বিদ্রোহীদের চার চারজন করে ভাগ করে চাবুক লাগানোর পর তাদের সবাইকে একটি চৌবাচ্চায় দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো আর রাজধানীর লোকদের বলা হলো, তারা যেনো দল বেঁধে এদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে এবং ভর্ৎসনাস্বরূপ এদের উপর থুতু ছিটিয়ে দেয়। লোকজন এদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় কেউ কেউ তাদের উপর ঢিল নিক্ষেপ করল এবং কেউ কেউ পাথর ছুঁড়ে মারলো। অনেকেই তাদের গালিগালাজ করে একপাশে দাঁড়ালো।
এরপর সুলতান মাহমূদ এমন নির্দেশ দিলেন, তাতে গোটা ময়দানে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, সুলতান এমন কঠোর নির্দেশ দিতে পারেন!
সুলতান মাহমূদ এরপর নির্দেশ দিলেন, এদের প্রত্যেকের কাঁধ বরাবর বাজুসমেত হাত কেটে দাও। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই সুলতানের কমান্ডোরা তরবারী নিয়ে দৌড়ে এলে অপরাধীরা এদিক সেদিক দৌড়াতে চেষ্টা করলো এবং চিৎকার করে করে সুলতানের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলো। কিন্তু সুলতানের মনে তখনও ছেয়ে ছিলো নিরপরাধ সেইসব সিপাহীদের মর্মন্তুদ হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য, যারা এদের কারণে মৃত্যুবরণ করেছে।
তাতে সুলতান ক্ষান্ত হলেন না। তিনি আগেই পনেরোটি জঙ্গীহাতি একপাশে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। এবার তিনি নির্দেশ দিলেন, জঙ্গী হাতিগুলোকে এদের পিষে মারার জন্য ছেড়ে দাও।
প্রতিটি হাতিকেই পরিচালনা করছিলো একেকজন মাহুত। তারা হাতিকে দৌড়ালো। অপরাধীদের সবার পায়ে ছিল ডাণ্ডাবেড়ী। ওরা এদিক সেদিক সরে যাওয়ার চেষ্টা করল বটে; কিন্তু মাহুতরা হাতিগুলোকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওদের সবাইকে পিষে ফেললো।
এরপর এদের নিষ্পিষ্ট মৃতদেহগুলো গলায় রশি বেঁধে আবুল আব্বাসের কবরের পাশে নিয়ে যাওয়া হলো। আবু আব্বাসের কবরের পাশে আগেই কাঠের খুঁটি পুঁতে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন সুলতান। দণ্ডিত দেশদ্রোহী হন্তারকদের মৃতদেহগুলোকে তিনি আবুল আব্বাসের কবরের পার্শ্ববর্তী কাঠের খুঁটিতে উল্টো করে ঝুলিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
এদিকে শহরে সুলতানের ধরপাকড় আরো কয়েক দিন অব্যাহত থাকল। অভিযুক্তদের পাকড়াওয়ের পর অভিযোগ প্রমাণিত হলে একই শাস্তি দেয়া হলো। টানা কয়েকদিন ধরপাকড় করার পর সুলতান এই অভিযান বন্ধের নির্দেশ দিলেন।
সুলতান মাহমূদ সেনাপতি আলতানতাশকে খাওয়ারিজমের শাসক ঘোষণা করলেন এবং আরসালান জাযেবকে শাসকের সহকারী নিযুক্ত করলেন এবং খাওয়ারিজমকে গযনী সালতানাতের অধীন করে নিলেন। সেনাধ্যক্ষ আলতানতাশ ও তার ডেপুটি আরসালান জাযের গোয়েন্দা তৎপরতা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে খুবই দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেছিলেন।
