লাহোরের সবচেয়ে বড় মন্দিরের প্রধান মূর্তি সরস্বতির সামনে আতর, গোলাব, ধূপ, লোবান, আগরবাতি জ্বালিয়ে একান্ত মনে পূজায় বসেছে পণ্ডিত। মন্দিরের ভেতর-বাহির ধুয়ে মুছে ঝকমকে করা হয়েছে। আলোকমালায় গোটা মন্দির ঝলমল করছে। আজ মন্দিরে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। বিশ-পঁচিশটি কুমারী মন্দিরের ভেতরে ফুলের ডালি নিয়ে দাঁড়ানো। এরা বিশেষভাবে তৈরি পোশাকে সজ্জিত হয়ে মন্দিরের প্রবেশ পথে দু’সারিতে দাঁড়িয়েছে। মন্দিরের সদর দরজার সামনে রাজার বিশেষ নিরাপত্তা অফিসাররা টহল দিচ্ছে। ইত্যবসরে ঘোষণা শোনা গেল, মহারাজের সওয়ারী আসছে।
রাজার আগমনী সংবাদে বাদক দল বিশেষ সঙ্গীতের তুফান তুললো। বাজনার তালে তালে নেচে উঠল তরুণী দল। গোটা এলাকা হারিয়ে গেল কান ফাটা ঢাকঢোল আর বাদ্যযন্ত্রের শব্দে। রাজা সদর গেটে এলে কুমারীরা কুর্নিশ করে গমন পথে তার পদতলে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দিল। তাজা ফুলের পাপড়ি মাড়িয়ে তরুণীদের বেষ্টনী পেরিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করল রাজা। প্রবেশ করল বিশেষ এক কক্ষে। যেখানে পণ্ডিত মহারাজ তন্ত্রমন্ত্র জপছিল। এক পণ্ডিত তাকে কুর্নিশ করে মাথায় তিলক পরিয়ে দিল। অন্য পণ্ডিতেরা ঘটি, শাখা বাজাতে শুরু করল। রাজা জয়পাল দু’হাত জোর করে সরস্বতীর পা ছুঁয়ে চোখে-মুখে হাত বুলাল। আর শপথ করল, যে করেই হোক সে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবেই নেবে। প্রতিজ্ঞা করল মূর্তির সামনে, পরাজয়কে বিজয়ে রূপান্তরিত করে সুদূর বুখারা পর্যন্ত আমি দেব-দেবীর ডঙ্কা বাজাব। ইসলামের সূতিকাগার পর্যন্ত আমি সনাতন ধর্মের সীমানা বিস্তৃত করে ক্ষ্যান্ত হব। দেবদেবীদের মর্যাদা বুলন্দ করতে ব্যর্থ হলে যুদ্ধেই আমি প্রাণ ত্যাগ করব।”
রাজার প্রার্থনা শেষ হলে শুরু হল পণ্ডিতদের পালা। পণ্ডিতেরা ওদের নিজস্ব সংস্কৃত ভাষায় অনেক কিছু বলল, যা অন্যদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। ঘণ্টা আর শাখা ধ্বনি আরো তীব্র হল। হঠাৎ ভীষণ গর্জন শোনা গেল- যেন আসমান ভেঙে পড়েছে। বাইরে যেন রাতের আঁধার নেমেছে। পরপর কয়েকবার গর্জন শোনা গেল। পণ্ডিতেরা পরস্পর চোখাচোখি করল, বুড়ো রাজা পণ্ডিতদের কাতর অবস্থা আর ঘন কাঁপানো গর্জনে ভয়ে কেঁপে উঠল। তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বড় পণ্ডিত দেবতার সামনে আরো জোরে জোরে মন্ত্র পড়ছে আর রোদন করছে। বাইরে নেমে এলো গভীর অন্ধকার। শুরু হল চেঁচামেচি, হাঁকডাক আর চিৎকার।
মহারাজ! দেবতা খুব নাখোশ হয়েছে। গজনীর যুদ্ধে দেবদেবীদের অপমান করা হয়েছে। এই অপমান দেবতা কখনও ক্ষমা করবে না। রাজার সামনে দু’হাঁটু গেড়ে নীচু গলায় বলল বড় পণ্ডিত।
এ সময় হঠাৎ আকাশে এমন বিকট বিজলী-গর্জন শুরু হলো যে, মন্দির কেঁপে উঠল, মূর্তিগুলো নড়ে গেল।
রাজা কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠল, পণ্ডিত!
জ্বী মহারাজ!
