দিল্লী থেকে আশি মাইল দূরে যমুনা নদীর তীরবর্তী মাথুরা ছিল হিন্দুদের একটি মহাতীর্থস্থান। প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্ব থেকে মাথুরা হিন্দুদের একটি তীর্থস্থান। হিন্দুদের কৃষ্ণ মহারাজ নাকি মাথুরাতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আজো পর্যন্ত মাথুরায় প্রতিবছর হাজার হাজার তীর্থযাত্রীর সমাবেশ ঘটে। তীর্থযাত্রীরা ওখানে গিয়ে পূজা-অর্চনা করে তাদের ভাষায় পাপের স্খলন ঘটায়।
মাথুরায় একটি কেন্দ্রীয় মন্দির ছাড়াও ছোট বড় আরো কয়েকটি মন্দির ছিল। এসব মন্দির শক্ত পাথরের গাঁথুনী দিয়ে তৈরী। এসব মন্দিরের ছিল বহু গোপন কক্ষ। এ মন্দিরের ভেতরের চোরাগলিতে হারিয়ে গেলে অজানা কারো পক্ষে বেরিয়ে আসা সহজ ব্যাপার ছিলো না।
মাথুরা শহরের চারপাশ ছিল শক্ত দেয়ালে ঘেরা। শহরের ভেতরে একটি মজবুত দুর্গ ছিল। মাথুরা কোন স্বাধীন রাজ্য ছিল না। মাথুরার নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল কনৌজের মহারাজা এবং পার্শ্ববর্তী মহাবন রাজ্যের রাজার উপর।
মহাবন রাজ্যের রাজার নাম ছিল কুলচন্দ্র। এরা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী আরো কয়েক রাজ্যের মহারাজারা মাথুরার নিরাপত্তা রক্ষায় তাদের কিছু সেনাসদস্যকে এখানে নিয়োগ করেছিল।
মাথুরার নিকটবর্তী রাজ্য মহাবন ছিল একটি জঙ্গলাকীর্ণ রাজ্য। রাজধানীর নাম ছিল মহাবন। মহাবনের অবস্থান ছিল মাথুরা থেকে প্রায় পঁচিশ মাইল দূরে যমুনা নদীর তীরে।
সুলতান মাহমূদের সময় এই রাজ্য ছিল খুবই শক্তিশালী ও বিত্তশালী। কিন্তু সুলতান মাহমূদ এসব রাজ্যের রাজাদের কাছে দানবের মতোই আতঙ্কে পরিণত হয়েছিলেন। সুলতান ইতোমধ্যে থানেশ্বর পর্যন্ত দখল করে সেখানে নিজস্ব সেনা চৌকি স্থাপন করেছিলেন। পাঞ্জাবের মহারাজা ভীমপাল মুখোমুখী যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সুলতানের সাথে মৈত্রীচুক্তি করেছিলেন। ছোট ছোট রাজ্যের রাজা ও রায়বাহাদুররা তো সুলতানের নাম শুনলেই ভয়ে কাঁপতো।
১০১৭ সালে সুলতান মাহমূদ যখন খাওয়ারিজমকে গযনী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করেন, তখন মাথুরাতে চলছিল বাৎসরিক তীর্থ উৎসব ও পুণ্যার্থী সমাবেশ। সে বছর মাগুরায় এতো বিপুল পুণ্যার্থীর সমাবেশ ঘটেছিল যে, মনে হচ্ছিল সারা ভারতের সকল হিন্দুই যেন মাথুরায় এসে জমায়েত হয়েছিল।
শহরের প্রধান মন্দির এবং যমুনা নদীর বিস্তীর্ণ তীরবর্তী এলাকায় সমবেত মানুষদের মনে হচ্ছিল যেন পিপড়ার চাক। পিঁপড়ার মতোই গোটা শহর এবং যমুনা তীরে লোকজন গিজ গিজ করছিল। হাজার হাজার নারী-পুরুষের পদভারে প্রকম্পিত ছিল মাথুরা নগরী।
শহরের কোন জায়গা খালি ছিল না। শহরের বাইরেও কয়েক মাইল পর্যন্ত তীর্থযাত্রীদের তাঁবু আর তাঁবু। দূরবর্তী এলাকা এমনকি বনবাদারের ধারে-পাশে রঙিন বাহারী তাঁবুগুলো ছিল রাজা-মহারাজাদের পরিবার পরিজনের। কোন হিন্দু রাজা-মহারাজা এ বছরের মাথুরা গমন থেকে বিরত থাকেননি।
