ছোট শিশু-সন্তানের মায়েরা তাদের শিশুদেরকে দেবদেবীদের অভিশাপ থেকে বাঁচানোর জন্য দেবদেবীদের পায়ে তাদের পরিধেয় অলঙ্কারাদি খুলে নজরানা দিতো। প্রত্যেকটি সামর্থবান পুরুষ পূজারী মূর্তিদের সামনে হাতজোড় করে শপথ করছিল, যে করেই হোক তারা মূর্তির অসম্মান ও দেবদেবীদের অমর্যাদার প্রতিশোধ নেবে। অনেকেই চিৎকার করে বলতো, এখন মাহমুদ হিন্দুস্তানে এলে আর তাকে ফিরে যেতে দেবো না।
কনৌজের রাজা রাজ্যপাল যখন পূজা করার জন্য কৃষ্ণমূর্তির সামনে গেলেন, তখন তার একান্ত নিরাপত্তারক্ষী জগন্নাথও সঙ্গে ছিল । জগন্নাথ ছিল শক্ত-সুঠাম-দীর্ঘদেহী সুদর্শন যুবক। তার চেহারা-ছবিতে যৌবনের দীপ্তি প্রস্ফুটিত ছিল। তার মুচকি হাসিতে দুর্নিবার আকর্ষণ এবং তার চাহনী ছিল জাদুময়।
জগন্নাথ ছিল আক্ষরিক অর্থেই একজন দক্ষ ক্ষণজন্মা যোদ্ধা। তরবারী চালনায় ও তীরন্দাজিতে তার পারদর্শিতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। কনৌজের মহারাজার কাছে জগন্নাথের প্রায় দু’বছর হয়ে গেছে। প্রথম দর্শনেই জগন্নাথ মহারাজার হৃদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছিলো।
একবার এক জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় কনৌজের মহারাজা হরিণ শিকার করতে এসেছিলেন। মহারাজা একটি হরিণকে তাক করে তীর ছুঁড়লে তীর ধনুক থেকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগেই হরিণ স্থান ত্যাগ করে। এ সময় হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হলো জগন্নাথ।
মহারাজার নিরাপত্তারক্ষীরা হরিণটিকে স্থানচ্যুত করার জন্য তাকে গালমন্দ করেই ক্ষান্ত হলো না, রীতিমতো হুমকি-ধমকিও দিলো। জগন্নাথ মুচকি হেসে মহারাজাকে বললো, আমি যদি দুরন্ত হরিণকে তীরবিদ্ধ করতে না পারি, তাহলে আপনি আমার ঘোড়া নিয়ে নেবেন এবং আমাকে পাহাড়ের উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবেন।
সবাই জানে, হরিণ যখন দৌড়াতে থাকে, তখন এতো দ্রুত ও দীর্ঘ লাফ দেয় যে, মনে হয় হরিণটি যেনো বাতাসে উড়ছে। একটি চলন্ত হরিণের একেকটি লাফের পরিধি হয় অন্তত পঁচিশ-ত্রিশ গজ এবং মাটি থেকে সাত/আট হাত উপড়ে উঠে যায় হরিণ।
মহারাজা জগন্নাথের কথায় মজা করার জন্য তার নিজেরে ধনুক এবং একটি মাত্র তীর দিয়ে বললেন, ঠিক আছে, আবার কোন হরিণ আমাদের নজরে এলে আমরা সেটিকে তাড়িয়ে দেবো, তখন তুমি সেটি শিকার করবে। তুমি যদি এক তীরে হরিণটি শিকার করতে ব্যর্থ হও, তাহলে কিন্তু আমরা তোমার ঘোড়া ঠিকই ছিনিয়ে নেবো।
তাদের বেশী দূর যেতে হলো না। হঠাৎ এক জায়গায় সাত-আটটি হরিণ পেয়ে গেলেন তারা। মহারাজার নির্দেশে তার লোকেরা হৈ চৈ করলে হরিণ দৌড়ে পালাতে লাগল। পলায়নপর হরিণের পেছনে জগন্নাথ ঘোড়া ছোটালো। তার পেছনে মহারাজাও ঘোড়া ছোটালেন। ছুটন্ত হরিণ যেন বাতাসে ভর করে উড়তে লাগল।
