রাজ্যপালের ছিলো তিন রাণী। রাণীদের নিরাপত্তার দায়িত্বও ছিল জগন্নাথের উপর ।
কোন রাণী কোথাও গেলে জগন্নাথ ঘোড়ায় চড়ে রাণীর পিছু পিছু যেতো। রাণীমহলেও জগন্নাথ ছিলো রাজকীয় আভিজাত্যের প্রতীক।
.
মহরাজা রাজ্যপাল মাথুরার প্রধান মন্দিরে পূজার জন্য প্রবেশ করলেন। তার পিছু পিছু জগন্নাথও পূজামণ্ডপে প্রবেশ করল। মহারাজা মর্মর পাথরের তৈরী কৃষ্ণমূর্তির পায়ে মাথা রেখে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত প্রার্থনা করছিলেন আর শপথ করছিলেন তিনি মাহমুদ গযনবীর কর্তিত মস্তক এই মন্দিরে দেবীর পদতলে এনে রাখবেন। তখন পেছন থেকে মূর্তির প্রতি করজোড় নিবেদন করে জগন্নাথ বললো, আর আমি দেবীর শপথ করছি, যদি মাহমুদকে এখানে না আনতে পারি, তাহলে নিজের মাথা নিজেই দেবীর চরণে বলিদান করবো।
জগন্নাথের কথা শুনে চকিতে পেছন ফিরে মহারাজা জগন্নাথকে দেখলেন। জগন্নাথ দুচোখ বন্ধ করে হাতজোড় করে ভজন আওড়াচ্ছিল। এমতাবস্থায় মন্দিরের প্রধান পুরোহিত তাদের সামনে দিয়ে সুগন্ধি লোবানের তশতরীতে রাখা ধূপের পাত্র ঘুরিয়ে নিল। মহারাজা ধূপের পাত্র থেকে লোবানের ভষ্ম নিয়ে কপালে লাগাল। মহারাজা গলা থেকে অত্যন্ত উচ্চে মূল্যের হারটি খুলে মূর্তির পায়ে রেখে দিলেন।
মহারাজ! শ্রীকৃষ্ণের এই অচ্যুত হীরে-মোতির দরকার নেই, কৃষ্ণদেবীর প্রয়োজন তাজা টাটকা চমকানো রাঙা রক্ত। ভারতমাতা তার সুপুত্রদের কাছ থেকে তাজা খুন প্রত্যাশা করে। ভারতমাতার সম্ভ্রমহানী ও বেইজ্জতির জন্য মহারাজাদের উচিত ছিল জগত-সংসার ত্যাগ করে বনবাসী হয়ে যাওয়া।
অবশ্যই আমরা এর প্রতিশোধ নেব। বললেন মহারাজা। মাহমুদ গযনবীর কর্তিত মস্তক এই মন্দিরের সদর দরজায় ঝুলন্ত দেখা যাবে। বললেন মহারাজা রাজ্যপাল।
* * *
দিনের বেলা মাথুরার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গা নদীতে তীর্থযাত্রী স্নানকারীদের এতোটাই ভিড় ছিল যে, কোথাও এক বিঘত ফাঁকও ছিলো না। ফলে মহিলাদেরকে অনেকটা দূরে গিয়ে গঙ্গাস্নানের পর্ব সারতে হতো। তীর্থযাত্রীদের মাথুরাগমন ও পূজা উদযাপনের অন্যতম একটি অংশ ছিল গঙ্গাস্নান। আজো হিন্দুদের ধর্মমতে গঙ্গা ও যমুনা নদী সকল পাপ ধুয়ে মুছে তীর্থযাত্রীদের পবিত্র করে দেয়। অনেক হিন্দু পুণ্যার্থী নাভী সমান গঙ্গাজলে নেমে পূজা-অর্চনার নানা মন্ত্র জপ করে।
এ বছরে রাজা-মহারাজাদের রাণীগণ এবং তাদের একান্ত রক্ষীতারা সাধারণ প্রজানারীদের সাথে দিনের বেলায় গঙ্গাস্নানে অংশগ্রহণকে অবমাননাকর মনে করে তারা রাতের বেলায় নিরিবিলি গঙ্গাস্নানের পর্ব সেরে নিতো।