রাজা-মহারাজাদের তাঁবুগুলোর পাশেই ছিল তাদের নিরাপত্তাকাজে নিয়োজিত সৈন্য-সামন্তদের তাঁবু। তাদের সাথে জঙ্গী হাতি ও ঘোড়াও ছিল। রাজা-মহারাজারাও যমুনার পুণ্যস্নান এবং মাথুরার প্রার্থনা সভায় যোগ দিতে এসেছিলেন।
সবচেয়ে বেশী বাহারী এবং বিশাল এলাকা জুড়ে তৈরী হয়েছিলো কনৌজের মহারাজা রাজ্যপাল এবং পাঞ্জাবের মহারাজা ভীমপালের তাঁবু। তাদের তাঁবুতে কেউ গিয়ে বলার অবকাশ ছিল না, এগুলো সাময়িক তৈরী বরং এসব তাঁবুর রাজকীয় গঠনশৈলী এবং জাঁকজমকে মনে হতো কোন রাজপ্রাসাদ। রাজকীয় তাঁবুগুলো নানা রঙের ফানুস, রেশমী কাপড়ের পর্দা ও ঝালরে সাজানো।
রাজা মহারাজাদের রাণী এবং তাদের রক্ষিতা সেবিকা দাসদাসীরাও তাদের সাথে ছিল। ছিল নাচ গান আমোদ ফুর্তির জন্য বাদক ও নর্তকী দল। কিন্তু মাথুরার প্রধান পুরোহিত ও পণ্ডিতদের হাভভাব দেখে কারো পক্ষেই নাচ গানের মতো আমোদ ফুর্তির আসর গরম করা সম্ভব হলো না। অন্যান্য বছর কয়েক সপ্তাহব্যাপী এখানে মেলা বসতো। প্রতি রাতেই বসতো নাচগানের আসর। সাধারণ মানুষেরাও নাচ গানের আসর জমাতো।
রাজা-মহারাজাদের উদ্যোগে নাচ গানের পাল্লা হতো। কিন্তু এবারের হাজার হাজার মানুষের এই সমাবেশে কোন আনন্দ-ফুর্তির আমেজ ছিলো না। কেমন যেন উদাস উদাস ভাব, সবার মধ্যেই এক ধরনের চাপা বেদনার সুর। এক ধরনের যাতনার অভিব্যক্তি সবার চেহারায়।
তীর্থযাত্রী হিন্দুদের এই হতাশা ক্ষোভের মূল কারণ ছিলেন সুলতান মাহমূদ। সুলতান মাহমূদ ছিলেন হিন্দুদের জন্য জীবন্ত আতঙ্ক, ঘৃণা আর ত্রাসের নাম। মাথুরার প্রত্যেক পুরোহিতের কণ্ঠে ছিল এমন আওয়াজ
“বিষ্ণুদেব আর কৃষ্ণদেবীর অভিশাপ থেকে তোমরা কেউ রেহাই পাবে । দেবদেবীদের অপমান অপদস্থ করিয়ে তোমরা কি করে জীবন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছো? কি করে তোমরা রাতের বেলায় নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারো এবং পেটপুরে আহার করতে পারো? যে পর্যন্ত তোমরা গযনীর প্রতিটি ইট খুলে না নেবে আর মাহমুদ গযনবীর তাজা রক্ত দিয়ে কৃষ্ণমাতার পা ধুইয়ে না দেবে, তততদিন পর্যন্ত তোমরা দেব-দেবীদের অভিশাপ থেকে রেহাই পাবে না। এখন গঙ্গাজল ও যমুনা জলও তোমাদের পাপ ধুইয়ে সাফ করতে পারবে না।”
পুরোহিতের এ ধরনের আতঙ্কজনক কথাবার্তার কারণে পূজারীরা সরাসরি কৃষ্ণমূর্তির চোখের দিকে তাকাতেও ভয় পেতো। পূজারীরা যখন মূর্তির পায়ে মাথা রেখে পূজা-অর্চনা করতো, তখন বিগলিত চিত্তে তাদের দু’চোখ বেয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হতো। মন্দিরের শাখাধ্বনি ও ঘন্টাগুলোর আওয়াজও যেন উদাস হয়ে পড়েছিল। এগুলোর মধ্যে পূজারীরা অনুভব করতো এক ধরনের হতাশার সুর।
