রাজপ্রাসাদের ভেতর-বাইরের সবখানে হাজারাশীপ ও বুখারার সৈন্যরা ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করলো। কিন্তু আলাফতোগীনের নির্দেশে নির্বিচারে হত্যা ও লুটতরাজ থেকে বিরত রইল সৈন্যরা। রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে আবুল আব্বাসের বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী ও অনুগত ভৃত্যদের খুঁজে খুঁজে বের করে এনে হত্যা করা হলো। রাজধানী জুরজানিয়াতে নিযুক্ত সৈন্যদের দুটি ইউনিট বিদ্রোহী-সেনাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু তাদের সৈন্যসংখ্যা এতোটাই কম ছিলো যে, বিদ্রোহীরা তাদের সবাইকে ঘেরাও করে অস্ত্রসমর্পণে বাধ্য করল। এরপর যে ডেপুটি সেনাপতির নির্দেশে বিদ্রোহীদের মোকাবেলার জন্য এই ইউনিটের সৈন্যরা প্রতিরোধ ব্যুহ গড়ে তুলেছিলো, তাকে এবং তার অধীনস্ত সকল কমান্ডারের ধরে ধরে হত্যা করলো।
বুখারার গভর্নর আলাফতোগীন বিজয়ী এবং রাজার বেশে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলো। সে ছিলো স্বঘোষিত বাদশা। এই বাদশাহ হওয়ার প্রতি জুরজানিয়া ও খাওয়ারিজমের সাধারণ মানুষের কোনই আগ্রহ ছিলো না। দেশের সাধারণ মানুষ তাকে কখনো রাজার আসনে বসানোর উপযুক্ত মনে করেনি।
রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে গভর্নর আলাফতোগীন খাওয়ারিজম শাহের রাজকীয় মসনদে আসীন হয়ে ফরমান জারি করল, “দেশব্যাপী ঘোষণা করে দাও, খাওয়ারিজম শাহীর পতন হয়েছে, আজ থেকে আলাফতোগীন খাওয়ারিজমের বাদশা এবং আবুল আব্বাস নিহত হয়েছে।”
অবশেষে নাহিদার আশঙ্কাই সত্যে পরিণ হলো। তুর্কিস্তানের খানের আগমনের মিথ্যা খবর দিয়ে রাজপ্রাসাদ থেকে বাইরে এনে আলাফতোগীনের নির্দেশে বিদ্রোহী সৈন্যরা সরলমতি আবুল আব্বাসকে হত্যা করল।
সময়টা ছিলো ৪০৭ হিজরী সনের ১৫ শাওয়াল মোতাবেক ১০১৮ খৃস্টাব্দের ১৭ মার্চ।
ঐতিহাসিক বায়হাকী ও গারদিজী লিখেছেন, বিদ্রোহী সেনাদের রাজমহলে প্রবেশ করতে দেখে নাহিদার একান্ত কর্মচারী জেবীন- যে প্রকৃতপক্ষে গযনী সুলতানের একজন পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত গোয়েন্দা ছিলো- দৌড়ে নাহিদার কক্ষে প্রবেশ করলো। জেবীন নাহিদার কক্ষে গিয়ে দেখে নাহিদা বিছানায় পড়ে বিলাপ করছে
“আমি তাকে নিষেধ করেছিলাম, মৃত্যু তাকে ঘরের বাইরে নিয়ে গেলো”। এমতাবস্থায় জেবীন নাহিদার জীবনাশঙ্কা বোধ করলো। সে নাহিদাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, চিন্তা করো না শাহজাদী, যে করেই হোক আমরা তোমাকে গযনী নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো। যা ঘটে গেছে এ নিয়ে বিলাপ করে বিদ্রোহী সেনাদের তোমার প্রতি মনোযোগী করো না। বিপদে ধৈর্য ধরো এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে স্বাভাবিক হও।”