এক সন্ধ্যায় কনৌজের মহারাজা রাজ্যপালের কনিষ্ঠা স্ত্রী চম্পাকলি মহারাজাকে বললেন, তিনি আজ সন্ধ্যায় গঙ্গাস্নান করতে আগ্রহী। পুণ্যকাজে মহারাজা তাকে বারণ করতে পারেন না। তাই তিনি জগন্নাথকে বললেন, সে যেনো আজ রাত কিছুটা গম্ভীর হলে ছোট রাণী চম্পাকলিকে গঙ্গাস্নানের জন্য যমুনায় নিয়ে যায়। বড় দুই রানীকে জগন্নাথ একরাত আগেই গঙ্গাস্নান করিয়ে এনেছে। বড় দুই রাণীকে নিয়ে জগন্নাথ যমুনা তীরে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। রাণীদ্বয় স্নান শেষ করে এলে তাদের নিয়ে জগন্নাথ তাঁবুতে ফিরে আসে।
চম্পা বড় দুই রাণীর সাথে যায়নি। সে যুবতী ও সুন্দরী। অপর দুই রাণী বয়স্কা। মহারাজ তাদেরও সাথে এনেছিলেন। কারণ, তারা উভয়েই ছিলেন তার সন্তানের মা। মহারাজার উপর চম্পার প্রভাব ছিল বেশী। অন্য দুই রাণী এজন্য চম্পার প্রতি ঈর্ষাকাতর ছিল।
এ ঘটনার প্রায় দু’বছর আগে কোন এক ব্যবসায়ীর উপঢৌকন হিসেবে। চম্পা মহারাজার কাছে আসে। চম্পা কোন কুলীন ঘরের কন্যা ছিল না। কিন্তু বংশগতভাবে সে ছিল সুন্দরের অধিকারিণী। বংশে সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল চম্পাকলি।
মহারাজার এক জায়গীরদারের নজর পড়েছিল চম্পার প্রতি। সে চম্পাকে পাওয়ার জন্য চম্পার বাবাকে বিপুল অর্থসম্পদ উপঢৌকন দিয়ে চম্পাকে স্ত্রী হিসেবে রাখার অঙ্গীকার করে হাতিয়ে নেয়। জায়গীরদার রীতিমতো শাদীর উৎসব আয়োজনও সম্পন্ন করে।
কিন্তু সবশেষে সে চম্পাকে কনৌজ নিয়ে গিয়ে মহারাজাকে উপঢৌকন হিসেবে পেশ করে। মহারাজা চম্পাকে দেখে রাজপ্রাসাদে রক্ষিতা হিসেবে রাখার পরিবর্তে প্রথা অনুযায়ী চম্পাকে বিয়ে করে ফেলেন। মহারাজার বয়স তখন পঞ্চাশেরও বেশী। আর চম্পার বয়স মাত্র সতেরো-আঠারো।
অস্বাভাবিক সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী চম্পা প্রথম দিন থেকেই অর্ধবয়স্ক রাজার হৃদয়রাজ্যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। আর আগের রাণীদ্বয় প্রাসাদে পুরনো আসবাবপত্রের মতোই শুধু শোভা বর্ধনের পর্যায়ে উপনীত হলেন।
.
সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হতেই চম্পাকলি তাদের প্রাসাদোসম রাজকীয় তাঁবু থেকে বের হলো। তার সাথে ছিল একজন একান্ত সেবিকা। জগন্নাথ চম্পার জন্য বাইরে অপেক্ষমাণ ছিল। চম্পা তাঁবু থেকে বেরিয়ে সেবিকাকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে যেতে থাকলে জগন্নাথ তাদের অনুসরণ করলো। তারা যেতে যেতে মাথুরার চারপাশে সাময়িকভাবে তৈরী হাজারো তাঁবু এলাকা পেরিয়ে গঙ্গা নদীর সেই স্থানে এসে পৌঁছল, যেখানে চম্পাকলির গঙ্গাস্নান করার করা।
এই জায়গাটি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ। এখানটায় কোন জনমানুষের সমাগম ছিলো না। চম্পাকলি তার একান্ত সেবিকাকে বললো, তুমি ওখানে চলে যাও, যেখানে সাধারণ প্রজাদের কন্যা-জায়া-বধূরা স্নান করে। জগন্নাথ নদীর পানি থেকে কিছুটা দূরেই থেমে গেল ।
