“তুমি জীবনবিমুখ হয়ে বিষিয়ে উঠেছে। ফলে ধর্ম সম্পর্কে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। এজন্য ধর্ম সম্পর্কে যাচ্ছেতাই বলছো চম্পা। চম্পার রেশমী চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললো জগন্নাথ। ধর্ম সম্পর্কে তোমার মনে যা ইচ্ছা বলো, কিন্তু আমার ভালোবাসায় সন্দেহ পোষণ করো না।“
“তোমার প্রতি আমার মনে কোন সন্দেহ নেই। তুমি প্রেমের প্রশ্নে আমাকে যতো কঠিন পরীক্ষায়ই করো না কেন, আমি ঠিকই শতভাগ উতরে যাবো। কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে আমি কোন ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি নই।’ জগন্নাথকে বললো চম্পা।
ইত্যবসরে সেবিকা গলা খাকারী দিয়ে তার উপস্থিতি জানান দিল। চম্পা রাণী বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা শুরু করল। জগন্নাথ তার জায়গায় বসে রইল। কিছুক্ষণ পর রাণী জগন্নাথকে ডাকার উদ্দেশ্যে রাণীদের ব্যবহার্য বিশেষ « আওয়াজ দিল এবং সেবিকাকে নিয়ে আগে আগে হাঁটতে শুরু করল।
* * *
পরদিন মহারাজা রাজ্যপাল জগন্নাথকে ডেকে বললেন, জগন্নাথ, আজ তোমার ছুটি। তুমি স্বাধীনভাবে যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াতে পারো।
জগন্নাথ মহারাজার অনুমতি নিয়ে রাজকীয় পোশাক পরিধান করে কোমরে তরবারী ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
মাথুরা জুড়ে লাখো মানুষের সমাগম। চতুর্দিকেই মানুষ আর মানুষ। গোটা মাথুরা এলাকা যেনো এক বিশাল মেলায় পরিণত হলো। উৎসব উপলক্ষে জায়গায় জায়গায় গনক, জ্যোতিষী ও সাধু-সন্ন্যাসীরা তাদের মজমা বসিয়ে মানুষদের গোল লাগিয়ে লাগল। অনেক জায়গায় কবিয়ালরা গানের আসর জমালো, নর্তকীরা নাচের আসর জমালো, কেউ বা শারীরিক নানা কসরত খেলা দেখিয়ে দর্শক শ্রোতা ও আগত লোকদের মাতিয়ে রাখল।
লোকজন জ্যোতিষী ও গণকদের কাছে তাদের হাত দেখিয়ে তাদের ভাগ্য জানার চেষ্টা করছিল। সাধুরা মজমা জমিয়ে পুণ্যার্থীদের প্রসাদ বিতরণ করছিল। জগন্নাথ প্রতিটি মজমাতে একটু উঁকি দিয়ে ঘটনা আঁচ করে আবার অন্যখানে উঁকি দিচ্ছিল।
যেতে যেতে সে একটি গাছের নিচে দু’ সাধু সন্তুকে বসা দেখল। তাদের শুধু আব্রুটুকু ঢাকা আর সারা শরীর উলঙ্গ। গা জুড়ে ধূপ ভষ্মের প্রলেপ। মাথায় দীর্ঘ চুল। চুলগুলো ছাই-ভষ্মে জটাধা। তাদের দীর্ঘ দাড়িও জটাধা। জটাধারী এই সাধু সস্তুদের ঘিরে বহু লোকের মজমা।
জগন্নাথ এই মজমায় গিয়ে উঁকি দিল। সে ভেতরের অবস্থা দেখা ও বোঝার জন্য দাঁড়াতেই এক লোক সাধুদের জিজ্ঞেস করল
সাধুবাবা! আমাদেরকে ওই দুরাচার ম্লেচ্চাদের কথা কিছু বলুন, যারা পাহাড়ের ওপাশ থেকে এসে আমাদের মন্দিরগুলোকে ধ্বংস করে চলে যায়?”