নাহিদা শরীর থেকে রাজকীয় পোশাক ছুঁড়ে ফেলে অতি সাধারণ সেবিকাদের পোশাক গায়ে জড়িয়ে মাথায় উড়না দিয়ে সাধারণ বেশে প্রাসাদ তাগ করে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। এ কাজে তাকে পথপ্রদর্শন করলো তারই একান্ত কর্মচারী জেবীন।
সাধারণ সেবিকার রূপ ধারণ করে ছদ্মবেশে নিজের কক্ষ ত্যাগের উদ্দেশ্যে নাহিদা চৌকাঠে পা রাখতেই তার মুখোমুখী হলো আলজৌরী।
“তোমার খাওয়ারিজম শাহীর রাজত্ব শেষ হয়ে গেছে নাহিদা! পালাবে কোথায়? বাইরে গেলে বিদ্রোহী সেনাদের হাতে খুন হবে, নয়তো উত্তেজিত সৈন্যরা তোমাকে টেনে ছিঁড়ে ফেলবে।” ভর্ৎসনামাখা কণ্ঠে বললো আলজৌরী।
“শোন নাহিদা, আমার কথা মেনে আমার সাথে এসো। আমি হারেমে তোমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ওখানে থাকলে তোমাকে কেউ কিছু বলবে না।
আর ভালো চাইলে, তুমি আমার বাবাকে বিয়ে করতে পারো। এখন তো আর তোমার পক্ষে গযনী ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। এখানে বন্দী থাকার চেয়ে আমার বাবার চতুর্থ স্ত্রী হয়ে থাকা অনেক ভালো হবে।”
“আলজৌরী!” ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন নাহিদা। আমার গযনী ফেরার জন্য মোটেও তাড়া নেই। অচিরেই দেখতে পাবে গযনীর সিংহের দল এখানে পৌঁছে যাবে…।”
হঠাৎ ব্যাঘ্র মূর্তি ধারণ করে গলা চড়িয়ে আলজৌরীর উদ্দেশ্যে নাহিদা বললো–
“শয়তানী, সরে যা আমার সামনে থেকে। আমি এখনো শাহজাদী। গযনীর সিংহ সুলতান মাহমুদের বোন আমি। এখনো আমার ভাই মরে যায়নি।
ভুলে গেছো তুমি কার মেয়ে? এক নিমকহারাম সেনাপতির মেয়ে তুমি । ক্ষমতার উদগ্র লিপ্সা যাকে পরিণতির কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। যাও, গিয়ে ওদের বলো, সাহস থাকলে ওরা যেনো আমাকে হত্যা করে, নয়তো জেলখানায় বন্দী করে। এরপর তুমি নিজ চোখেই বাপের নিকহারামীর পরিণাম এবং স্বঘোষিত শাহের ভয়ঙ্কর পরিণতি দেখতে পাবে।”
ঠোঁটের কোনে বিদ্রুপাত্মক হাসি এবং বাঁকা চাহনী দিয়ে আলজৌরী সেখান এ থেকে চলে এলো।
এই ফাঁকে জেবীন নাহিদাকে বললো, আসুন শাহজাদী, আমরা এই ফাঁকে ও এখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
“না জেবীন! আমি চুপিসারে পালিয়ে যাবো না। আমি ধোকাবাজ প্রতারক, নিমকহারাম চক্রান্তকারী খাওয়ারিজম শাহীর মুখোমুখী হবো।”
একথা বলে ঝড়ের বেগে কক্ষ ছেড়ে বাইরের দিকে পা বাড়ালেন নাহিদা। কিন্তু জেবীনকে তার পিছু পিছু দৌড়াতে দেখে দাঁড়িয়ে বললেন, “জেবীন! আমার ভবিষ্যৎ আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। তুমি আমার ধারে কাছে থাকলে ওরা তোমাকে জ্যন্ত রাখবে না। তুমি বরং খবর নাও, এখানকার পরিস্থিতির সংবাদ দিতে কেউ গযনী রওনা হয়ে গেছে কি না। যদি কাউকে খুঁজে না পাও, তাহলে নিজেই চলে যাও। আস্তাবল থেকে ঘোড়া নিয়ে নাও।”
