‘বন্ধ কর এসব বাদ্য-বাজনা ও ঘন্টা বাজানো! কি সব মাতম শুরু করেছো? রাজপুতেরা কার লাশ দেখে এমন মাতম শুরু করেছে। মন্দিরের পুরোহিতদের ডেকে আমার কাছে নিয়ে এসো।‘ প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন রায়চন্দ্র।
নির্দেশ শুনে রায়চন্দ্রের সৈন্যরা দৌড়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে সব ধরনের ঘণ্টা ও ঢাকঢোলের বাজনা বন্ধ হয়ে গেল। শহরে নেমে এলো নীরবতা।
দুর্গ প্রাচীর থেকে রাজা রায়চন্দ্র নীচে নেমে জনসাধারণের সাক্ষাতের জন্যে সংরক্ষিত তার দরবারে গিয়ে বসলেন।
কিছুক্ষণ পর রাজদরবারের দু’জন পুরোহিত এবং তাদের সঙ্গে আরো একজনকে রাজার সম্মুখে হাজির করা হলো। তৃতীয় ব্যক্তির কাপড় চোপড়সহ
পুরো শরীর ছিল জবজবে ভেজা এবং তার অবস্থা ছিল একেবারে বিধ্বস্ত । রায়চন্দ্রকে জানানো হলো, এই লোকটিকে নদী থেকে জীবন্ত উদ্ধার করা হয়েছে। সে এক প্রস্ত কাঠ খণ্ডকে আঁকড়ে ধরে ভেসে আসছিল। রায়চন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন, এই লোক কোথাকার? কোত্থেকে এসেছে সে?
লোকটি ক্ষীণ কণ্ঠে বললো, এসব মরদেহ মহাবনের সৈন্যদের। আমিও মহাবনের সেনাবাহিনীর সদস্য। আমাদেরকে গোয়েন্দারা খবর দিয়েছিল, মুসলিম সৈন্যরা একের পর এক দুর্গ জয় করে আমাদের দিকে আসছে এবং তাদের গন্তব্য মথুরার দিকে।
মহারাজা আপনি জানেন, মহাবন কী ভীষণ জঙ্গলাকীর্ণ এবং কতো দূর পর্যন্ত জঙ্গল বিস্তৃত। আমাদের মহারাজা কুয়ালচন্দ্র সকল সৈন্যদেরকে সারা জঙ্গল জুড়ে ছড়িয়ে দিলেন এবং তীরন্দাজদেরকে গাছে চড়িয়ে দিলেন। হস্তি বাহিনীকে জঙ্গলের একপাশে দাঁড় করিয়ে দিলেন। যাতে নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে মুসলিম সৈন্যদের পিষে মারার জন্য অগ্রসর হতে পারে। কারণ এই জঙ্গল হয়েই মূসলমানদের অগ্রসর হওয়ার কথা ছিল।
এমনই ছিল আমাদের রণপ্রস্তুতি; কিন্তু কি করে কি ঘটে গেল এর পরের ঘটনা আমি আপনাকে কিছুই বলতে পারবো না।
হঠাৎ এক সময় জঙ্গলের দিকে মুসলমানদের কিছু সংখ্যক সৈন্যের উপস্থিতি দেখা গেল। আমাদের সৈন্যরা সামান্য সংখ্যক মুসলিম সৈন্য দেখে উত্তেজনায় চিৎকার শুরু করে দিল, ‘একজনকেও জীবিত ফেরত যেতে দেবো না; সবাই ঘিরে ফেলে। এদেরকে জীবন্ত ধরে নিয়ে মথুরার মন্দিরের সামনে দাহ করা হবে’; ইত্যাদি বলে আমাদের সেনারা তুমুল চিৎকার শুরু করল।
কিন্তু দেখতে দেখতে অল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেল । তিন দিক থেকেই ঝড়ের মতো ধেয়ে আসলো মুসলিম বাহিনী। তিন দিক থেকেই গোটা জঙ্গলকে ঘিরে ফেলল। যে হস্তিবাহিনীর হাতিগুলোকে মুসলমানদের পিষে মারার জন্যে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল, এগুলো আর্তচিৎকার করে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করল। আমাদের যে সব সৈন্য গাছে চড়ে বসেছিল মুসলিম তীরন্দাজদের তীরবিদ্ধ হয়ে এরা নীচে গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। এক পর্যায়ে আমাদের সৈন্যরা পালাতে শুরু করল। আর মুসলিম সৈন্যরা আমাদের পিছু ধাওয়া শুরু করল। ওরা গোটা জঙ্গল শত্রুমুক্ত করে অগ্রসর হচ্ছিল। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল যেন তারা জঙ্গলের সকল বৃক্ষরাজি সমূলে উপড়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছে।
