হস্তিবাহিনীর দুটি হাতি শক্ৰযযাদ্ধাদের মধ্যভাগে চলে গেল। মধ্যভাগে অবস্থান করছিল সেনানায়ক আলাফতোগীন। আলাফতোগীনের মধ্যভাগের যোদ্ধারা বীরবিক্রমে মোকাবেলা করলো কিন্তু এক পর্যায়ে আলাফতোগীনের দেহরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ভাঙন দেখা দিল।
দিন শেষে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধের অবসান হয়ে গেল। পরাজয় অবশ্যম্ভাবী ভেবে আলাফতোগীন পালিয়ে গেল; কিন্তু রণাঙ্গন থেকে তার পক্ষে নিষ্ক্রান্ত হওয়া সম্ভব হলো না। সুলতানের সৈন্যরা তাকে ঘেরাও করে পাকড়াও করে ফেলল।
***
জুরজানিয়া ছিল রাজধানী। বিদ্রোহী খলনায়ক আলাফতোগীন গ্রেফতার ও পরাজিত হলেও বিজয়কে অর্থবহ করার জন্য সুলতানের প্রয়োজন ছিল রাজধানী কজা করা।
নদীর তীরে অপেক্ষমাণ সৈন্যদেরকে তিনি নৌবহরে রাজধানী জুরজানিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। সুলতানের সৈন্যরা প্রায় চারহাজার নৌকায় আরোহণ করে রাজধানীর দিকে রওনা হলো।
সুলতানের নৌবহর জুরজানিয়ার নিকটবর্তী হলে তারা দেখতে পেলো তাদের সম্মুখ দিক থেকে অন্তত ত্রিশহাজার সৈন্যের বিশাল এক নৌবহর এগিয়ে আসছে।
তখন ভোরের সূর্য পূর্বাকাশে উঁকি দিচ্ছে। ত্রিশ হাজার নৌকার আরোহীর এই বিশাল নৌবহর ছিল আলাফতোগীনের সহযোগী সেনাপতি আবু ইসহাকের নেতৃত্বে। আলাফতোগীন এই সৈন্যদের রিজার্ভ রেখেছিল। সুযোগমতো সে এদের তলব করতো। কিন্তু এদের তলব করার আর সুযোগ হয়নি। এর আগেই আলাফতোগীন সুলতানের সেনাদের হাতে ধরা পড়ে এবং তার বাহিনী শোচনীয় পরাজয়ের মুখোমুখী হয়।
সেনাপতি আবু ইসহাক খবর পেয়েছিল, সুলতানের একদল সৈন্য নদীতীরে নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছে। সে বুঝতে পারলো, এদের পথ ও গন্তব্য রাজধানী জুরজানিয়া। আবু ইসহাক ভাবলো, জুরজানিয়ার সাধারণ লোক তাদের বিদ্রোহে ক্ষুব্ধ।
এমতাবস্থায় প্রতিপক্ষের জুরজানিয়া আক্রমণ করলে স্থানীয় সৈন্যদের মধ্যে ভাঙন দেখা দিতে পারে। তাছাড়া রাজধানীতে অনেকের পক্ষে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে। এরচেয়ে বরং সকল সৈন্য নিয়ে রাজধানীর বাইরেই শত্রুবাহিনীর মোকাবেলা করা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। যেই চিন্তা সেই কাজ। সেনাপতি আবু ইসহাক ত্রিশহাজার নৌকায় তার অনুগত সৈন্যদের সওয়ার করে মোকাবেলার জন্য এগিয়ে এলো।
সুলতানের নৌবহর অগ্রসর হয়ে বুঝতে পারলো, শত্রুবাহিনী নৌযুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। বস্তুত উভয় নৌবহর মুখোমুখি হতেই নৌযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। যুদ্ধের ধরন ছিলো অনেকটা মল্লযুদ্ধের মতো।
