিতের বাক-বিতণ্ডার সময় সেখানে রাজার কুমারী বোন শিলা এবং যুবতী কন্যা রাধা উপস্থিত ছিল। দাঁড়ানো ছিল রাজার স্ত্রী রাণী লক্ষ্মী দেবী।
একপর্যায়ে শিলাকুমারী পুরোহিতের উদ্দেশ্যে বললো, পণ্ডিতজী মহারাজ! হিন্দুস্তানের নারীরা কি মন্দিরের অন্ধ প্রকোষ্টে পুরোহিতদের হাতে জীবন বিসর্জন দেয়ার জন্যই দুনিয়াতে এসেছে?
এখন আর কোন কুমারীকে বলিদান করা হবে না। গুরু গম্বীর আওয়াজে বললেন রাণী লক্ষীদেবী। আপনি যদি মনে করে থাকেন, মুসলমানদের এই ধ্বংসাত্মক আক্রমন দেবদেবীদের অভিশাপ। তাহলে এই অভিশাপ আমরা মোকাবেলা করবো।
রাণীর মুখেও রাজার কথার প্রতিধ্বনি শুনে রাগে ক্ষোভে উভয় পুরোহিত বিড় বিড় করতে করতে রাজার সম্মুখ থেকে চলে গেল। রাজা রায়চন্দ্রের বোন শিলা রাজার উদ্দেশ্যে বললো, দাদা! আপনি কি কখনো একথা ভেবেছেন গযনীর সুলতানকে যদি কোনভাবে হত্যা করা যায় তাহলে তার আক্রমণের আশংকা পুরোপুরিই শেষ হয়ে যাবে?
শুধু এটা কেন, আমাদেরকে অনেক কিছুই ভাবতে হচ্ছে শিলা। এই আক্রমণ প্রতিরোধের সম্ভাব্য সব দিকই আমি ভেবেছি। আমরা একটা কঠিন সময় অতিক্রম করছি। মাহমূদকে হত্যা করা সহজ ব্যাপার নয়। তবুও এ বিষয়টি আমি ভেবে দেখবো। সবার আগে আমাদেরকে এখন মহারাজা কনৌজের কাছে যেতে হবে। গযনীর সুলতান মথুরায় বসে থাকবে না এবং ওখান থেকেই গযনী ফিরে যাবে না। নিশ্চয়ই সে এদিকেও অভিযান চালাবে।
রাজা রায়চন্দ্র কনৌজ রওয়ানা হওয়ার জন্যে তার নিরাপত্তারক্ষীদের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন।
