* * *
খাওয়ারিজম শাহের মসনদে বসে আলাফতোগীন নানা শাহী ফরমান ঘোষণা করছিলো, যে মসনদে কয়েক ঘন্টা আগেও বসেছিলেন আবুল আব্বাস। আলাফতোগীনের দরবারে কিছু লোক দু’হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে ছিলো। এদের অধিকাংশই ছিলো সেনাবাহিনীর লোক। আবুল আব্বাসের শাসনব্যবস্থাপনায় জড়িত কেউ সেখানে ছিলো না। আলাফতোগীনের দরবারে কিছুটা শোরগোলের মতো নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা বিরাজ করছিল। হঠাৎ দরবারে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখতে পেলো মানুষের ভিড় ঠেলে সদ্যবিধবা রাণী নাহিদা বাঘিনীমূর্তি ধারণ করে আলাফতোগীনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
“ওহ্, নাহিদা! নাহিদার দিকে তাকিয়ে বললো আলাফতোগীন। তোমার ব্যাপারে আমি কোন কিছু চিন্তা করারই অবসর পাইনি।
‘নাহিদা, আমি জানি, তুমি প্রাণ ভিক্ষা চাইতে এসেছে। তুমি হয়তো বুঝতে পারোনি, তোমার স্বামীকে কিন্তু তুমিই হত্যা করিয়েছো। তুমি তার উপর ছলনার জাদু চালিয়ে তাকে গযনীর কেনা গোলামে পরিণত করেছিলে। খাওয়ারিজমের স্বাধীনচেতা জনতা, খাওয়ারিজমের আত্মমর্যাবোধসম্পন্ন সেনাবাহিনী কোন বহির্দেশের গোলামী কখনো বরদাশত করে না। দেখতেই পাচ্ছো, সমগ্র জাতি ও সৈন্যরা মিলিত হয়ে আমাকে বুখারা থেকে টেনে এনে এই মসনদে বসিয়েছে। এখন আমি তাদের ইচ্ছাতেই শুধু এই মসনদ ছাড়তে পারি। জাতি আমার উপর যে গুরুদায়িত্ব অর্পণ করছে, যেকোন মূল্যে এই। দায়িত্ব আমি পালন করবো।”
“প্রাণ ভিক্ষা নয়, আমি প্রাণ দিতে এসেছি বেঈমান!” হুংকার দিয়ে বললেন নাহিদা।
তোমার জানা উচিত, আমি যা করেছি, তা আল্লাহ্ ও এখানকার সাধারণ মুসলমানদের ঈমানের সার্থে করেছি। তাদের ধর্ম, ইজ্জত, সম ও মর্যাদার সাথে করেছি।
বেঈমান! তুমি নিজে যেমন পবিত্র কুরআনের অসম্মান করেছে, ফিরিঙ্গিদের দিয়েও পবিত্র কুরআনের অবমাননা করিয়েছে। আল্লাহ্ সবকিছু জানেন, সবকিছু দেখেন, আল্লাহর কাছে তুমি কিছুই লুকোতে পারবে না।
বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যার ফুলঝুরি দিয়ে সরলপ্রাণ জনতা ও সৈন্যদের বিভ্রান্ত করতে পারলেও অচিরেই জেনে যাবে, জনতা তোমাকে এখানে আনেনি, তুমি জনতা ও সৈন্যদেরকে ধোকা দিয়ে এখানে এসেছো। তুমি যদি জাতির কাছে এতোটাই প্রিয় ব্যক্তি হতে আর এতোটাই সম্মানী ব্যক্তি হতে, তাহলে প্রতিটি গলি আর প্রতিটি বাড়ির সামনে সৈন্য মোতায়েন করেছো কেন? শহরের লোকদেরকে তোমাকে অভ্যর্থনা জানানোর সুযোগ দিচ্ছো না কেন? তোমার এই রাজকীয় অভিষেকের দিনে শহরে মৃত্যুর মাতম কেন? শহরের মানুষ তোমার বিজয়ের জয়ধ্বনী করছে না কেন? শহরের চতুর্দিকে সেনারা টহল দিচ্ছে কেন?”
