রাজা জয়পালের দরবারের এক লোক গজনীর ভাষা জানতো। রাজা তার সহায়তায় বন্দীদের সাথে কথা বলল, “আমি তোমাদের কাছে যুদ্ধের কোন গোপন কৌশলের কথা জিজ্ঞেস করব না। তোমরা শুধু আমাকে একথা বলবে, যুদ্ধ যাত্রার আগে সুলতানকে কোনদিন যাত্রা করলে শুভ হবে, তারার অবস্থান গুনে তোমাদের মৌলভী কিংবা জ্যোতিষীরা কি এরূপ কিছু বলে?”
“না, আমাদের ধর্মীয় গুরুরা এসব কিছু বলেন না।” বলল নেজাম আউরিজী নামের বন্দী কমান্ডার।
“আমরা ধর্মের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারীদের মোকাবেলায় লড়াই করি। আমাদের শত্রু আপনারা, খৃস্টান ও ইহুদীরা। আমাদের স্বধর্মীয় লোকদের মধ্যেও আমাদের শত্রু রয়েছে। আমরা যে যুদ্ধ করি আমাদের দৃষ্টিতে এটিকে জেহাদ বলা হয়। আমরা রাজ্যের পরিধি বিস্তারের জন্যে যুদ্ধ করি না, আমরা আল্লাহর জন্য আল্লাহর সত্য ধর্মের বিজয়ের লক্ষ্যে যুদ্ধ করি। যুদ্ধ যাত্রা কিংবা যুদ্ধ শুরুর জন্যে বিশেষ কোন ক্ষণ বা দিনের জন্যে আমরা অপেক্ষা করি না। প্রত্যেক দিন বা সকল মহূর্তকেই আমরা শুভ মনে করি। দিন হোক রাত হোক, ঝড়-বাদল, শীত-গ্রীষ্ম সবই আল্লাহর। এই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা যুদ্ধ করি। অপারেশনে নেমে পড়ি। আল্লাহর প্রতিটি দিন ও মুহূর্ত শুভ ও সুন্দর। এটাই আমাদের বিশ্বাস।”
তোমাদের মসজিদগুলোতে কি তোমাদের মৌলভী ও ইমাম সাহবেরা তোমাদের জন্যে বিশেষ কোন দু’আর আয়োজন করে?
প্রত্যেকেই জিহাদে গমনকারীদের জন্যে দু’আ করে।
আমাদের ছোট-বড় ছেলে-বুড়ো সবাই সব সময় আল্লাহ তা’আলার সাথে কথা বলতে পারে। বলল নিজাম আউরিজী।
আচ্ছা! তোমরা কি জান তোমাদের বিজয়ের রহস্য কি? তোমরা কি আমার সৈন্য সংখ্যা সম্পর্কে আগে জানতে জিজ্ঞেস করল রাজা।
আপনার সৈন্য সংখ্যার ব্যাপারটি জানা-না জানার বিষয়টি আমাদের সুলতান এবং সেনাপতিদের দায়িত্ব। ওসব নিয়ে আমরা ভাবি না। আমাদের সাফল্যের রহস্য হলো আমরা যুদ্ধ করি আল্লাহর জন্যে। আমরা যুদ্ধে অবতীর্ণ হই বাঁচার জন্যে নয় শাহাদাঁতের আকাক্ষা নিয়ে।
তা আমি জানি। বলল রাজা। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, আমার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে তোমরা এতো অল্পসংখ্যক লোক কিভাবে বিজয়ী হলে। তোমাদের যুদ্ধের কৌশল কি?