পলায়নপর সৈন্যরা ছিল তিন দিক দিয়ে বেষ্টিত। ডানে বামে এবং সামনের দিকে বেষ্টন করে আসছিল মুসলিম বাহিনী। আমাদের সৈন্যদের পক্ষে পিছনে সরে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। কিন্তু জঙ্গলের পিছন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে যমুনা নদী। উপায়ন্তর না দেখে জীবন বাঁচাতে আমাদের সৈন্যরা দলে দলে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করল। অক্ষত আহত সকল সৈন্যই যমুনা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। মুসলমান তীরন্দাজরা নদীর তীর থেকে সাতরানো সৈন্যদের উপর তীর নিক্ষেপ শুরু করল আর তীর বিদ্ধ হয়ে আমাদের সৈন্যরা নদীতে ডুবতে থাকলো
মুসলিম সৈন্যরা আমাদের একজন যোদ্ধাকেও সাতরে ওপাড়ে উঠতে দেয়নি। যারা জীবন বাঁচাতে লম্বা ডুব দিয়েছিল। তাদের কাউকেই আর ভাসতে দেখা যায়নি। আমি একটি ভাসমান কাঠ মাথার উপর দিয়ে নিজেকে কোন মতে আড়াল করে ভাসতে ভাসতে এ পর্যন্ত এসেছি। এখানে এসে আমি তীরে পৌঁছার চেষ্টা করি। এরপর মহাবনে কি ঘটেছে আমি বলতে পারবো না। মহারাজ!
তুমি বলতে না পারলেও আমি বলতে পারি। আমার কাছে শোন। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন রাজা রায়চন্দ্র। তোমাদের রাজা কুয়ালচন্দ্র তার স্ত্রী সন্তানসহ আত্মহত্যা করেছেন। তার সেনাবাহিনীর সকল খ্যাতি মুসলমানরা কজা করে নিয়েছে এবং গযনীর সুলতান মাহমূদ মহাবনের সকল মন্দির থেকে দেবদেবীদের প্রতিমা অপসারণ করে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ওখানকার লোকেরা এখন মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনী নয়, আযান শুনতে পাচ্ছে।
হরে রাম, হরে রাম, সেখানে উপস্থিত দুই পুরোহিতের কষ্ঠ চিড়ে বেরিয়ে এলো। প্রধান পুরোহিত বললো, এ সব নাচ্চার লোকদের উপর ভগবান এমন গজব ফেলবেন যে, এদের মৃতদেহ শিয়াল শকুনে কাড়াকাড়ি করে খাবে। কৃষ্ণবাসুদেবের গযব থেকে এদের শিশু সন্তানেরাও রক্ষা পাবে না।
মহারাজ! এ মুহূর্তে হরিহরি মহাদেব খুব মূল্যবান ত্যাগ চাচ্ছেন। দেবতার গযব থেকে বাঁচতে হলে আপনাকে দেবীর চরণে একজন কুমারী বলিদান করতে হবে। আমি আপনাকে হিসাব করে বলে দেবো, আপনাকে আর কি কি করতে হবে। আকাশের তারকাদের গতিপথ বদলে গেছে। আমি এখনই আপনাকে বলে দিচ্ছি। এখন পুর্ণিমা চলছে। সামনে অমাবশ্যা। সামনের সময়টা খুবই খারাপ। এখন থেকেই বিশেষ পূজাপার্বন শুরু করতে হবে । আমি আপনার ভাগ্য গুণে দেখব। ক্ষতিকর কিছু থাকলে সেটিকে সরানোর ব্যবস্থা করবো।
