পণ্ডিতের কথা শেষ হতে না হতেই আকাশে তুমুল মেঘের গর্জন শোনা গেল। সন্ধ্যার আগ থেকেই আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছিল এবং চারদিকে নেমে এসেছিল ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। হালকা বিজলীও চমকাচ্ছিল। কিন্তু মেঘের তর্জন গর্জন বেড়ে দেখতে দেখতে তীব্র হয়ে উঠলো আকাশের গর্জন। এরই মধ্যে পণ্ডিত রাজা-মহারাজাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছিল এবং তাদেরকে সনাতন ধর্ম রক্ষায় অবহেলা ও উদাসীনতার জন্য দোষারোপ করছিল। রাজা মহারাজাদেরকে পণ্ডিত দেবদেবীদের অভিশাপের ভয় দেখাচ্ছিল।
হঠাৎ ঝুলন্ত ঝাড়বাতিগুলো খুব জোরে দুলে উঠলো এবং টাঙানো শামিয়ানার সাথে হোঁচট খেলো। শামিয়ানাগুলো উপরে উঠে গেল তীব্র বাতাসের ধাক্কায়। দেখতে দেখতে এমন তীব্র বাতাস বইতে শুরু করলো যে, তাঁবুগুলোকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে তীব্র বাতাস রূপ নিলো প্রচণ্ড ঝড়ের। ঝড়ের তাণ্ডবে জ্বলন্ত ফানুসগুলো নিচে আছড়ে পড়ল এবং চতুর্দিকে তেল ছড়িয়ে পড়ল, শামিয়ানাগুলো ছিঁড়তে শুরু করলো। জ্বলন্ত ফানুস ও জ্বলন্ত মশালের আগুনে ছিঁড়ে পড়া শামিয়ানা ও তাঁবুতে আগুন ধরে গেল। প্রচণ্ড ঝড়ের সাথে এমন তীব্র বিজলী ও কানফাটা মেঘের গর্জন ও বজ্রপাত শুরু হলো, যেনো আসমান ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।
ভেঙেপড়া ফানুস এবং মশালের আগুনে ছিঁড়ে যাওয়া তাঁবুর কাপড়ে আগুন ধরে গেলে বাতাস তা চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিল । আগুনের ধোয়া আর তীব্র ঝড় ও ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে কেউ কাউকে দেখার উপায় ছিলো না।
এরই মধ্যে পণ্ডিতের কণ্ঠে শেষবাক্য উচ্চারিত হলো, এই দেখো বিষ্ণুদেবের অভিশাপ ঝড়ের রূপে এসে গেছে।
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব ও আতঙ্কিত সকল রাজা-মহারাজা নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য যে যেদিকে পারল দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু ততক্ষণে বজ্রপাত ও বিজলীর সাথে শুরু হয়েছে ভারি বর্ষণ।
তীব্র ঝড়ের শনশন আওয়াজ, ভারি বৃষ্টি আর মেঘের গর্জনের সাথে বর্জপাতের আওয়াজ মিলে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হলো।
অদূরে বাঁধা রাজা-মহারাজাদের হাতি ও ঘোড়াগুলো আতঙ্কিত চিৎকার ও হেষারব করতে লাগল। অবস্থা আরো গুরুতর হয়ে উঠলো। প্রবল বৃষ্টি যখন তাঁবুর জ্বলন্ত আগুন নিভিয়ে দিল এবং তুফানে ছেঁড়া-ফাটা তাঁবুর খুঁটি উড়তে শুরু করলো।
রাজা-মহারাজাদের একান্ত নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের মনিবদেরকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাণবাজী রেখে সবাই দৌড়ে অকুস্থলে পৌঁছালো। এরই মধ্যে শোনা যাচ্ছিল মহারাজা কনৌজের দরাজ কণ্ঠ, জগন্নাথ! যেখানেই থাকো, চম্পারাণীকে মন্দিরে নিয়ে যাও।