এটা একান্তই গোপনীয় বিষয়। এ ব্যাপারে আমি যেমন আপনাকে কিছু বলতে পারব না, আমার সাথীও আপনাকে কিছু বলতে পারবে না। তবে একথা বলতে পারি, আল্লাহর উপর ঈমানদার কোন ব্যক্তি তারার গতিবিধিতে বিশ্বাস করে না। যতক্ষণ ঈমান মজবুত থাকে, ততক্ষণ মুমেন আকাশের বিজলীর ন্যায় দুর্বার গতিতে সামনে এগিয়ে চলে। আমাদের উলামায়ে কেরাম বলেছেন, হিন্দু ও পৌত্তলিকরা কাদামাটি ও পাথরের মূর্তির পূজা করে। ওদের বিশ্বাস দুর্বল এবং অক্ষম ওদের দেবদেবীরা। আমরা আপনাকে বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছি, হাতে গড়া কাদা-মাটি ও পাথরের দেবদেবী প্রকৃত খোদার সাথে টক্কর দিলে ধুলোর সাথে মিশে যায়। আপনি কি দেখেননি, আপনার সৈনিকরা সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল বহু দেবদেবী, সে সব কি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি? আপনার একজন সৈন্যও কি অক্ষত ফিরে আসতে পেরেছে।
এই ম্লেচ্ছ আমাদের দেবদেবীকে অপমান করছে মহারাজ! রাগতস্বরে বলল এক পণ্ডিত।
এই গবেট এখনও বুঝতে পারছে না যে, সে আমাদের বন্দী, বলল রাজা। এরা তাদের কঠিন পরিণতি সম্পর্কে বেখবর। এরা যদি যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে আমাকে ওদের গোপন রহস্য প্রকাশ না করে তাহলে আমি ওদের চামড়া তুলে ফেলব। তখন দেখবে, যন্ত্রণায় গড়গড় করে সব বলে দেবে।
আমাদের যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে মহারাজ! বলল অপর বন্দী। আমাদের হত্যা করেও আপনি রহস্য জানতে পারবেন না এবং আপনার লজ্জাকর পরাজয়কেও বিজয়ে পরিণত করতে সক্ষম হবে না।
এদের নিয়ে যাও! শিকলে বেঁধে রাখো। আর অন্যগুলোকে হত্যা করে ফেল। রাজা হুকুম দিল।
উভয় কয়েদীকে খাস কামরা থেকে নিয়ে গেল প্রহরী। রাজা পণ্ডিতদের উদ্দেশে বলল, আমি পরাজয়কে বিজয়ে রূপান্তরিত করতে চাই। তোমরা জেনে শুনে জলদি বল এ কাজ কিভাবে করা সম্ভব।
পণ্ডিতরা চলে যাওয়ার পর রাজা জয়পাল তার দুই জেনারেলকে বলল, এ দুই কয়েদীকে লাহোর নিয়ে যাবো। আগামীকাল এখান থেকে আমরা রওয়ানা হব। এদেরকে নেয়ার ব্যবস্থা কর।
এদের কাছ থেকে আপনি কি রহস্য জানতে চান মহারাজ! জিজ্ঞেস করল এক জেনারেল।
আমাদেরকে পরাজয়ের রহস্য আবিষ্কার করতে হবে। সুবক্তগীন আমাদের রণপ্রস্তুতি আর আক্রমণের খবর আগেই জেনে ফেলেছিল। আগাম খবর নিয়ে মুসলমানরা ওঁত পেতে রাতের আঁধারে আমাদের সৈনিকদের মনোবল ভেঙে দিয়েছে। পাহাড়ের আড়ালে ওদের সৈনিকরা আগে থেকে ওঁত পেতেছিল আর রাতে গেরিলা হামলা করেছিল। সুবক্তগীনের গুপ্ত বাহিনী গেরিলা হামলার জন্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। তখন আমরা ছিলাম সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত।
যুদ্ধের রহস্য উন্মোচন করতে হলে আপনাকে আগে খোঁজ নিতে হবে, আমাদের যাত্রা ও প্রস্তুতির খবর কিভাবে গজনী পৌঁছল। সুবক্তগীনের গোয়েন্দারা আমাদের আশেপাশে ঘাপটি মেরে আছে। এদের খুঁজে বের করার ব্যবস্থা আগে করতে হবে মহারাজ!
রাজা জয়পাল বার্ধক্যে উপনীত। উপরন্তু উপযুপরি পরাজয়ের গ্লানিতে তার দেমাগ বিগড়ে গিয়েছিল। অন্য কারো কথা বা পরামর্শ শোনার মতো মানসিকতা তার ছিল না। রাজা পরাজয়ের কারণ নিজে যা বুঝতে পেরেছিল সেরূপ প্রতিকার ব্যবস্থা নিচ্ছিল। কিন্তু পরাজয়ের কারণ যে তার ধারণা ভিন্ন অন্য কিছু, হতে পারে এটা তাকে বোঝনোর ক্ষমতা কারো ছিল না। নেজাম আউরিজী যখন বলল, তাকে হত্যা করলেও যুদ্ধের রহস্য সে ফাস করবে না, এরপর রাজা এদের মুখ থেকে রহস্য উদঘাটনের ফন্দি আঁটতে লাগল। যে করেই হোক রহস্য সে এদের মুখ থেকে বের করবেই।
