সুলতানের নামে খুতবা পড়ার হুকুমনামা হাজারাশীপ ও বুখারায় পৌঁছুলে সৈন্যদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ব থেকেই সৈন্যদেরকে
সুলতানের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়েছিল। এবার তার নামে খুতবা পড়ার হুকুমনামা ক্ষোভের আগুনে যেন ঘি ঢেলে দিলো।
বুখারার গভর্নর আলাফতোগীন সৈন্যদের ছোট বড় কমান্ডারদের ডেকে এনে বললো, দরবেশগণ যে বিপদাশঙ্কার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এই বিপদ এখন গযনী সেনাবাহিনীর রূপধারণ করে আসছে। যে করেই হোক এ বিপদ আমাদের রুখতেই হবে। নয়তো আমাদের ও তোমাদের মা-বোনেরা. গযনীর লুটেরা হিংস্র বাহিনীর দাসী-বাঁদীতে পরিণত হবে।
হিন্দুস্তানকে লুণ্ঠনকারী সুলতান মাহমূদ এখন খাওয়ারিজমকে লুণ্ঠনের জন্য এবং এখানকার মুসলিম নারীদের বাদী-দাসীতে পরিণত করে গযনী নিয়ে যাওয়ার জন্য আসছে। পরিতাপের বিষয়, খাওয়ারিজম শাহ আবুল আব্বাস নিজেই এই ভয়ঙ্কর লুটেরাকে ডেকে আনছেন। গযনীর লুটেরাদের প্রতিরোধ করতে হলে সর্বাগ্রে আমাদেরকে খাওয়ারিজম শাহী খতম করে সেনাশাসন জারি করতে হবে।
আলাফতোগীন সেনাকমান্ডারদের উদ্দেশে বললেন, প্রত্যেক কমান্ডার নিজ নিজ ইউনিটের সেনাদের বলে দাও, দরবেশগণ তোমাদের যে ভাগ্য বদলের কথা বলেছিলো, সেই দরবেশদের হত্যাকারী খুনীরা এখন তোমাদের ভাগ্য বরবাদ করতে আসছে।
ওদিকে হাজারাশীপের সৈন্যদেরকেও সেনাপতি আবু ইসহাক এবং সেনাপতি খরতাশ একইভাবে গযনী সুলতান ও আবুল আব্বাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ উন্মাদনায় উত্তেজিত করে বিদ্রোহে ইন্ধন দিলো।
***
এই ঘটনার কয়েক দিন পরের ঘটনা। আবুল আব্বাসের একান্ত সংবাদবাহক এসে তাকে খবর দিলো, তুর্কিস্তানের কয়েকজন খান আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছে। তাদের সাথে গভর্নর আলাফতোগীনও রয়েছেন। তারা লেকের পাড়ের বাগানে অপেক্ষা করছেন। গভর্নর আলাফতোগীন তাদের মর্যাদা দেয়ার জন্য মহামান্য শাহকে নিজে তাদের অভ্যর্থনা জানানোর অনুরোধ করেছেন।
খবর শুনে আবুল আব্বাস তার একান্ত প্রহরীদেরকে সওয়ারী প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। এমন সময় নাহিদার কাছে খবর গেলো, বাদশা আবুল আব্বাস বাইরে কোথাও যাচ্ছেন। তিনি দৌড়ে আবুল আব্বাসের খাস কামরায় পৌঁছুলে আবুল আব্বাস তাকে বললেন তিনি কি উদ্দেশ্যে কোথায় যাচ্ছেন। নাহিদা আবুল আব্বাসকে বাইরে যেতে নিষেধ করলেন।
“তুর্কিস্তানের মেহমান এসেছে। তাদের সম্মানে আমি নিজে অভ্যর্থনা জানাতে যাচ্ছি। অসুবিধা কী? তাদের সাথে গভর্নর আলাফতোগীন রয়েছেন।”
“না, আপনি যাবেন না। এমনই যদি হতো, আলাফতোগীন দূত পাঠালো কেন? সে নিজেই তো আসতে পারতো।” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে আবুল আব্বাসকে বললেন নাহিদা।
“আরে, এই মহিলাদের নিয়ে যতো সমস্যা। এখানে তুমি সমস্যার কী দেখলে? ঘাবড়ে যাচ্ছো কেন নাহিদা?”