জগন্নাথ তার ঘোড়ার বাগ দাতে কামড়ে ধরল এবং ধনুক সামনে নিয়ে তাতে তীর ভরে নিক্ষেপ করল। একটি ছুটন্ত হরিণ মাটি স্পর্শ করে আর লাফ দিতে পারলো না। একটু উপরে লাফ দিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল আর সঙ্গী হরিণগুলো দৌড়ে পালিয়ে গেল। ততক্ষণে জগন্নাথের ঘোড়াও আহত হরিণের পাশে এসে দাঁড়াল। উড়ন্ত হরিণের শিরদাঁড়ায় জগন্নাথের ছোঁড়া তীর বিদ্ধ হওয়ায় হরিণটি আর লাফ দিতে সক্ষম হলো না। অতঃপর মহারাজা রাজ্যপালও তার কাছে পৌঁছে গেলেন।
আমি বিজিরায়ের সেনাবাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলাম মহারাজ। নিজের পরিচয় দিতে রাজ্যপালের উদ্দেশে বললো জগন্নাথ। বিজিরায় সুলতান মাহমূদের মোকাবেলায় এমন শোচনীয় পরাজয় বরণ করলেন যে, তার অর্ধেক সেনা মারা গেলো আর বাকী অর্ধেক মাহমুদের কাছে বন্দী হয়ে গেল। এতে আমার মন বিষাদে ভরে গেলো। আমি সেখান থেকে লাহোর চলে এলাম।
কিন্তু এখানকার সৈন্যরাও সুলতানের কাছে পরাজিত হলো। বর্তমানে লাহোরের রাজা সুলতান মাহমূদের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ । আমি একজন সৈনিক। সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কমান্ডার ছিলাম।
আমি এখন কোন আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন রাজার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চাই। আমি শুনেছি, কনৌজের রাজপুতদের আত্মমর্যাদাবোধ আছে। আজ আপনার সাথে সাক্ষাতের জন্যই আমি এই জঙ্গলে প্রবেশ করেছিলাম।
মহারাজা তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে বুঝতে পারলেন, এই সুদর্শন যুবক শুধু তীর-তরবারীতেই পারদর্শী নয়, তার মাথায় বুদ্ধিও আছে। সে যেমন মেধাবী, তেমনই দূরদর্শী। মহারাজা জগন্নাথের বুদ্ধিমত্তা ও সামরিক পারদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে জগন্নাথকে তার একান্ত নিরাপত্তারক্ষী দলে অন্তর্ভুক্ত করে নেন।
জগন্নাথ ছিলো গোড়া হিন্দুবাদী। সে মাহমুদ গযনবী ও অন্যান্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় গালমন্দ করতো এবং চরম শত্রুতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতো। মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের ক্ষেপিয়ে তোলার ব্যাপারে সে ছিলো একজন তুখোড় বক্তা। বর্তমানে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের যেমন একান্ত রাজনৈতিক উপদেষ্টা থাকে, জগন্নাথকেও কনৌজের মহারাজা রাজ্যপাল তার একান্ত উপদেষ্টার পদে আসীন করেছিলেন।
মহারাজা জগন্নাথের জন্য বিশেষ ধরনের চমকদার পোশাক তৈরী করালেন। মহারাজা যখন দরবারে আসীন হতেন, তখন জগন্নাথ মহারাজার পেছনে পূর্ণ রাজকীয় জাঁকজমক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, তার হাতে থাকতো স্বর্ণের প্রলেপ দেয়া বর্শা। মহারাজা যেখানে যেতেন, জগন্নাথ তার সাথে থাকতো। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, জগন্নাথ মহারাজের আভিজাত্যের অংশে পরিণত হলো।
