কিন্তু তার পক্ষে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। পলায়নপর আবু ইসহাককে পাকড়াও করে তার সেনাবাহিনীর লোকেরাই গযনী বাহিনীর হাতে ও সোপর্দ করলো। আর সাধারণ লোকজন গিয়ে গযনী সেনাদের সহযোগিতা ও করতে শুরু করলো। তারা খাওয়ারিজম বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণেও কুণ্ঠাবোধ করলো না।
ঐতিহাসিক বায়হাকী ও ইবনে ইস্কান্দার লিখেছেন, দখলদারদের প্রতি ক্ষুব্ধ ও ছিলেন সুলতান মাহমূদ। ক্ষুব্ধ সুলতান নদীর তীরব্যাপী উধ্বশ্বাসে ঘোড়া ছুটিয়ে তীরন্দাজদের আরো বেশী করে সঠিক নিশানায় তীর নিক্ষেপের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। রাগে-ক্ষোভে তার মুখ থেকে ফেনা বেরিয়ে আসছিলো।
দিনের শেষে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও রাতভর চললো শত্রুসেনাদের গ্রেফতারী এবং গযনীর আহত ও নিহত সেনাদের একত্রিত করার কাজ। আহতদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছিল।
রাতের বেলায়ই শহরের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং গণমান্য লোকেরা এসে সুলতানের কাছে ওইসব অপরাধীদের পাত্তা জানিয়ে দিচ্ছিল যারা কোন না কোনভাবে আলাফতোগীনের বিদ্রোহের সাথে জড়িত ছিলো এবং আবুল আব্বাসকে হত্যার পেছনেও যাদের হাত ছিলো।
সেই রাত্রেই ওইসব চিহ্নিত অপরাধীদের পাকড়াও অভিযান শুরু হয়ে গেল।
* * *
পরদিন প্রথম প্রহরে দখলদার খলনায়ক আলাফতোগীন, সেনাপতি আবু ইসহাক ও সেনাপতি ওমরতাশকে সুলতানের সামনে পেশ করা হলো। তৎকালীন ঐতিহাসিক বায়হাকী, উতবী এবং গরদীজী লিখেছেন, সুলতান মাহমূদকে ইতোপূর্বে এমন ক্ষুব্ধ অবস্থায় কখনো দেখা যায়নি।
ধৃত বিদ্রোহীদের নায়কদের তিনি যে শাস্তি দিলেন, তাতে হয় তো তার অন্তরাত্মাও কেঁপে উঠেছিলো। সুলতান মাহমূদকে কোন অবস্থাতেই অত্যাচারী বলার সুযোগ নেই। কিন্তু এদের অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে তিনি হয়তো নিজের ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি।
হে জালেমের দল! তোমরা শুধু আবুল আব্বাসের হন্তা-ই নও। ক্ষুব্ধকণ্ঠে ধৃতদের উদ্দেশ্যে বললেন সুলতান। ক্ষুব্ধ সুলতান যখন কথা বলছিলেন, তার মুখ থেকে রাগে-ক্ষোভে থুতু বেরিয়ে আসছিলো। তার সারা শরীর ক্ষোভে থরথর করে কাঁপছিলো। তিনি ক্ষুব্ধকণ্ঠে আবারো বললেন
এই দুই মুসলিম দেশের হাজারো নিরপরাধ সেনার জীবনহানির অপরাধে তোমরাও অপরাধী। তোমাদের ক্ষমতালিপ্সা আর বেঈমানীর কারণে এতোগুলো মানুষের জীবনহানী ঘটেছে। তোমাদের অনুগত সৈন্যদের প্রাণহানির হিসেব করে দেখো, এরা না তোমাদের সৈন্য ছিলো, না আমার সৈন্য ছিলো। এরা ছিলো ইসলামের ঝাণ্ডাবাহী সৈনিক। এরা ছিলো আল্লাহর সিপাহী। তোমরা ক্ষমতার মসনদ পাকাঁপোক্ত করতে এদের হত্যা করিয়েছে।