“আল্লাহর দোহাই লাগে আবুল আব্বাস! তুমি এখন বাইরে যেয়ো না। আমার মন বলছে, বাইরে কোন বিপদ অপেক্ষা করছে।”
নাহিদা আবুল আব্বাসের হাত ধরে বললেন, “আবুল আব্বাস! জীবনে কোনদিন আমি তোমাকে কোথাও যেতে নিষেধ করিনি। আজ তোমাকে করজোড় মিনতি করছি। তুমি বাইরে যেয়ো না। কোন জরুরী কাজের বাহানা করে যাওয়া বাতিল করে দাও।”
“ধুত্তরী! আমি মহিলা নাকি?”
“না, তুমি মহিলা হবে কেন? পুরুষ হলেও আজ একজন অবলা নারীর কথা রাখো। আজ আমার এই অনুরোধটুকু রক্ষা করো” বলে কেঁদে ফেললেন নাহিদা। আমি বাইরে ভয়ঙ্কর বিপদাশঙ্কা করছি।”
“স্মিত হেসে আবুল আব্বাস নাহিদার উদ্দেশে বললেন, প্রেমের টানে এতোটা উতলা হয়ে যাওয়া ঠিক নয় নাহিদা। আমাকে আমার অবস্থান থেকে নামিয়ে দিও না তুমি! বাইরে ওরা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
“আবুল আব্বাসকে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে না পেরে বিপদাশঙ্কায় নাহিদার হিতাহিত জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলো। আবুল আব্বাস নাহিদাকে পাশ কেটে বাইরে বেরিয়ে পড়লে নাহিদাও দৌড়ে বেরিয়ে এলেন। তততক্ষণে আবুল আব্বাসকে বহনকারী ঘোড়ার গাড়ী নিরাপত্তা রক্ষীদের ভিড়ে চলে গেছে। উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত নাহিদাকে তার একান্ত সেবিকা ও দাসীরা বোকাতে ও সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করলো। কিন্তু নাহিদার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ক্রমেই বেড়ে চললো।
এর কিছুক্ষণ পরেই রাজপ্রাসাদের চতুর্দিকে বহুসংখ্যক অশ্বারোহীর দৌড়ঝাপের শব্দ শোনা গেলো। সেই সাথে সেনাদের তাকবীর ধ্বনি ভেসে এলো।
আবুল আব্বাস হয়তো ফিরে এসেছেন এই আশায় নাহিদা দৌড়ে তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু বিধি বাম, আসলে এরা ছিলো বিদ্রোহী সেনা, যারা রাজপ্রাসাদকে ঘেরাও করেছিলো। বিদ্রোহী সেনারা স্লোগান দিচ্ছিলো, নারীলিঙ্গু খাওয়ারিজম শাহীর পতন হয়েছে, গযনী গোলামকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, খাওয়ারিজম শাহী আলাফতোগীন জিন্দাবাদ…।
নাহিদার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো। তিনি মাথা দুহাতে ধরে কোনমতে নিজের বিছানায় গিয়ে পড়ে গেলেন। ইত্যবসরে রাজপ্রাসাদ দখলের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে সর্বপ্রথম নৃশংসতার শিকার হলেন আবুল আব্বাসের বিশ্বস্ত উজির আবুল হারেস। তাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে খুন করলো আলাফতোগীনের লেলিয়ে দেয়া সৈন্যরা। তারা আবুল হারেসকে শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হলো না, তার শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেললো।
