সুলতান মাহমূদের স্থানীয় গোয়েন্দাদের খবরে জানা যায়, লাহোরের মহারাজা ভীমপালও এই অঞ্চলেই অবস্থান করছেন। রাজা ভীমপাল এই অঞ্চলের রাজাদেরকে সুলতানের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করে তুলছেন এবং তাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে চেষ্টা করছেন। রাজা ভীমপালের পক্ষে সুলতান মাহমূদের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব ছিলো না। কারণ, তিনি ছিলেন সুলতানের কাছে বশ্যতা স্বীকারকারী অধীনতামূলক চুক্তিতে আবদ্ধ। ভীমপাল সুলতানের সাথে কোনরূপ যুদ্ধ না করার চুক্তি করেছিলেন এবং সুলতানের সেনাবাহিনীকে সব ধরনের সহযোগিতা করার ব্যাপারটিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
সুলতান মাহমূদ ভীমপালকে খুঁজে বের করে জীবিত গ্রেফতার করে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু গোয়েন্দারা গভীর অনুসন্ধান করেও ভীমপালকে কোথাও খুঁজে পায়নি।
মথুরা থেকে প্রায় দেড়শ মাইল দূরে গঙ্গা নদীর ডান তীরে ছিল কনৌজ শহর। আর যমুনা নদীর ডান তীরে ছিল মথুরা শহর। ফলে সুলতান মাহমুদকে উভয় নদী অতিক্রম করতে হয়েছিল। কিন্তু নিরাপদে নদী পারাপারের জন্য সুলতানকে পথের কাঁটাস্বরূপ সকল হিন্দু রায় ও ছোট্ট ছোট্ট রাজাদেরকে অস্ত্রমুক্ত করতে হয়েছিল। অন্যান্য হিন্দু রাজাদের নিরস্ত্র না করলে আশংকা ছিল এরা সবাই মিলে কনৌজ অবরোধে ব্যস্ত সুলতানের বাহিনীর উপর পেছন থেকে আক্রমণ করে বসবে। সুলতান খুব দ্রুত অভিযান চালাতে চাচ্ছিলেন, যাতে কনৌজের সৈন্যরা প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতটা শক্তিশালী না করতে পারে।
পথিমধ্যে যমুনা নদীর বাম পাড়ে মনুজ নামের একটি ছোট্ট দুর্গ ও রাজ্য ছিল। সে সময় এটিকে ব্রাক্ষণ দুর্গ নামেও ডাকা হতো। কনৌজ ও মনুজের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র সাতাশ মাইল। মনুজ ছিল হিন্দু রাজপুতদের আবাসস্থল। এরা ছিল স্বভাবজাত লড়াকু। এদের মেয়েরা পর্যন্ত যুদ্ধ বিগ্রহে পিছপা হতো না। মনুজের রাজপুতেরা ছিল কনৌজ রাজার খুবই বিশ্বস্ত। রাজা রাজ্যপাল মনুজের রাজপুতদের সাথে সামরিক সখ্য গড়ে তুলেছিলেন। তাদের মধ্যে পারস্পারিক সামরিক সহযোগিতা চুক্তিও বিদ্যমান ছিল।
একদিন মনুজের কিছু অধিবাসী যমুনা নদীতে গোসল করছিল। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও নদীতে গোসল করছিল। সাধারণত তারা সকাল বেলায় গোসল সেরে নেয়াটাকে ধর্মীয় অনুসঙ্গ মনে করে। মনুজ দুর্গের অবস্থান ছিল একেবারে নদীর তীর ঘেঁষে। হঠাৎ মহিলাদের মধ্যে চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। তারা নদী থেকে হচড়ে পাছড়ে উঠে বাড়ীর দিকে দৌড়াতে শুরু করল। মহিলাদের আর্তচিৎকার শুনে পুরুষেরা দৌড়ে এলো। তারা মনে করল হয়তো নদীতে কোন জলহস্তি কিংবা কোন জলজ প্রাণী দেখে মহিলারা আতংকিত হয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের ভুল ভেঙ্গে গেল। তারা নদীর পানিতে স্রোতের সঙ্গে মানুষের মরদেহ ভেসে আসতে দেখতে পেল এবং নদীর পানির রংও তাদের কাছে পরিপবিতত মনে হলো।
প্রথমে তারা মাত্র কয়েকটি মরদেহ দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তাদের চোখে পড়ল সারি সারি সাশ। যেনো নদীতে পানি নয় শুধু মরদেহ প্রবাহিত হচ্ছে।
নদীর জলে স্নানরত যে ক’জন পুরোহিত ও পণ্ডিত শ্রেণীর লোক ছিল, তারা নদীতে হাঁটু গেড়ে বসে ভজন আওড়াতে শুরু করল। তারা ভয় ও আতংকে কাঁপছিল। তাদের কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছিল ভজন।
এই অবস্থা দুর্গের দেয়ালের উপর থেকে প্রহরীরা যখন দেখতে পেল, তাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। রাজুপুতেরা ভীতু ছিলো না। যুদ্ধ বিগ্রহে তাদের মধ্যে কোন বেশ উৎসাহী ছিল। কিন্তু এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের মরদেহ তাদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করল। তারা এটিকে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে অনুমান করল।
যে সব পুরোহিত নদী থেকে উঠে এসেছিল, তারা মন্দিরে এসে ঘণ্টা বাজাতে শুরু করল। মন্দিরের বিশেষ ঘণ্টার আওয়াজ শহরে আতংক ছড়িয়ে দিল। রাজা রায়চন্দ্রের কাছে যখন খবর পৌঁছালো, তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্যে দ্রুত দুর্গ প্রাচীরে গিয়ে দাঁড়ালেন। রাজার সাথে তার একান্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও দরবারী লোকজনও দুর্গ প্রাচীরে সমবেত হলো।
অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে রাজা তার নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও দরবারীদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা কি জানো এসব মরদেহ কোত্থেকে এসেছে?
এসব মরদেহ মথুরা ও মহাবনের অধিবাসীদের। তোমরা কি শোনান, মুসলমানরা মথুরা ও মহাবন দখল করে ওখানকার সকল মন্দির ধ্বংস করে দিয়েছেঃ
রাজা রায়চন্দ্র দুর্গ প্রাচীরের উপর থেকে দেখতে পেলেন, লোকজন নদীতে লাশের সারি দেখে আতংকিত হয়ে দিক বিদিক দৌড়ে পালাচ্ছে।
আতংকিত মানুষদের দেখে রাজা রায়চন্দ্র তার সঙ্গীদের বললেন, দেখো, কাপুরুষদের কাণ্ড! নদীতে কটা মরদেহ দেখে ভয়ে নদী ছেড়ে পালাচ্ছে। এরা জানে না, এমন কাপুরুষের পরিচয় দিলে আমাদের সবার মরদেহ এভাবেই নদীতে ভেসে যাবে এবং আমাদের মেয়েরা মুসলমানদের বাঁদী দাসীতে পরিণত হবে।
দেখতে দেখতে মন্দিরে ঘণ্টা, শিংগার ফুস্কার ও ঢাকঢোলের আওয়াজ আরো অত্যুঙ্গে উঠলো। আতংকিত মানুষেরা ঘরে বাইরে সর্বত্র ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ ধ্বনি বলে চেঁচাতে লাগলো। ভীত সন্ত্রস্থ মহিলারা ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলো। শহরের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো দ্রুত সংক্রামক এক আতংক। অবস্থা দেখে রায়চন্দ্রের নিজের চেহারাও কালো হয়ে গেল। এক পর্যায়ে রাজা বলতে বাধ্য হলেন,
