“আমি তোমার ধর্মকে অসম্মান করতে চাই না।” বললো কায়েস। এটা আসলে আমার প্রভুর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। সে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ পাথরের তৈরী মূর্তির পূজারীদের উপর বর্ষিত হচ্ছে। এই ঝড় আল্লাহর নির্দেশে হচ্ছে। সেই আল্লাহর পক্ষ থেকেই আমি শক্তি ও সাহস পেয়েছি। যার ফলে এমন কঠিন অবস্থার মধ্যেও আমি তোমাকে কাঁধে তুলে এখানে নিয়ে আসতে পেরেছি।
কায়েস সাধু-সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করে গঙ্গাতীরে গিয়েছিল। তার পরনে ছিল একটি লেজুট মাত্র। তার মুখে ছিল কৃত্রিম দাড়ি এবং সারা শরীরে ছাইভস্ম মাখানো ছিল। ঝড়বৃষ্টি তার শরীরের কৃত্রিম সব আবরণ ধুয়ে ফেলল এবং লেজুট কোথাও খুলে পড়ে গেল।
তরুণী তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি বিবস্ত্র কেন?
সে তরুণীর প্রশ্নের জবাবে জানাল, তুফানের আগমুহূর্তে সে নদীতে গঙ্গাস্নান করতে গিয়েছিল। তীরে কাপড় রেখে সে গঙ্গাস্নানে নেমেছিল। এরপরই তুফান শুরু হয়ে যায় এবং ঝড় তার তীরে রাখা কাপড় উড়িয়ে নিয়ে যায়। অতঃপর জীবন বাঁচাতে সে এদিকে দৌড়াতে শুরু করে।
কায়েস তরুণীকে জানালো, সে মাথুরায় মেলা দেখতে এসেছিল। সে তরুণীকে জিজ্ঞেস করল, তোমার বাড়ী কোথায়?”
জবাবে তরুণী বুলন্দ শহরের কোন একটা জায়গার নাম বললো। তরুণী আরো জানালো, তাদের গোটা পরিবারই এই উৎসবে এসেছে। তার বাবাও তাদের সাথে আছে। শহরের বাইরে ছিল তাদের তাঁবু।
.
কায়েস তরুণীকে জানাল, এখন আর সেখানে কোন তবু পাওয়া যাবে না এবং গোত্রের কোন লোককেও সেখানে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আজ রাত এখানেই কাটাতে হবে।
যদি কিছু মনে না করো, তাহলে আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। আবেদনের সুরে থেমে থেমে বললো তরুণী।
তুমি একজন তরুণ যুবক। আর আমি তরুণী। এখনো আমার বিয়ে হয়নি…। রাতটা আমাদের এখানেই কাটাতে হবে।
তরুণীর কণ্ঠে ছিল নিজেকে সমর্পণের আবেদন।
কায়েস বলল, দেখো, আমি নিজের জন্য তোমাকে তুলে আনিনি। তোমার মা-বাবার কাছে তোমাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্যই তোমাকে এনেছি…। আমি তোমার কাছ থেকে একটা প্রতীজ্ঞা নিতে চাই।… আমি যে মুসলমান একথা কাউকে জানাতে পারবে না। আমি মুসলমান জানতে পারলে হিন্দুরা আমার সাথে খুবই দুর্ব্যবহার করবে। আমি জগদিশ নামে পরিচয় দেব।’
তরুণীর নাম ছিল ঊষা। ইতোমধ্যে তাদের উভয়েই উভয়ের প্রকৃত নাম জেনে গেছে। ঊষা কায়েসের প্রতিটি শর্ত এবং প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য শপথ করে নিল।
