এর ফলে এখানকার মা-বোন-স্ত্রীরা তাদের স্বামী-পুত্র ভাইদের সেনাবাহিনীতে যেতে দেবে না। তারা কিছুতেই চাইবে না, তাদের ঘর উজাড় করে আপনজনেরা বেঘোরে মুসলমানদের হাতে প্রাণ বিজর্সন দিক…। আচ্ছা তুমি ওখানে কী করছো তাশকীন?”
“কনৌজের মহারাজার ভবিষ্যত পরিকল্পনা জানার ও বোঝার চেষ্টা করছি।’ বললো তাশকীন। মহারাজা সুলতানের প্রতি খুবই ক্ষুব্ধ। যেসব রাজা-মহারাজা গযনী বাহিনীর হাতে পরাজতি হয়েছে, তাদের খুবই গালমন্দ করে। এখানে ভারতের অধিকাংশ রাজা-মহারাজারা এসেছে। তাদের একটা বৈঠক হবে। সেই বৈঠকে তারা ভবিষ্যত কর্মসুচী ঠিক করবে। তখন বোঝ যাবে, তারা কী করতে চায়?”
“সুলতানের পক্ষে এখনই কোন অভিযানে বের হওয়া সম্ভব নয় তুমি কি সেই খবর জানো তাশকীন? বললো হিশাম।
‘হ্যাঁ, খাওয়ারিজমে সুলতানের খুবই রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধ করতে হয়েছে। হিশামের অসমাপ্ত কথা পূর্ণ করে বললো তাশকীন। এসব খবর যথাসময়েই আমি পেয়েছি।
সুলতানও জানেন, লাহোরের মহারাজা ভীমপাল কনৌজের মহারাজাকে সুলতানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য উৎসাহ দিচ্ছে। আমার এখানে আসতে হয়েছে কনৌজের মহারাজার তৎপরতা জানার জন্য।
এরা কি গযনী আক্রমণ করতে চায়? না ভারতের সব রাজা মহারাজারা ঐক্যবদ্ধ সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে সুলতানকে হুমকি দিতে চায়? এরা হয়তো সম্মিলিতভাবে সেনা সমাবেশ করে সুলতানকে পরাজতি করার চেষ্টা করবে। আমার কাজ হলো এখানকার রাজা মহারাজাদের সামরিক শক্তির আন্দাজ করা এবং এরা কি সামরিক কৌশল নেয় তা জানা।”
“ও, এজন্যই হয়তো আমাদের বলা হয়েছে, মাথুরার হিন্দু সমাবেশে জনগণের মধ্যে গযনী বাহিনী সম্পর্কে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে।”
“এখন তুমি চলে যাও। বললো তাশকীন। মনে রেখো, স্থানীয় গোয়েন্দা মুশরেকদের উপর এতোটা নির্ভরশীলতা ঠিক নয়। এদেরকে কৌশলে ব্যবহার করো।”
* * *
সে দিন সন্ধ্যায় চতুর্দিক অন্ধকার করে কাকের চোখের মতো নীল হয়ে গেল আকাশ। সেদিন মাথুরায় আগত সকল রাজা-মহারাজাদের দাওয়াত ছিল কনৌজের মহারাজার আস্তানায়।
মহারাজা কনৌজের রাজকীয় তাঁবুতে নানা বর্ণের ফানুস ও বাহারী শামিয়ানা দিয়ে সাজানো হলো। কনৌজ মহারাজার তাঁবু ছিলো বিশাল জায়গা জুড়ে। এর ভেতরে নিরাপত্তারক্ষী, রাণীদের থাকার কক্ষ, রাজার বৈঠকখানা, মহারাজার আরামের কক্ষ, সেবক সেবিকাদের থাকার কক্ষ, নর্তকী, গায়ক বাদকদলের জন্য আলাদা থাকার রুম ছিল। তবু তো নয়, যেন বিশাল ময়দান জুড়ে এক রাজমহল।
জিয়াফত অনুষ্ঠানে রাজা মহারাজাদের শরাব পান করানোর জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল সুন্দরী যুবতী ও প্রশিক্ষিত তরুণী। এরা অর্ধনগ্ন পোশাকে সজ্জিত হয়ে রাজ-মহারাজাদের আপ্যায়ন করছিল।
