এখানে আসার পর এক বিধবা বান্ধবীর সাথে আমার দেখা হয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর দু’বছর যাবত সে এখানে আছে। মুখে সবাই বলে সে সতী-সাধ্বী জীবন যাপন করছে। কিন্তু বান্ধবীটি আমাকে জানিয়েছে, প্রতি রাতেই তাকে কোন না কোন পুরোহিতের সাথে থাকতে হয়। কায়েস…! তুমি আমাকে সাথে নিয়ে চলো। আমি বাকী জীবন তোমার সেবাদাসী হয়ে কাটিয়ে দেবো।
কায়েস ছিল টগবগে যুবক। একটি যুবককে এক পরমা সুন্দরী নিজেকে সমর্পণ করছে। দীর্ঘ সময় বহু কষ্টে সে নিজেকে নীরব এই মোমের কাছে না গলে ধরে রেখেছিল। কিন্তু সরব আগুনের শিখায় কায়েসের না-গলা ধৈর্যের শিকল গলে গেলো।
সে তরুণীকে এড়ানোর জন্য বললো, না, আমি আমানতের খেয়ানত ও করতে পারি না। তবে তোমার এই আবেদনও প্রত্যাখ্যান করতে পারছি না। … আমার হৃদয়টা চিরে যদি দেখো, তাহলে সেখানে একমাত্র তোমারই ছবি আঁকা হয়ে গেছে, এখানে আর কারো ঠাই নেই। তোমাকে আমি আর কারো ও হাতে তুলে দিতে পারবো না। ঠিক আছে, এখন উঠো, চলো।”
ওরা টিলাসম মন্দির থেকে বের হয়ে বাইরের অবস্থা দেখে হয়রান হয়ে গেল। গত রাতের ঝড় ভয়ানক অবস্থা ঘটিয়ে গেছে। গত সন্ধ্যায়ও যেখানে ছিল তাঁবুর সারি, সেখানে আজ আর তাঁবুর কোন চিহ্ন নেই। লোকজন এদিক-সেদিক তাদের আসবাব পত্র তালাশ করছে। সকল তাঁবু লণ্ডভণ্ড। এলোপাতাড়ি গাছপালার ভাঙ্গা ডালপালা সারা এলাকা জুড়ে ছড়ানো। আর চতুর্দিকে শুধুই ধ্বংসের চিহ্ন, আর থৈ থৈ পানি।
কায়েস উষাকে সাথে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে মন্দিরের উপর থেকে নিচে নেমে এলো। তারা উষার বাবা-মার খোঁজে কিছুদূর এগোতেই উচ্চকণ্ঠে ভেসে এলো, “উষা, ঊষা”!!
ঊষা চিৎকার শুনে ওখানেই দাঁড়িয়ে গেল। সে কায়েসকে বললো, এই তো আমার বাবা! এখন আর আমাদের পক্ষে পালানো সম্ভব নয়।”
দীর্ঘদেহী, চওড়া বুকওয়ালা, বিশাল গোঁফধারী শক্ত সামর্থবান এক মধ্যবয়সী লোক দৌড়ে এসে ঊষাকে জড়িয়ে কোলে তুলে নিলো। ঊষাও তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো, বাবা এর নাম জগদীশ। সেই গত রাতে আমার জীবন বাঁচিয়েছে। গতরাতে সে আমাকে নদীর তীর থেকে বেহুঁশ অবস্থায় তুলে এনে এই মন্দিরে রেখে রাতভর জাগ্রত থেকে পাহারা দিয়েছে। উষা এক নিঃশ্বাসে গতরাতের পুরো ঘটনা তার বাবাকে জানাল।
ঊষার কথা শুনে তার বাবা জগদীশরূপী কায়েসকে জড়িয়ে ধরে বললো, বলো বাবা, তুমি কী চাও? তোমাকে আমি উপহার দেবো। তুমি স্বর্ণ চাইতে পারো, ইচ্ছা করলে আমার ঘোড়াটিও চাইতে পারো। যাই চাও, আমি তোমাকে দিয়ে দেবো।”
“আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি। একাজ আমি কোন পুরস্কারের লোভে করিনি। পুরস্কার যদি দিতেই চান, তবে আপনার এই মেয়েটিকেই আমাকে দিয়ে দিন। বললো কায়েস। কারণ, কাউকে না কাউকে তো আপনার এই মেয়ে দিতেই হবে। এটাই হবে আমার জন্য সবচেয়ে দামী পুরস্কার। আমি কেমন মানুষ তা এই সময়ের মধ্যে আপনার মেয়ে ঠিকই জেনে গেছে।
কায়েসের কথা শুনে ঊষার বারা নীরব হয়ে গেল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো, তোমার মতো বীর বাহাদুর যুবকদের আমি সম্মান করি। তোমার দেহ সৌষ্ঠব খুবই সুন্দর। যথার্থ অর্থেই তুমি সুপুরুষ। আমি সেনা অফিসার। বংশগতভাবেই আমরা সৈনিক। তোমার মতো সুপুরুষ যুবকের হাতে আমার মেয়েকে তুলে দিয়ে আমি তোমাকে সেনাবাহিনীতে চাকরী দিতে পারি। কিন্তু আমাদের সেনাবাহিনীর এক উচ্চ কর্মকর্তার সাথে আমার মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে কথা হচ্ছে, এ প্রস্তাবকে আমি প্রত্যাখ্যান করতে পারি না। এ দাবী ছাড়া তুমি অন্য কিছু বলতে পারো।”
“আপনি কোন সেনাবাহিনীতে আছেন?” জানতে চাইলো কায়েস।
“আমি বুলন্দশহরের রাজার সেনাবাহিনীতে আছি।” জবাব দিল ঊষার বাবা।
কায়েস উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবেই ঊষার বাবার সাথে সেনাবাহিনী সম্পর্কে আলাপ শুরু করে দিল। এক পর্যায়ে উষার বাবা সুলতান মাহমূদ সম্পর্কে কথা বলতে লাগল। সে বললো, তাকে পরাজিত ও বন্দী করার জন্যই ভগবান এখনো আমাকে জীবিত রেখেছেন।
বংশগতভাবে এবং পেশাগতভাবে সৈনিক হওয়ার কারণে যুদ্ধ ও সেনাবাহিনী সম্পর্কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা বলছিল ঊষার বাবা। কিন্তু কায়েসের মনে তখন এসব বিষয়ের চেয়ে উষার আগ্রহই প্রবল। ঊষার বাবা কায়েসের সাথে ঊষার বিয়ের ব্যাপারে যখন অসম্মতি জানালো, তখন কায়েস একেবারে চুপসে গেল। তার চেহারা মলিন হয়ে গেলো। মনে হচ্ছিল তার দেহ থেকে যেনো আত্মা বের করে নেয়া হয়েছে।
কায়েস ভাবতে লাগলো। কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে ঊষার বাবা।
ঊষাকে হারানোর যন্ত্রণা কায়েসের বোধজ্ঞান ও কর্তব্য চিন্তাকে ছাপিয়ে তার মানসিক দুর্বলতাকে তুঙ্গে তুলে আনলো এবং তাকে আবেগতাড়িত করে ফেললো।
ঊষার বাবা যদি কায়েসকে বিদায় করে দিতো কিংবা ঊষাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতো, তাহলে কায়েস হয়তো এতোটা প্রভাবিত হতো না। কিন্তু অনিন্দ্যসুন্দরী ও নিবেদিতা কান্তিময় চেহারার অধিকারিনীক উষা তার চোখের সামনেই আবেদনময়ী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল। উষার বাবা খুবই সৌজন্য এবং সৌহার্দ্য মনোভাব নিয়ে কায়েসের সাথে কথাবার্তা বলছিল আর কায়েস ভাবছিল ঊষাকে পাবার ফন্দি কীভাবে করবে।