দেবী মা কি চায়? কতো মানুষের বলি চায় দেবী? যতো নরবলি চায় বলুক, আমি দেবীর পদতলে হাজারো নরবলী দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করব।
এ সময় রাজা জয়পাল, পণ্ডিত ও মন্দিরের সেবায়েতদের মধ্যে আকাশের অবিরাম বিকট গর্জন আর বিজলীর ভয়াবহ ঝলকানিতে ধুকপুকানি শুরু হয়েছে। ভিতরে ভিতরে ভয়ে সবার বুক শুকিয়ে গেছে।
মন্দিরের অনতিদূরে মুসলমান কৃষকরা নির্বিঘ্নে ক্ষেতে কাজ করছিল। তাদের খুশি দেখে কে। দীর্ঘদিন পর কাক্ষিত মুষলধারার বৃষ্টিতে আনন্দ উচ্ছ্বাসে তারা বলাবলি করছিল, “এবার ফসল ভালো হবে, আল্লাহ রহম করেছেন। ভাইয়েরা! বাড়ি গিয়ে সবাই নফল নামায পড়ো, শুকরিয়া আদায় করো।” মুসলিম কৃষকদের আনন্দ উল্লাস আর হর্ষধ্বনি মন্দির থেকেও শোনা যাচ্ছিল।
মুসলমানদের জন্যে যা ছিল আল্লাহর দয়া মন্দিরের মূর্তিপূজকদের বিবেচনায় তা ছিল দেবতার ক্রোধ, ভগবানের গযব। মুসলমানরা ভারী বর্ষণ-বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত ভেবে শুকরিয়া জ্ঞাপনার্থে নফল নামায পড়ার জন্যে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেছে। মুসলমান শিশুরা বৃষ্টিতে ভিজে কাদা-পানিতে খেলতে নেমেছে, হৈ চৈ, চেঁচামেচি করে উল্লাস করছে। অপর পক্ষে রহমতের এই বারিধারা ও মেঘের গর্জনে মন্দিরের পূজারী ও রাজার চেহারা মলিন হয়ে গেছে। গযবের আশঙ্কায় মন্দিরের সর্বত্র ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে।
বড় পণ্ডিত হাতজোড় করে বড় দেবতার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছিল, এদিকে রাজাও ভগবানের শাস্তি আশঙ্কায় কাতর। বাইরে সারি বেঁধে দাঁড়ানো যুবতীরা দ্বিতীয়বার আকাশের গর্জনে ভীত হয়ে দৌড়ে মন্দিরে এসে কাঁপতে শুরু করেছে।
দীর্ঘক্ষণ পর এক পণ্ডিত মুখ তুলে বলল, মহারাজ! এক কুমারীর বলিদান!
মাত্র একটি?
জ্বী মহারাজ! মাত্র একটি কুমারী হলেই চলবে। বলল পণ্ডিত।
কোন মুসলমান কুমারীকে ধরে এনে এক্ষণই আমার সামনে বলি দিয়ে দাও। হুকুম করল রাজী।
না-না মহারাজ! ভগবান কোন ম্লেচ্ছ বলিদান গ্রহণ করবেন না। খাঁটি বামুন কুমারী চাই।
রাজা জয়পালের দৃষ্টি পড়ল পাশে দাঁড়ানো কুমারীদের প্রতি। এরা সবাই মন্দিরের চিরকুমারী! সেবায়েত এই চিরকুমারীরাই একটু আগে তার গমন পথে ফুল ছিটিয়ে দিচ্ছিল।
এরাও তো কুমারী। এদের একজনকে বলিদানের জন্য রেখে দিন। পণ্ডিতের উদ্দেশে বলল রাজা।
রাজার কথা শুনে মেয়েরা পরস্পর চোখাচোখি করল এবং বাঁকা ঠোঁটে হাসল। পরক্ষণেই তাদের এই আচরণে পণ্ডিতদের ক্রোধাগ্নি আঁচ করতে পেরে দমে গেল সবাই। পণ্ডিতরা একটু চুপসে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা ইতস্তত হল। কারণ, এই মেয়েরা জনসাধারণের দৃষ্টিতে খুবই সম্মানের পাত্রী, মন্দিরের সেবাদাসী, দেব-দেবীর জন্য উৎসর্গিত চিরকুমারী। মন্দিরে এদের অবাধ যাতায়াত। একাকী অথবা জোড়ায় জোড়ায় দল বেঁধে যখন ইচ্ছে এদের জন্যে মন্দিরে গমনাগমনে কোন বিধিনিষেধ নেই। বাইরের মানুষ এদেরকে সতি-সাধ্বী ভেবে ইজ্জত করলেও মন্দিরের পণ্ডিত আর ওরা জানে, তারা কোন ধরনের কুমারী। বারবার তাদের বাঁকা দৃষ্টি পণ্ডিতদের বিব্রত করছিল এবং তা কুমারীদল ও পণ্ডিতদের মাঝে এক জটিল সম্পর্কের ইংগিত বহন করছিল।
