এক পর্যায়ে ঊষার বাবা গযনীর গোয়েন্দা প্রসঙ্গে আলাপ শুরু করে দিল। বললো, “এরা খুবই ভয়ানক, আমাদের মেলার মধ্যেও এরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওরা আমাদের দুর্বলতাগুলো সময়ের আগেই মাহমুদকে জানিয়ে দেয়। ফলে মাহমূদ আমাদের দুর্বল জায়গাগুলোতেই আঘাত করে।
আমাদের সেনাবাহিনীতে গযনীর গোয়েন্দা পাকড়াও করার জন্য মোটা অংকের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। আমি যদি কোন মুসলিম গোয়েন্দাকে ধরতে পারি, তাহলে তাকে আমি জীবিতাবস্থায় আমার রাজার কাছে পেশ করবো না। তার মাথাটা কেটে নিয়ে যাব।
একথা শুনে চিন্তিত কায়েসের চিন্তার অবসান হয়ে গেল। সে এবার উষাকে পাবার একটা সোজা পথ পেয়ে গেল। এদিকে উষা একথা শুনে তার বাবার আড়ালে দাঁড়িয়ে কায়েসের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মুচকি হাসল।
এই মুচকী হাসি ঊষাকে পাবার কায়েসের আকাভক্ষাকে আরো তীব্র করে তুললো। কায়েস বলে বসলো, “আমি যদি আপনাকে দু’-তিনজন মুসলিম গোয়েন্দা ধরিয়ে দিই, তাহলে কি আমি আপনার কাছে যা দাবী করেছি তা দেবেন?”
আরে তুমি গযনীর গোয়েন্দা পাকড়াও করবে কিভাবে?”
“এ ব্যাপারে আপনি আমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।” বললো কায়েস। আপনি তাদের ধরবেন এবং তাদের জীবিত রাখবেন। তাদের জীবিত রাখলে এদের দেয়া তথ্য দিয়ে আপনি গযনীর আরো গোয়েন্দাদেরকে ধরতে পারবেন।”
“কবে ধরিয়ে দেবে তুমি?” জানতে চাইলো উষার বাবা। ওরা কোথায় আছে”
“এখনই ধরিয়ে দেবো…! আজকের মধ্যেই।” জবাব দিল কায়েস।
“ওরা এই মেলাতেই আছে। যদি আমি তাদের ধরিয়ে দিতে না পারি, তাহলে আপনি আমার মাথা উড়িয়ে দেবেন।”
“সত্যিই যদি তুমি তাদের ধরিয়ে দিতে পারো এবং ধরা পরার পর ওরা গযনীর গোয়েন্দা প্রমাণিত হয়, তাহলে মাথুরার বড় মন্দিরে অনুষ্ঠান করে আমার মেয়েকে আমি তোমার হাতে তুলে দেবো। কিন্তু রাজার কাছ থেকে
পুরস্কার কিন্তু আমি নেবো। তাতে আমার প্রমোশন হবে। আমি আরো বেশী সৈন্যের কমান্ডার হয়ে যাবো।”
“ঠিক আছে, আমি রাজি। আমার সাথে চলুন।”
***
গত একটি রাত কায়েসের সাথে হিশাম ও তাশকীনের কোন দেখা-সাক্ষাত হয়নি। হিশাম ও তার আরো দুই সহকর্মী দিনের বেলায় হন্যে হয়ে কায়েসকে খুঁজছিল। তারা সাধুর বেশ ধারণ করেই তুফানের মধ্যে এক মন্দিরে রাতযাপন করেছে।
সন্ধ্যায় কায়েস তাদের আস্তানায় ফেরেনি। তাই দিনের বেলায় তার সহকর্মীরা তাকে তালাশ করতে লাগল । গত রাতের তুফান সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়ার ফলে সেখানে কাউকে খুঁজে পাওয়া সহজ ছিলো না। সারা শহরের গলি ঘুপছিতে হাজার হাজার মানুষ ঠাই নিয়ে ছিলো। শহর ও শহরতলী কাদা পানিতে একাকার হয়ে পড়েছিল।