হঠাৎ দরবারে এক কোন থেকে গর্জন শোনা গেলো, “হুশ করে কথা বলো মহিলা। তুমি কি জানো না, খাওয়ারিজম শাহের সামনে তুমি দাঁড়িয়ে আছো?”
“খাওয়ারিজম শাহ! সে তো ছিলো আমার স্বামী। এই খুনীরা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে। কিন্তু আমার আল্লাহ্ মরেননি। তিনি অবশ্যই এই খুনের প্রতিশোধ নেবেন।
আলাফতোগীনের উদ্দেশ্যে সাহিদা চিৎকার করে বললো, আলাফতোগীন! সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ও ছত্রছায়ায় তুমি খাওয়ারিজমের বাদশাহী করার মতলব নিয়ে যদি এই মসনদ দখল করে থাকো, তবে আমি তোমাকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি, অচিরেই তোমার এই দিবাস্বপ্ন কপুরের মতো উবে যাবে। আর যে ছাতার আশ্রয়ে ক্ষমতার আশায় খুনের নেশায় তুমি উন্মত্ত হয়ে আছে, অচিরেই এমন তুফান দেখতে পাবে, যাতে তোমার এসব আশ্রয় খড়কুটোর মতো বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যাবে, কোন চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে না।
খাওয়ারিজম শাহের মসনদ একটি পবিত্র মসনদ। মসনদের যোগ্য ব্যক্তি ছাড়া এখানে কারো বসার অধিকার নেই। তুমি মামুনী খান্দানের জুতা বহন করে তোষামোদী করে গভর্নরের পদে পৌঁছেছিলো। মামুনী খান্দান তোমার চক্রান্তকে আমলে না নিয়ে তোমাকে বুখারার গভর্নর পদে অধিষ্ঠিত করেছিলো। কিন্তু তুমি সেই পুরস্কারের মর্যাদা রাখতে পারলে না। তোমার সীমাহীন লোভ, হিংসা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর বেঈমানী তোমার ভাগ্যে আজীবন কয়েদখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পঁচে পঁচে দুর্গন্ধ ছাড়ানোর পরিণতি লিখে দিয়েছে। এটাই হয়তো তোমাকে বরণ করতে হবে।”
“নিয়ে যাও ওকে! বেচারী পাগল হয়ে গেছে। ওকে তার নিজস্ব কক্ষে রেখে বাইরে প্রহরা বসিয়ে দাও। তার নিজস্ব শয়ন কক্ষেই তাকে নজরবন্দী করে রাখো। আমি সুলতান মাহমূদকে লিখে পাঠাবো, তুমি যদি খাওয়ারিজমের উপর আগ্রাসন চালাও, তাহলে তোমার বোনের থেতলানো দেহ দেখতে পাবে। নাহিদাকে তোমরা মুক্তিপণ হিসেবে রাখতে পারো। তার উপর কোন ধরনের অত্যাচার করো না। মানুষ যাতে একথা বলতে না পারে, খাওয়ারিজম শাহী আলাফতোগীন এক বিপন্ন বিধবা অসহায় নারীর উপর জুলুম করেছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তোমার কবরের উপরেও থুতু ছিটাবে। ভর্ৎসনামাখা কণ্ঠে বললেন নাহিদা। যে সেনাবাহিনীর জন্ম হয়েছিলো কাফের-বেঈমানদের বিরুদ্ধে ঈমানদারদের পক্ষ হয়ে লড়াই করার জন্য, সেই সেনাদেরকে তুমি নিজ ভূমি জয় করার ভ্রাতৃঘাতি হানাহানিতে প্ররোচিত করেছে। যে সেনারা সব সময় উত্তর্ণ থাকতে নির্দেশের জন্য, তাদেরকে তুমি এখন শাসক বানিয়ে দিয়েছে, এখন আর এই সেনাবাহিনীর একদিনও যুদ্ধ করার যোগ্যতা নেই।