একটি নৌকা অপর নৌকার মুখোমুখি হলে শত্রুসেনাদের উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষ লাফ দিয়ে শত্রু নৌকায় গিয়ে মল্ল যুদ্ধে প্রবৃত্ত হচ্ছিল। নৌকা পরস্পর টক্কর দিচ্ছিল আর যোদ্ধারা একে অন্যের উপর আঘাত হানতে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। আর আহত ও নিহত যোদ্ধাদের তাজা রক্তে লাল হচ্ছিল নদীর পানি।
এক সংবাদবাহক এসে সুলতান মাহমূদকে খবর দিলো, জুরজানিয়ায় গযনী সৈন্যদের সাথে আলাফতোগীনের একাংশের নৌযুদ্ধ চলছে। খবর শোনামাত্রই সুলতান অশ্বারোহী বাহিনী এবং উজ্জ্বারোহী ইউনিটকে নৌসেনাদের সহযোগিতার জন্য অভিযানের নির্দেশ দিয়ে নিজেও অশ্বপৃষ্ঠে রওনা হলেন। এই সৈন্যরা যখন অকুস্থলে পৌঁছলো, তখন যুদ্ধ প্রায় স্তিমিত হয়ে এসেছে এবং নদীর মধ্যে উভয় সেনাদের মাল্লাবিহীন নৌকা পরস্পর টোকাটুকি করছে।
উষ্ট্রারোহী সৈন্যরা নদীর তীর থেকে শত্রুসেনাদের নৌকা চিহ্নিত করে শত্রুদের উদ্দেশ্যে তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল । কোন কোন অশ্বারোহী তো এমন বীরত্ব প্রদর্শন করলো যে, ঘোড়া নদীতে নামিয়ে দিলো, কিন্তু পানির পরিমাণ বেশী ও নদীতে স্রোত থাকার কারণে তারা তেমন সুবিধা করতে পারলো না।
সুলতান মাহমূদ নদীতীরে পৌঁছে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়া সকল অশ্বারোহীকে তীর নিয়ে এলেন।
এদিকে সুলতান মাহমূদের বাহিনীর সাথে দখলদার আলাফতোগীন বাহিনীর যুদ্ধ এবং আলাফতোগীনের গ্রেফতারীর খবর শুনে রাজধানী জুরজানিয়ার সাধারণ অধিবাসীরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো। এ সম্পর্কে তৎকালীন ঐতিহাসিক ইসকান্দারয়র লিখেছেন, রাজধানী জুরজানিয়ার মানুষ আলাফতোগীনের বারো মাসের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো।
জুরজানিয়ায় আইনের শাসন বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না। ন্যায়নিষ্ঠা ও ইনসাফের নামগন্ধও ছিলো না আলাফতোগীনের সেনাশাসনে। প্রত্যেক নাগরিকের ঘাড়ের উপর গ্রেফতারীর খড়গ সব সময় ঝুলন্ত থাকতো। সাধারণ সৈনিকের কথাও তখন রাজকীয় ফরমানের মর্যাদা পেয়েছিল।
নির্যাতিত-নিপীড়িত জুরজানিয়ার সাধারণ লোকজন যখন জানতে পারলো, খমরতাশ ও আলাফতোগীন গযনী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছে এবং এখন আবু ইসহাকের অনুগত সৈন্যদের সাথে নদীতে গযনী সেনাদের যুদ্ধ চলছে।
এ খবর শোনার সাথে সাথে গযনীর আবাল-বৃদ্ধ হাতের নাগালে তরবারী-বল্লম-নেজা-দা-বটি-লাঠি যাই পেয়েছে নিয়ে নদীর তীরের দিকে দৌড়াতে শুরু করে দিলো এবং পথিমধ্যে নগররক্ষায় যেসব সৈন্য সামনে পেলো, তাদের উপর হামলে পড়লো।
দিনব্যাপী চললো এই নৌযুদ্ধ। সূর্য ডোবার কিছুক্ষণ আগে শহরের লোকেরা যখন গয়নী সেনাদের সাহায্যের জন্য বেরিয়ে এলো এ খবর শোনামাত্র তীরে দাঁড়িয়ে নির্দেশদাতা সেনাপতি আবু ইসহাক পালোনোর উদ্যোগ নিল।