অধিকাংশ রাজা-মহারাজাদের সাথে ছিলো দু-তিনজন করে রাণী। অনেক রাজা-মহারাজার একান্ত নিরাপত্তারক্ষীও তাদের সাথেই ছিল। আমীর বিন তাশকীন একান্ত নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কনৌজের মহারাজার পেছনে সশস্ত্র অবস্থায় দণ্ডায়মান ছিল। খাবার-দাবার চলার সময় চম্পারাণী আড়চোখে বারকয়েক জগন্নাথরূপী আমীর বিন তাশকীনকে দেখে নিল। কিন্তু তাতে তাশকীনের কোন ভাবাবেগ ঘটলো না, সে মন্দিরের পাথুরে মূর্তির মতোই নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল।
আহারপর্ব শেষ হলে বাদ্যযন্ত্রের বাজনা শুরু হলো। বাজনার আওয়াজ যখন উচ্চাঙ্গে উঠলো, তখন মঞ্চের এক কোণ থেকে সাদা ওড়না গায়ে জড়িয়ে পায়রার মতো পাখনা মেলে নাচের মুদ্রায় দৃশ্যমান হলো এক নর্তকী।
ঠিক এই সময়ে বজ্রপাতের মতো গর্জে উঠলো এক রাশভারী কণ্ঠ- “বন্ধ করো এসব পাপাচার!”
সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেলো বাদকদলের উন্মাতাল বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ আর নিমিষেই অদৃশ্য হয়ে গেলো নর্তকী।
সবাই অবাক চোখে দেখলো মঞ্চের মাঝখানে মাথুরার বড় মন্দিরের প্রধান পুরোহিত অগ্নিমূর্তি ধারণ করে দণ্ডায়মান। ক্ষোভে তার ঠোঁট কাঁপছে। দুচোখে যেন আগুন ঠিকরে পড়ছে। প্রধান পুরোহিতের এই অগ্নিমূর্তি দেখে রাজা-মহারাজা ও রাণীদের এই প্রমোদ মহলে নীরবতা নেমে এলো। আবারো ধ্বনিত হলো গম্ভীর কণ্ঠ “স্বঘোষিত নির্ভীক মহারাজা ভীমপাল গযনীর সুলতানের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজতি হয়ে তার সাথে অধীনতামূলক চুক্তি করেছে। তোমরা কি এর জন্য উৎসব করছো?’ ক্ষুব্ধ পুরোহিত কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে বললো।
তোমরা কি দেবদেবীদের অপমানের আনন্দ-উৎসব করছো? তোমাদের ধর্মালয় মন্দিরগুলোর উপর দিয়ে মুসলমানরা তাদের জঙ্গী ঘোড়া ছুটিয়েছে। এজন্য কি তোমরা নর্তকীদের সাথে নিয়ে এসেছো?
রাজপুতদের তাজা রক্ত বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে এজন্য আনন্দ করছো তোমরা? নর্তকী নাচিয়ে কী আনন্দ করবে, তোমরা নিজেরাই পায়ে নূপুর আর হাতে চুড়ি পরে নাচো…।”
“আমাদের ক্ষমা করে দিন পণ্ডিত মহারাজ।” এক রাজা দাঁড়িয়ে দু’হাত জোড় করে বললো। আজ আমরা এই ফায়সালা করার জন্যই একত্রিত হয়েছি- গযনী বাহিনীকে কী করে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দেয়া যায়?”
“তোমাদের সবার উপর শ্রীকৃষ্ণ ও বাসুদেবের গজব আসি আসি করছে। তোমাদের কারণেই আবারো ভারতের মাটিতে অগণিত মুহাম্মদ বিন কাসিম জন্ম নিচ্ছে। এ কারণে তোমরা দেবদেবীদের অভিশাপ থেকে রেহাই পাবে না।”