“মুসলমানরা…….। এরা লোভী। সম্পদের লোভেই এরা ভারতে আসে। তাই এরা আমাদের মন্দিরের সম্পদ লুট করে চলে যায়। এরা আমাদের কোন দেবদেবীকে ভয় করে না। ওরা জানে না, মহাভারতে বাসুদেব ও বিষ্ণুদেবের যে ক্রোধের কথা বলা হয়েছে তা সত্য।
দেবদেবীর ক্রোধ অবশ্যই মুসলমানদের উপর পড়ছে যদিও এখন তা আমাদের উপর পড়ছে। গযনীর বাদশা মাহমুদ খুবই জালেম ও আগ্রাসী। সে যেদিকে অভিযান চালায়, বানের পানির মতো আসতে থাকে, তার সামনে কেউ দাঁড়াতে পারে না, জঙ্গীহাতিও পালিয়ে যায়। নদীর তীব্র স্রোতও তার পথ। রুখতে পারে না। পাহাড়ও তার অগ্রাভিযান থামাতে পারে না।
এই সন্ন্যাসী মুসলমানদের বদনাম করছিল। কিন্তু মুসলমানদের সম্পর্কে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছিল। এই সন্ন্যাসী তীর্থযাত্রীদেরকে গযনী বাহিনীর এমন কিছু ভয়াবহ অভিযানের কথা বললো, যা শুনে আতঙ্কে শ্রোতাদের চোখ উল্টে যাওয়ার অবস্থা হলো।
জগন্নাথ নীরবে দাঁড়িয়ে সবকিছুই শুনছিল। কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে জগন্নাথের উপর সন্ন্যাসীর চোখ পড়লে হঠাৎ ক্ষণিকের জন্যে সন্ন্যাসীর যবান বন্ধ হয়ে গেলো এবং কালবিলম্ব না করেই আবার সন্ন্যাসীর কথা চলতে থাকল।
এক পর্যায়ে সন্ন্যাসী দেবদেবীদের ক্রোধ থেকে বাঁচার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করল। কিছুক্ষণ পর জগন্নাথ ওখান থেকে সরে গেল।
ঘুরতে ঘুরতে একটি পুরনো মন্দিরের সিঁড়িতে গিয়ে দাঁড়াল জগন্নাথ। সেখানে দাঁড়িয়ে সেই দুই সন্ন্যাসীকে জগন্নাথ আসতে দেখতে পেলো। তাদের দেখেও জগন্নাথ সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে লাগল। এই মন্দিরটি ছিল পরিত্যাক্ত। এর কিছু অংশ ভগ্নতূপে পরিণত হলো। হঠাৎ সে শুনতে পেল ‘তাশ!’
ডাক শুনেও সে থামল না এবং পেছনে ফিরেও দেখলো না, আবার সে শুনতে পেল, ‘তাশ! তাশকীন!’
একমনে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে লাগল জগন্নাথ। উভয় সন্ন্যাসী তাড়াতাড়ি সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে উঠতে বললো, আরে আমীর বিন তাশকীন!’ এবার দাঁড়াল জগন্নাথ এবং তার চেহারায় ক্ষোভের অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো।
“আরে এখানে কেউ শুনতে পাবে না। ভয় করো না।’ বললো দুই সন্ন্যাসী।
জগন্নাথরূপী তাশকীন সন্ন্যাসী হিশাম সমরকন্দীর কানে কানে বললো, ‘হিশাম সমরকন্দী! কেউ না শুনলেও আমার নাম ধরে ডাকা তোমাদের উচিত হয়নি। তোমরা নির্বোধ হয়ে গেলে নাকি? এখানে বসো। আমি আমার হাত দেখাচ্ছি।‘
আমার হাত ধরে দেখতে থাকবে এবং কথা বলতে থাকবে। তোমরা দুজন ছাড়া এখানে আরো কি কেউ আছে?”
“আরো দু’জন আছে। জবাব দিল সন্ন্যাসীরূপী হিশাম। ওরাও কায়সের মতোই মুশরেফ তথা গোয়েন্দা। তারাও সন্ন্যাসীরূপেই অবস্থান করছে।