বর্তমান যুগে গোয়েন্দা বিভাগ বলতে যা বোঝায়, সুলতান মাহমূদের এ বিভাগ ছিল এরই পুরাতন রূপ। এ বিভাগের কর্মীদের মুশরেফ বলা হতো। শত্রু দেশে সে দেশেরই যেসব নাগরিককে গোয়েন্দা চর বানানো হতো, তাদেরকেও মুশরেফ নামে ডাকা হতো। ঐতিহাসিক বায়হাকী লিখেছেন, মুশরেফদেরকে সুলতান মাহমূদ মোটা অংকের ভাতা, উচ্চ প্রযুক্তি এবং আকর্ষণীয় পুরস্কার ও উপঢৌকন দিতেন। তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে তিনি ভিন্নভাবে ভাতা দিতেন। বায়হাকী লিখেছেন, সুলতান মাহমূদ এমন দূরদর্শী ও বিচক্ষণ লোকদের গোয়েন্দা এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করতেন যে, তারা শক্রদেশে সেই দেশের শাসকগোষ্ঠী ও রাজা-বাদশাহর শ্বাস-প্রশ্বাসের খবরও বলে দিতে পারতো।
আলতানতাশ ও আরসালান জাযেব প্রাথমিক পর্যায়ে গযনী থেকে কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে নিয়ে এলেন। এরপর এরাই স্থানীয়দের থেকে লোক নির্বাচন করে গোটা খাওয়ারিজমব্যাপী তাদের গোয়েন্দাজাল বিছিয়ে দিলো।
দূরদর্শী, অতিসতর্ক, তীক্ষ্ণধীসম্পন্ন লোকদের ব্যবহার করে ইহুদী ও খৃস্টান কুচক্রীরা যেসব চক্রান্তের জাল বিস্তার করে রেখেছিল, অস্বাভাবিক কম সময়ের মধ্যে সকল দুষ্কৃতকারীকে চিহ্নিত করলেন আলতানতাশ ও আরসালান জাযেব। তারা মূল চক্রান্তকারী ও কুচক্রীদের স্থানীয় সহযোগীদের চক্রান্তের হোতাদের মতোই শাস্তি দিলেন।
শহর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জে বসবাসকারী সকল লোকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হলো। তাদেরকে সকল সামরিক শাসনতান্ত্রিক অত্যাচার-উৎপীড়ন থেকে মুক্ত করা হলো এবং তাদের জীবন-সম্পদ ও ইজ্জত আব্রুর হেফাযতের দায়িত্ব সরকারের কাঁধে তুলে দেয়া হলো। ফলে সকল স্তরের মানুষের মধ্যে ফিরে এলো আস্থা ও বিশ্বাস।
খাওয়ারিজমের শাসনব্যবস্থা পুনর্বহালের পর সুলতান যখন গযনী ফিরে আসছিলেন, তখন যেখানে গযনী ও খাওয়ারিজম বাহিনীর প্রথম মোকাবেলা হয়েছিল। সেখানে এসে তিনি থেমে গেলেন।
জায়গাটিতে তখনো শিয়াল-শকুন এবং লাওয়ারিশ কুকুর মৃতদের হাড়-গোড় তালাশ করছিল। সুলতান মাহমূদ তার ঘোড়া থামিয়ে ফাতেহা পড়ে নিহত সৈন্যদের জন্য দুআ শুরু করলেন।
দীর্ঘক্ষণ পর তিনি যখন হাত নামিয়ে আনলেন, তখন তার চোখের পানিতে বুক ভেসে যাচ্ছিল এবং কণ্ঠ দিয়ে হেঁচকি দিয়ে কান্নার আওয়াজ বেরিয়ে আসছিল। বস্তুত ‘বেঈমান কাফেরদের জন্য অত্যন্ত কঠোর আর ঈমানদার স্বজাতির জন্য অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী’ সেই ঐতিহাসিক শাশ্বত বাণীর বাস্তব নমুনা ছিলেন সুলতান মাহমুদ।
৩.৪ গযনীর তুফান
দিল্লী থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় দুশ মাইল দূরে গঙ্গা নদীর তীরবর্তী একটি শহরের নাম কনৌজ। সুলতান মাহমুদের শাসনামলে কনৌজ ছিল একটি শক্তিশালী হিন্দুরাজ্যের রাজধানী। ওখানকার মহারাজা ছিল রাজ্যপাল। উত্তর হিন্দুস্তানে কনৌজের রাজকুমারদের অনেক কদর ছিল।
