তোমরা হয়তো মনে করবে, ওরা বিশাল বাহিনী নিয়ে আমাদের ওপর হামলা করেছে। না, রাতের বেলায় আমরা যখন সৈনিকদের সামনে কৃষ্ণ আর দেবমূর্তি রেখে প্রার্থনা শুরু করেছি, পণ্ডিত শ্লোক গাইতে রু করেছে, এ সময় মাত্র শতাধিক মুসলিম আমাদের সৈনিকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সবকিছু তছনছ করে দিল। এরপর দিনের বেলায় আর আমরা শত্রু সৈন্যদের মোকাবেলায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলাম না। আমার সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। পণ্ডিত পালিয়ে গেল। সবকিছু বিসর্জন দিয়ে আমিও পালিয়ে আসতে বাধ্য হলাম। অথচ আমার বাহিনীতে তিন লাখের বেশি সৈন্য ছিল। ওরা ছিল আমাদের এক চতুর্থাংশেরও কম।”
“আমরা আবার হিসাব কষে বলব মহারাজ। মনে হয় তারায় তারায় সংঘর্ষ হয়ে গেছে।”
রাজা জয়পালের ক্ষোভ তখন চরমে। চরম অপমান, লজ্জা, তিক্ত পরাজয়ের বাস্তবতা তার সামনে। আর ওসব পণ্ডিত ব্যস্ত রয়েছে তাদের জ্যোতিষীপনার সত্যতা প্রমাণে। রাজা তিন লাখের বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে পুরো আফগানিস্তানকে মহাভারতের অন্তর্ভুক্ত করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গজনী বিজয়ের আশায় অভিযান চালিয়েছিল। তার স্বপ্ন ছিল মহাভারতের সীমানার মধ্যে সে হিন্দুকুশ পর্বতমালাকেও অন্তর্ভুক্ত করবে। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, বিরাট সেনাবাহিনীকে সে সুবক্তগীনের মর্জি আর কৃপার সামনে ত্যাগ করে এসেছে। নিজের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। পেশোয়ার পৌঁছার আগ পর্যন্ত পিছন ফিরে দেখার সাহসটুকু সে হারিয়ে ফেলেছিলো। তার জন্যে আরো বিপর্যয়কর বিষয় হলো, সে শুধু তার নিজের সৈন্য নিয়ে গজনী যায়নি, বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আশ-পাশের আরো পাঁচ-ছয়টি রাজ্যের সৈন্যদেরকেও সঙ্গী করেছিল। সে সব রাজার কাছে মুখ রক্ষার কিছুই আর জয়পালের অবশিষ্ট থাকলো না।
এছাড়া তৎকালীন ভারতে রেওয়াজ ছিল, কোন রাজা যদি পরপর দু’বার শত্রু বাহিনীর কাছে পরাজিত হয় তবে তাকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হতো। রাজা জয়পালের পরাজয়ের সংখ্যা সেই মাত্রা অতিক্রম করে ফেলেছে। এখন তার পক্ষে সিংহাসনে টিকে থাকার প্রশ্নটিই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। অন্যান্য রাজারা চাপ দিলে ছেলের হাতে রাজক্ষমতা ত্যাগ করা ছাড়া তার কোন উপায় নেই। জয়পালের ছেলে আনন্দ পাল তখনও কিশোর। সুবক্তগীন যেমন মাহমুদকে যুদ্ধকৌশলে দক্ষরূপে গড়ে তুলেছিলেন তেমনি আনন্দপালকেও রণবিদ্যার বহু কৌশল রপ্ত করিয়েছিলেন। কিন্তু আনন্দপালের রাজ্যপাট সামলানোর মতো বয়স হয়নি। আনন্দপালের হাতে রাজ্যপাট ন্যস্ত করে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়ার সময় এখনো আসেনি। উপরন্তু অন্য রাজারা তাদের বিপুল সৈন্য ও রসদ ক্ষয়ের ক্ষতিপূরণ দাবী করে বলতে পারে, এর ক্ষতিপূরণ স্বরূপ সিংহাসন ও রাজ্য আমাদের হাতে তুলে দিতে হবে। এসব চিন্তায় রাজা জয়পালের মাথা বিগড়ে যাওয়ার উপক্রম। এমতাবস্থায় যখন পণ্ডিতেরা পরাজয়ের কারণ নির্ণয়ের জন্যে আবার তারার অবস্থান হিসেব করে কোথায় ভুল হয়েছে তা খতিয়ে দেখার কথা বলল তখন ক্ষোভে-অপমানে রাজা কাঁপতে শুরু করল।
