বহির্দিশে গোয়েন্দাকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদেরকে গযনী সালতানাতে মুশরেফ’ বলে ডাকা হতো। সুলতান মাহমূদের গোয়েন্দা বিভাগের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা স্থানীয় লোকদেরও তাদের পক্ষে চর নিয়োগ করতে এবং তাদেরকে বিপুল আর্থিক ভাতা দিতো।
সন্ন্যাসীরূপী এই দুজনের নেতা ছিল গযনীর গোয়েন্দা বিভাগের অন্যতম কর্মকর্তা হিশাম সমরকন্দী। মাথুরায় ভারতের বিপুলসংখ্যক হিন্দু সমাবেশ ঘটতে যাওয়ার খবর শুনে তাকে মুলতান থেকে মাথুরায় পাঠানো হয়। সে স্থানীয় লোকদের সাথে নিয়ে সন্ন্যাসীরূপে তীর্থযাত্রী হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানদের সম্পর্কে আরো আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে লাগল।
হিশামের সঙ্গী সন্ন্যাসীরূপী অপর গোয়েন্দা ছিল মুলতানের অধিবাসী কায়েস। তারা দুজন ছাড়াও আরো দু’জন মুলতানী মাথুরায় তৎপর ছিল। তারা হিন্দু সমাবেশের কোথাও ছদ্মবেশ ধারণ করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।
হিশাম ভিড়ের মধ্যে জগন্নাথরূপী আমীর বিন তাশকিনকে চিনে ফেলে। কারণ, তারা উভয়েই ছিল গযনীর অধিবাসী। কিন্তু কর্মসূত্রে হিন্দুস্তানে এই তাদের প্রথম সাক্ষাত। কিন্তু কায়েস তাশকীনকে চিনতো না। এরা প্রত্যেকেই স্থানীয় হিন্দুদের রীতি-রেওয়াজ ও কৃষ্টিকালচার নিপুণভাবে রপ্ত করেছিল। হিন্দু ধর্মের খুটিনাটি সম্পর্কেও তারা ছিল জ্ঞাত।
‘তোমার ঠিকানা কোথায়? তাশকীনকে জিজ্ঞেস করল হিশাম। কাজের কাজ কিছু করতে পেরেছো?
“আমি চলে যাচ্ছি। হিন্দুর বেশ ধারণ করে এখানে এসেছিলাম, এখন কাজ শেষ করে চলে যাচ্ছি।” বললো তাশকীন।
আরে! তুমি আমাদের কাছে নিজেকে আড়াল করছো কেন? হেসে বললো হিশাম। আমি তোমাকে মহারাজা কল্লৌজের সাথে দেখেছি। তুমি হয়তো তার নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে। তোমাকে দেখে কিন্তু তুমি যে ধরিআমাদের তাশকীন তাতে মোটেও সন্দেহ হয়নি। তোমাকে তো আমি উস্তাদ মনে করি।”
“আমাদের তিনজনের একসঙ্গে এক জায়গায় বসে থাকা ঠিক হচ্ছে না।” বললো তাশকীন। কায়স! তুমি একটু ঘোরাফেরা করো । রাতে আবার আমরা একসঙ্গে মিলিত হবো।”
কায়েসের চলে যাওয়ার পর আমের বিন তাশকীন হিশামের উদ্দেশ্যে বললো, হিশাম! তুমি তো আস্ত একটা বোকা দেখছি। তুমি স্থানীয় লোকদের উপর এতোটাই আস্থা ও বিশ্বাস রাখো যে, আমার মতো স্পর্শকাতর অবস্থানে থাকা ব্যক্তির কথাও তুমি তাকে জানিয়ে দিলে? তাকে কি তুমি গুরুত্বপূর্ণ কাজে পরীক্ষা করেছো? সে কি কোন জটিল কাজ সমাধা করেছে?
