আপনি এতোটাই অনভিজ্ঞ যে, আপনাকে ঘিরে আপনার রাষ্ট্রের চারপাশে কী ঘটছে, আপনি এ ব্যাপারে একেবারেই বেখবর। শত শত মাইল দূরে গযনীতে বসেও আমি জানতে পারছি, বিদ্রোহ দমনের ক্ষেত্রে আপনি একেবারেই সঙ্গীহীন। আশা করবো, এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে গিয়ে আপনি অযথা কালক্ষেপণ ও সময় নষ্ট করবেন না।”
* * *
খ্যাতিমান ঐতিহাসিক বায়হাকী লিখেছেন, গযনী সুলতানের লেখা এই পয়গাম খাওয়ারিজম শাহ আবুল আব্বাসের কাছে পৌঁছুলে তিনি এ ব্যাপারে পরামর্শের জন্য রাষ্ট্রের সকল গভর্নর ও সেনাপতিদের সভা ডাকলেন। এ সভায় বুখারার গভর্নর আলাফতোগীন, সেনাপতি আবু ইসহাক, সেনাপতি খমরতাশও বাদ পড়লো না।
এহেন পরিস্থিতিতে আবুল আব্বাস সুলতান মাহমূদের অধীনতা গ্রহণের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি পয়গামটি কাউকে না দেখিয়ে সভায় শুধু এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন যে, গয়নী শাসক সুলতান মাহমূদ তার অধীনতা কবুল করে নিয়ে খুতবায় তার নাম পাঠ করার প্রস্তাব করেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত একমাত্র উজির আবুল হারেস ছাড়া সকল সেনাপতি ও গভর্নরই প্রস্তাব মেনে নেয়ার বিপক্ষে মতামত দিলেন। রাজধানীর রাজপ্রাসাদে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের খবর বৈঠক শেষ হতে না হতেই দ্রুত সকল সেনাশিবিরে পৌঁছে গেলো। খবর পাওয়ামাত্রই সেনারা এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিল।
আবুল আব্বাস বিদ্রোহের কথা শুনে সৈন্যদের মধ্যে স্বর্ণমুদ্রা বিতরণ করে বিদ্রোহ আপাতদৃষ্টিতে প্রশমন করলেন। সেদিনের বৈঠক সিদ্ধান্ত ছাড়াই মুলতবী হয়ে গেল। চারদিন পর আবারো বৈঠক ডাকা হলো। এবার বৈঠকে আবুল আব্বাস ঘোষণা করলেন, গযনীর অধীনতা মেনে নেয়া হবে না। গযনী সুলতান যদি খাওয়ারিজম আক্রমণ করে বসে, তাহলে তুর্কী খানদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেয়া হবে। এজন্য তুর্কি খানদের সাথে সহসাই মৈত্রীচুক্তি করা হোক এবং সেই চুক্তিকে গোপন রাখা হোক।
ঐতিহাসিক বায়হাকী লিখেছেন, আবুল আব্বাসের এই সিদ্ধান্তের খবর গযনীর গোয়েন্দারা সুলতানকে যথাসময়ে জানিয়ে দিল। সুলতান খবর পেলেন, আবুল আব্বাস তার প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে তুরস্কের খানদের সাথে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করতে যাচ্ছেন।
এ খবর শুনে সুলতান মাহমূদ সৈন্য এবং পাঁচশত জঙ্গী হাতির বহর নিয়ে খাওয়ারিজমের নিকটবর্তী বলখ পৌঁছে আবুল আব্বাসকে খবর পাঠালেন, সুলতানের প্রেরিত পয়গাম না মানলে গযনী বাহিনী জুরজানিয়া আক্রমণ করবে।
সুলতানের সেনাসমাবেশের খবর শুনে তুর্কিস্তানের খান শাসকরা খাওয়ারিজম শাহের সাথে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানালো।
তুর্কিস্তানের খান শাসকরা বলখে এসে সুলতানকে খাওয়ারিজম আক্রমণ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করলো। কিন্তু সুলতান তাদের কথায় সম্মত হলেন না। তিনি তার অভিপ্রায়ে অবিচল রইলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে তুর্কি খানেরা আবুল আব্বাসকে গিয়ে সুলতানের প্রস্তাব মেনে নিতে রাজী করালো। সেইসাথে খাওয়ারিজম জুড়ে সুলতানের নামে খুতবা দেয়ার প্রস্তাব পাশ করালো।
সুলতানের দাবী পূরণে আবুল আব্বাস সম্মত হওয়ায় সুলতান বলখ থেকে তাঁর সেনা বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নিলেন।
সুলতান মাহমূদের সময়কার বিখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিক আবু নসর মুহাম্মদ আল উতবী ছিলেন সুলতানের একজন ঘনিষ্টজন। উতবী বহু সফরে সুলতানের সহযাত্রী ছিলেন। সুলতানের পক্ষে তিনি কয়েকবার বিভিন্ন রাষ্ট্রে দূতের ভূমিকাও পালন করেছেন। উতবী তার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ সম্বলিত প্রামাণ্যগ্রন্থ কিতাব আল ইয়ামিনীতে লিখেছেন
“আবুল আব্বাস সুলতানের প্রস্তাব মেনে নিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। কারণ তিনি স্বাধীনতা ও স্বাধিকার হারানোর আশঙ্কা করছিলেন। কিন্তু তার উজির আবুল হারেস তাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, সুলতানের প্রস্তাব মেনে নেয়ার মধ্যে এতোটা ক্ষতি নেই, যতটুকু ক্ষতি সেনাবিদ্রোহে হবে। সর্বোপরি সম্মত সুলতানের প্রস্তাব মেনে নিতে আবুল আব্বাসকে নাহিদা করাতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।
নাহিদা আবুল আব্বাসকে আশ্বস্ত করতে বলেছিলেন–
“আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, আমার ভাই আপনার স্বাধীনতা কখনো হরণ করবেন না। তিনি আপনাকে তার মিত্র এবং আপনাকে বিদ্রোহের আশঙ্কা থেকে নিরাপদ করতে চান।”
“আমি বুঝতে পারছি না, কে আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে? আমার সেনাদের প্রতি আমার আস্থা আছে।” নাহিদার উদ্দেশে বললেন আবুল আব্বাস।
“আপনি ভুল ধারণা পোষণ করছেন। সেনাবাহিনী থেকে আপনার আস্থা এবং আপনার প্রতি সৈন্যদের বিশ্বস্ততা বিনষ্ট করে দেয়া হয়েছে।”
“কে সেনাদের মন থেকে আমার আস্থার বিলোপ ঘটিয়েছে?”
“আপনার গভর্নর আলাফতোগীন, সেনাপতি আবু ইসহাক এবং সেনাপতি ধমরতাশ।” বললেন নাহিদা।
এদের পশ্চাতে রয়েছে ফিরিঙ্গী খৃস্টান ও ইহুদী কুচক্রী গোষ্ঠী। আপনাকে বুঝতে হবে, সুলতান মাহমূদের সহযোগিতা ছাড়া আপনার বাদশাহী টেকানো অসম্ভব। আপনি আত্মশ্লাঘায় না ভুগে আমার কথায় বিশ্বাস করুন। আপনি দয়া করে গযনী সুলতানের আনুগত্য স্বীকার করে নিন।”
চিন্তা-ভাবনার পর অবশেষে আবুল আব্বাস সুলতানের আনুগত্য মেনে নিতে সম্মত হলেন এবং সুলতানের নামে খুতবা পাঠের ঘোষণা জারি করলেন।