সেখান থেকে মন্দির ছিল অনেক দূরে। সবাই যে যার মতো করে শহরের দিকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটছিল। গোটা তাঁবু এলাকায় দৌড় ঝাঁপ শুরু হয়ে গেল।
এমতাবস্থায় তুফানের আঘাতে ঘন গাছগাছালীতে আকীর্ণ মাথুরার গাছপালগুলো ভেঙে পরতে শুরু করেছে। ভাঙা গাছের ডাল মাটিতে আঁছড়ে পড়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। তাশকীন রাজার বলার আগেই চম্পাকে তার আয়ত্ত্বে নিয়ে এসেছিল এবং কাঁধে তুলে মন্দিরের দিকে ছুটছিল।
শহরের চতুর্দিকে আগত লাখো হিন্দু তীর্থযাত্রীর অস্থায়ী তাঁবু ছিল। অনেক লোক তাঁবু ছাড়াই খোলা আসমানের নিচে আসবাবপত্র নিয়ে অবস্থান নিয়েছিল। এসব লোক তাদের আসবাবপত্র ঝড়ের দয়ার উপর ছেড়ে দিয়ে জীবন বাঁচাতে ঝড়ের শুরুতেই শহরের দিকে দৌড়াতে শুরু করে দিল। শহরবাসী তীর্থযাত্রীদেরকে আশ্রয় দেয়ার জন্য বরবাড়ীর দরজা খুলে দিয়েছিল। মাথুরার প্রতিটি মন্দির ছিল খোলা। মানুষজন মন্দিরেও আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছিল।
ঝড়ের তাণ্ডব তখন বেড়েই চলছে। সেই সাথে তীব্র বৃষ্টি, বিজলী আর বজ্রপাতের সাথে আহত-আতঙ্কিত মানুষের আর্তচিৎকার শুরু হয়ে গেল।
আতঙ্কিত শিশু, নারী ও আহতদের চিৎকারে গোটা মাথুরা এলাকা যেনো নরকে পরিণত হলো।
দৃশ্যত এ তুফান যেনো কেয়ামত হয়ে উঠেছিল। এই তুফানের মধ্যে হিশামের সহযোগী মুলতানের অধিবাসী কায়েস নদীর তীর থেকে শহরের দিকে আসছিল। সে ছিল একাকী। তীব্র তুফানের আওয়াজ, বিজলীর ঝলক আর মেঘের গর্জনের মধ্যে অতি নিকট থেকে তার কানে ভেসে এলো কোন নারী বা শিশুর আর্তচিৎকার।
বিজলীর আলোয় তার সামনের একটি গাছের গোড়ায় একটি নারীর মতো নজরে পড়লো এবং ওখান থেকে আবারো আর্তচিৎকার শোনা গেল। আর্তচিৎকার শুনে তীব্র বাতাসের ধাক্কা সামলে কায়েস সেদিকে দৌড়াল। গিয়ে ডালপালা উড়ে যাওয়া একটি গাছের গোড়ায় এক মহিলাকে আতঙ্কিত অবস্থায় দেখতে পেল। মহিলা ভয়ে তীরবিদ্ধ পাখির মতো কাঁপছে।
ভয় পেয়েছো? তুমি এখন আর একা নও, আমি তোমার সাথে আছি। আতঙ্কিত নারীকে অভয় দিতে বললো কায়েস।
এই আতঙ্কিত নারী ছিল এক পুণ্যার্থী কিশোরী। সন্ধ্যায় সে গঙ্গাস্নান করতে নদীতে গিয়েছিল। ঠিক সেই সময় ঝড় শুরু হয়ে যায়। সবাই যখন জীবন বাঁচানোর জন্য দৌড়াতে লাগলো, তখন অন্ধকারের মধ্যে সে সঙ্গীদের হারিয়ে ফেলেছিল। কায়েসকে দেখে আতঙ্কিত কিশোরী তাকে জড়িয়ে ধরলো।
আকাশের তীব্র গর্জন, চোখ ধাঁধানো বিজলী ও ঝড়ের প্রচণ্ডতায় কায়েসের মতো টগবগে যুবকের চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলার উপক্রম হলো। এমন সময় তাদের অতি কাছে একটি গাছের উপর ঘটলো তীব্র শব্দে বজ্রপাত। আতঙ্কিত তরুণী বজ্রপাতের আওয়াজে মা বলে চিৎকার করে কায়েসের শরীরে এভাবে লেপ্টে গেলো, যেনো সে কায়েসের শরীরে বিলীন হয়ে নিজেকে রক্ষা করবে।