“লোকটি নির্ভরযোগ্য। অবশ্য তাকে এখনো স্পর্শকাতর কোন কাজে ব্যবহার করিনি।” বললো হিশাম।
“আল্লাহ যেনো তাকে নির্ভরযোগ্য রাখেন। বললো তাশকীন। তবে মনে রাখবে হিশাম! আমাদের কাজ খুবই স্পর্শকাতর ও জটিল। তুমি তো জানোনা এ কাজে নিজের আবেগ, উচ্ছ্বাস, অনুভূতিকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আর এই আবেগ সে-ই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যার মধ্যে পরিপূর্ণ ঈমান আছে এবং যারা আমাদের মতো জাতির প্রতি দায়বদ্ধ।
হিন্দুস্তানের কোন মুসলমানের উপর এতোটা ভরসা করা যায় না। এসব লোক দীর্ঘদিন ধরে হিন্দুদের যাতাকলে নিষ্পেষিত । এরা হিন্দুদের প্রভাবে খুব অল্প সময়েই প্রভাবিত হয়ে যায়। এরা হিন্দুদের কুসংস্কার ও হিন্দু কালচার খুব সহজেই গ্রহণ করে ফেলে। নিজেদের অক্ষমতা ও নানা অসুবিধার শিকার হলে এরা হিন্দুদের সন্তুষ্ট করার জন্য উদগ্রীব হয়ে যায়।
এখানকার কোন মুসলমানকে নির্ভরযোগ্য মনে হলেও আমার মতো জটিল কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের তথ্য দেয়া ঠিক নয়। কারণ, এখানকার হিন্দু শাসকরা সামান্য সন্দেহ হলেই মুসলমানদের ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়, তাদের নির্বিচারে হত্যা করে।
“ঠিক আছে, আমি ওকে আরো পাকাঁপোক্ত করে নেবো।’ বললো হিশাম।
হিশাম, এ লোক আমাকে কনৌজের মহারাজার সাথে দেখেছে। এখন সে আমার পরিচয়ও জেনে গেছে। সে যদি কোন কারণে হিন্দুদের হাতে ধরা পড়ে অথবা হিন্দুদের পক্ষ থেকে লোভনীয় কোন উপঢৌকনের টোপ পায়, তাহলে সে আমাকে ধরিয়ে দিতে পারে। যে কোন অবস্থায় তার জন্য আমি মোটা অংকের শিকার।
একটু ভেবে দেখো! আমি কনৌজের মহারাজার একান্ত নিরাপত্তা রক্ষী। সবাই আমাকে জগন্নাথ বলেই জানে। এমতাবস্থায় আমাকে যদি কেউ স্বরূপে ধরিয়ে দিতে পারে, তাহলে মহারাজা তাকে তার দেহের ওজন পরিমাণ হীরা-জহরত উপঢৌকন দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না।
‘তুমি যদি তাকে সন্দেহ করো, তাহলে আজই আমি তাকে হত্যা করে লাশ গায়েব করে ফেলবো।’ বললো হিশাম। আমি এখন আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি দুঃখিত।
‘না, সংশয়ের বশীভূত হয়ে কারো জীবনহানি ঘটানো ঠিক হবে না।’ বললো তাশকীন। এর চেয়ে বরং তার উপর কড়া দৃষ্টি রাখো এবং তাকে ঈমান ও উদ্দেশ্যে সম্পর্কে আরো পাকাঁপোক্ত করার চেষ্টা করো।
‘আমরা যা করছি, তা তোমার কাছে কি ভালো লেগেছে। তাশকীনের কাছে জানতে চাইলে হিশাম। এখানকার সাধারণ মানুষজনকে মন্দিরের পুরোহিত এবং পণ্ডিতরাই আতঙ্কিত করে ফেলেছিল। এর উপর আমরা আতঙ্কের মাত্রাটি আরো বাড়িয়ে দিলাম।
এখানকার লোকেরা হিন্দু সাধু-জ্যোতিষী-সন্ন্যাসী- গণকদের সর্বৈব মিথ্যা কথাগুলো সম্পূর্ণ সত্য বলে বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে আমরা সন্ন্যাসীরূপ ধারণ করে তাদের বোঝাচ্ছি, মাহমূদ গযনবীর কাছে জিন ভূত থাকে। এসব জিন-দানবেরা সামরিক-বেসামরিক সব ধরনের প্রতিপক্ষকে গ্রাস করে আর সামনে দুর্গ-দেয়াল-পাহাড়-পর্বত যাই থাকুক না কেন সবকিছু তছনছ করে ফেলে…।