“আমি তোমাদের পরিষ্কার বলছি যে, মুসলমানরা তোমাদের মতো যুদ্ধের গনা শুনে আসেনি। ওরা তারার গতিপথ দেখে গণক-জ্যোতিষীদের কথামতো বিজয়ের শুভ-অশুভ যাত্রা দেখে আসেনি। আমাদের হাতে মুসলিম সৈন্য খুব কমই বন্দী হয়ে এসেছে। তন্মধ্যে দু’জন অফিসার রয়েছে। এদেরকে তোমরা দেখ, ওরা তোমাদের মতো মুসলিম মৌলভীদের কোন বিজয়-আশ্বাস নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল কি? আমার তো সন্দেহ হয়- মুসলমানদের কথা সত্য মনে হয়। ওরা বলে কাদামাটি আর পাথরের তৈরি এসব দেবতা মিথ্যা; আর ওরা যে খোদার ইবাদত করে তাই সত্য।”
“ছিঃ ছিঃ ছিঃ মহারাজ! মুসলমান ম্লেচ্ছ। ওদের নাম উচ্চারণ করাও অশুচি। আপনার পরাজয়ের কারণে দেবতাদের মিথ্যা আখ্যা দেয়া মহাপাপ হবে। এই পরাজয়ের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। পরাজয়ের কারণ এই নয় যে, মুসলমানদের ধর্ম সত্য, আমাদের দেব-দেবীরা ভিত্তিহীন ও মিথ্যা।”
কারো ঘরে ডাকাত পড়লে সেই ঘর উজাড় হয়ে যায়। বলল অপর পণ্ডিত। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ডাকাতদের খোদা সত্য আর লুণ্ঠিতদের খোদা মিথ্যা।
“আমি তো আমার ধর্মকে সত্য জেনেই মুসলমানদের দেশে এই সত্য ধর্মকে বিস্তৃত করতে চেয়েছিলাম। দেবতারা আমাকে কেন সহায়তা করল না? মুসলমানরা আমাদের দেবতাদেরকে টুকরো টুকরো করে উপহাসে মেতে উঠল। এসব কি সহ্য করার মত?” বলল রাজা জয়পাল।
“মহারাজ! আমাদেরকে আবার যাচাই করে দেখার সুযোগ দিন।”
আমি আবার তোমাদের গণনা যাচাই করে দেখার সুযোগ দিচ্ছি। একথা বলে রাজা জয়পাল গমনোদ্যত পণ্ডিতদের বলল, তোমরা একটু বস। আমি মুসলিম কয়েদীদেরকে তোমাদের সামনে হাজির করছি। রাজা তার খাস কামরায় ঝুলানো ঘণ্টা বাজাল। এক দারোয়ান ভেতরে প্রবেশ করলে রাজা দু’তিনজন সিনিয়র জেনারেলের নাম বলে দারোয়ানকে হুকুম দিলেন বিশেষ কামরায় বন্দী দু’জন কয়েদীকে নিয়ে জেনারেলদের এখানে হাজির হতে বল।
রাজা জয়পাল সিংহাসনে সমাসীন। দরবারের দস্তুর মতো দুই পণ্ডিত রাজার ডানপাশে এবং তাদের পাশে দুই জেনারেলকে বসানো হল।
সুদর্শন, সুগঠিত দেহ, দীর্ঘকায় দু’জন বন্দীকে ভেতরে আনা হল। তাদের হাতে হাতকড়া, পায়ে ডাণ্ডাবেড়ী বাঁধা। কয়েদী হলেও তাদের চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ পরিস্ফুট। তারা নিরুদ্বিগ্ন। কোন ধরনের ভীতির ছাপ নেই তাদের চেহারায়। কেননা তারা বিজয়ে গর্বিত, তারা সুলতান সুবক্তগীনের বাহিনীর সৈনিক। পদবীতে কমান্ডার। তারা শেষ যুদ্ধে রাতের আঁধারে দুঃসাহসী গেরিলা হামলা করে শত্রুপক্ষের ব্যুহে ঢুকে পড়ে গ্রেফতার হয়েছিল। এদের সেনারা শত্রুপক্ষের বহু ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছিল বটে, কিন্তু তাদেরও কুরবানী দিতে হয়েছে প্রচুর।