দুপুরের দিকে এক সঙ্গীর সাথে হিশামের দেখা হলো। সে হিশামকে জানালো কায়েসকে সে দেখেছে। সে সাধুর বেশে নেই। সে এমন পোশাক গায়ে জড়িয়েছে যে, দেখে এটিকে তার নিজের পোশাক মনে হয়নি। তার সাথে আরেকজন লোক আছে। লোকটির অবয়ব ও শারীরিক গঠন থেকে বোঝা গেছে সে সেনাবাহিনীর কোন কর্মকর্তা। তার কোমরে তরবারী ঝুলানো। পোশাকে কয়েকটি পদবীর চিহ্ন। লোকটিকে দেখে আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে। একথা শুনে হিশাম তার সঙ্গীকে বললো, “তুমি আমাদের সাথীদেরকে লুকিয়ে যেতে বলো।”
কায়েসের এক সঙ্গী কায়েসকে দূর থেকে দেখেই সতর্ক হয়ে গিয়েছিল। কারণ, কায়েসের পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল সন্দেহজনক। তার সঙ্গে থাকা লোকটির ভাবভঙ্গিতে সন্দেহ আরো প্রকট হয়ে উঠেছিল। এসব গোয়েন্দাদের স্বভাব হলো এরা সবকিছুকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। কায়েসের অবস্থা সংশয়পূর্ণ হওয়ায় সে কায়েসের দৃষ্টির আড়ালে থেকে সেখান থেকে সটকে পড়েছিল।
ঊষার বাবা কায়েসকে সাথে করে তাদের স্বজনদের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। তারা ঝড়ের মধ্যে যেখানে রাতযাপন করেছিল। সেখানে সে কায়েসকে তাদের কাপড়-চোপড় পরিয়ে তার সঙ্গীদের ধরার জন্য বেরিয়ে পড়ল।
সঙ্গীর কাছে কায়েসের সন্দেহজনক অবস্থার কথা শুনে তাশকীনের সতর্কবাণী মনে পড়ল হিশামের। তাশকীন তাকে স্বপক্ষের স্থানীয় গোয়েন্দাদের উপর বেশী আস্থা ও নির্ভরতা না রাখার পরামর্শ দিয়েছিল। কারণ, এখানকার মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরে হিন্দুদের শাসনাধীনে থাকার ফলে হিন্দুদের খাতির তোয়াজ করার অভ্যাসের কারণে সহজেই হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যায়।
হিশাম তার গোপন আস্তানায় গিয়ে শরীর থেকে সন্ন্যাসীর বাহ্যিক রূপ খুলে ফেলল। শরীরে লাগানো ছাই-ভষ্মের প্রলেপ ধুয়ে ফেলল এবং হাজার দানার মালা, ত্রিশূল, লাঠি এবং জটাধা কৃত্রিম দাড়ি খুলে কাপড় বদল করে হিন্দু সৈনিকের পোশাক গায়ে জড়াল। সে একটি খঞ্জর কোমরে গুঁজে কায়েসের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।
অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর হিশাম কায়েসকে দেখতে পেল। উষার বাবার সাথে একটি পুরনো দালানের বাইরে আঙিনার একটি খুঁটির সাথে হেলান দিয়ে সে বসে আছে। হিশাম ভিন্নপথে পুরনো দালানের ভেতরে প্রবেশ করে এদিকে এলো যে কক্ষের বাইরে কায়েস বসে আছে।
কক্ষের একটি জানালার দিকে পিঠ দিয়ে কায়েস ও উষার বাবা বসা ছিল। তারা বাইরের দৃশ্য এবং গমনাগমনরত লোকজনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। হিশাম নিঃশব্দে সেই জানালার কাছে গিয়ে বসে পড়ল। হিশামের বসার জায়গা থেকে কায়েস ও উষার বাবার দূরত্ব তিন-চার হাত মাত্র।