অতঃপর তারা সেই ভগ্নমন্দিরেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিল। ক্লান্ত-শ্রান্ত যুবতী ঊষার দুচোখ ভেঙে ঘুম আসলেও বারবার তার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। তুফানের ভয়ে ভাঙেনি, ভাঙছিল পরিচয় পাওয়া এই ভিন্নধর্মী মুসলমান যুবকের সংস্পর্শে রাতযাপনের ভয়ে।
আধো ঘুম আধো জাগ্রত অবস্থায় রাতের দ্বিপ্রহর কাটিয়ে শেষ প্রহরে উষার এমন ভারী ঘুম এলো যে, সে যখন ঘুম থেকে চোখ খুললো, তখন তার কক্ষ দিনের আলোয় আলোকিত হয়ে গেছে।
কায়েস সেই কক্ষের দরজায় বসে ঘুমন্ত ঊষাকে দেখছিল। রাতের ঝড় রাতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। সকাল বেলায় সূর্য উঠলো ঝলমলে আকাশে প্রখর রৌদ্র-প্রতাপ নিয়ে। গত রাতের কেয়ামতের আলামত দিনের বেলার আকাশে মোটও ছিল না।
ঘুম থেকে উঠে অনেক বিস্ময়ে ঊষা কায়েসকে দেখছিল এবং কায়েসও মুগ্ধনয়নে ঊষার দিকে তাকিয়ে ছিল। কায়েস অবাক হচ্ছিল ঊষার রূপ-সৌন্দর্য দেখে। জীবনে সে এমন সুন্দরী মেয়েলোক দেখেনি।
আর উষা অবাক হচ্ছিল কায়েসের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও তার রূপ-যৌবন, দৈহিক সৌন্দর্য ও সুঠাম-সবল দেহসৌষ্ঠব দেখে। সবচেয়ে বেশী বিস্ময়ের কারণ ছিল, এমন একটি টগবগে তরুণ তার মতো তরুণীকে কাছে পেয়েও একটু স্পর্শ পর্যন্ত করেনি। অথচ কোন হিন্দু যুবকের বেলায় এমনটি ভাবা যেতো না।
বিস্ময়ের ঘোর দূর হতেই নীরবতা ভেঙে কায়েস ঊষার উদ্দেশে বললো, এখন তোমার বাবা-মাকে খুঁজে বের করার পালা। উঠো, এখন তাদের খুঁজতে বের হই।
ঊষার তখনো বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি। সে শোয়া থেকে উঠার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলো না। ঊষার চোখে কৃতজ্ঞতাবোধ ছাড়াও অন্য ব্যাপার ছিল। কায়েস তাকে আবারো তাড়া দিল। কিন্তু তবুও সে উঠলো না। কায়েস তার দিকে গ্রসর হয়ে কাছে গিয়ে বসল। পূর্ববৎ শোয়া অবস্থায়ই উষা বললো, “তুমি আমাকে জীবন দিয়েছে। তুমি কি এভাবে বাকী জীবনটা আমাকে নিরাপত্তা ও সুখ দিতে পারো না?”
ঊষার এ কথায় কায়েস কোন জবাব দিলো না।
“দেখো, তুমি আমাকে রাতের বেলায় আকস্মিক পেয়েছে, এটা আমার কাছে স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।” বললো ঊষা। এটাও আমার কাছে স্বাভাবিক ঘটনা নয় যে, তুমি এরপরও আমার গায়ে হাত দাওনি।
তুমি আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেও সেই বুড়োটার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না, যার সাথে আমার বিয়ের কথা পাকাঁপোক্ত হয়ে রয়েছে। দয়া করে তুমি আমাকে সাথে নিয়ে যাও…। হিন্দু নারীদের জীবন পুরুষের পদতলেই থাকে।
হিন্দু মেয়েদের পিতা-মাতা যার সাথে ইচ্ছা বিয়ে দিয়ে দেয়। স্বামী যদি মারা যায়, তাহলে সহমরণ হিসেবে স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দিতে হয়। যদি তা না করে, তাহলে আজীবন বিধবার বেশ ধারণ করে এই মাথুরার মন্দিরে কাটাতে হয়।