ক্ষুব্ধ সুলতান রাগে-ক্ষোভে বসা থেকে দাঁড়িয়ে বললেন, ওহে নিমকহারামের দল! তোমরা ওই খুন দেখোনি, যে খুন মরুর মাটি শুষে নিয়েছে। সেই রক্ত দেখোনি, যে রক্ত নদীর পানিতে ভেসে গেছে। তোমরা দেখোনি তোমাদের কারণে ময়দানে ক্ষতবিক্ষত যেসব সৈনিক তড়ফাতে তড়ফাতে মৃত্যুবরণ করেছে।
হে বিদেশী ফিরিঙ্গীদের পা-চাটা গোলামের দল! হে সত্যের ঝাণ্ডাবাহী সৈনিকের ঘাতক, হে ধোকাবাজ প্রতারক গোষ্ঠী! তোমরা হাতে পবিত্র কুরআন নিয়ে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়েছে। হে ভণ্ডের দল! নিজেদের সাচ্চা মুসলমান দাবী করে তোমরা সাধারণ মুসলমানদের ধোকা দিয়েছো। তোমরা মহাপরাক্রম আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিলে। ভুলে গিয়েছিলে মহান আল্লাহ্ কখনো মজলুমের ফরিয়াদ ফিরিয়ে দেন না।
হে হতভাগার দল! নিজেদের স্বকীয়তা ইহুদী-নাসারাদের হাতে বিকিয়ে দিয়ে তোমরা গোটা জাতির ভাগ্যকে বেঈমানদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলে। তোমাদের জ্ঞানবোধ ফিরিঙ্গী বেশ্যদের হাতে তুলে দিয়ে শুরার মাতলামীতে হারিয়ে গিয়েছিলে। তোমাদের দিল-দেমাগে ক্ষমতা ও মসনদের মোহ আসন গেড়ে বসেছিলে।
তোমরা ঈমান বিক্রি করে দিয়েছিলে? হে ঈমান বিক্রেতা বেঈমানেরা! আমি মূর্তি হন্তারক আর তোমরা সেই মূর্তির জীবন্ত প্রতীক! হিন্দুস্তানের মূর্তিগুলোকে আমি যেভাবে ভেঙে টুকরো টুকরো করেছি, তোমাদেরকেও আমি সেভাবেই টুকরো টুকরো করে ফেলবো। হিন্দুদের মাটি-পাথরের দেবতাগুলোকে আমি যেভাবে ঘোড়ার পায়ে পিষেছি, তোমাদেরকেও সেভাবে পিষে ফেলবো।
হে বেঈমান নিমকহারামের দল! রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তোমাদের বিপুল অংকের ভাতা দেয়া হতো এইজন্য যে, তোমরা জনগণের সেবা করবে, নিজ দেশ ও দেশের মানুষের ঈমান-ইজ্জতের হেফাযত করবে, ইসলামের বিরুদ্ধে দুশমনদের সকল ষড়যন্ত্র নস্যাঁত করবে, ইসলামের হেফাযতের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেবে। কিন্তু কর্তব্য ভুলে গিয়ে তোমরা নিজ দেশকেই দখল করেছো। ধর্মের দোহাই দিয়ে জাতির জীবন-সম বিকিয়ে দিয়েছে। গণমানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, মানুষের জীবনকে সংকীর্ণ করে দিয়েছে।
হে বেঈমানেরা, আমি যদি তোমাদের উচিত শিক্ষা না দিই, হাজারো মজলুমের বিদেহী আত্মা আমাকে অভিশাপ দেবে। যাও এদেরকে ময়দানে নিয়ে চাবুক লাগাও।
শহরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই ধৃত দেশদ্রোহীদের শাস্তি দেখার জন্য সেখানে ভিড় জমাল। গোটা ময়দান লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। আলাফতোগীন, আবু ইসহাক, খমতাশ ও তাদের সহযোগীদের হাজারো জনতার বেষ্টনীর মধ্যে ময়দানের মাঝখানে নিয়ে সুলতানের কমান্ডোরা চাবুক দিয়ে পেটাতে শুরু করলে হাজারো মজলুমের হর্ষধ্বনিতে গোটা এলাকা কেঁপে উঠলো।
