“একথা কি নিশ্চিতভাবে বলা যাবে, সে সত্যিই কোন দুনিয়াবিমুখ ওলী ব্যক্তি নয়?” জিজ্ঞেস করলো নাহিদা।
সে আলেম বটে; কিন্তু দুনিয়াবিমুখ নয়, বরং দুনিয়ামুখী। সে কোন দীনদার আলেম নয়, কুরআনের আড়ালে সে আসলে খ্রিষ্টবাদ ছড়াচ্ছে এবং গণমানুষকে বিভ্রান্ত করছে। গযনী সালাতানাতের বিরুদ্ধে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে সে। কুরআন শরীফের আয়াত পড়ে পড়ে সে বলছে, গযনী ও আশেপাশের সকল মুসলিম রাজ্যগুলো এবং এগুলোর শাসকগোষ্ঠী নামকাওয়াস্তে মুসলমান। ইসলামের নামের আড়ালে ওরা সবাই ক্ষমতালোভী। একমাত্র সত্যিকার মুসলিম ও মুসলমানের দেশ খাওয়ারিজম।”
“সে কি খাওয়ারিজম শাহীর বিরুদ্ধেও কোন কথাবার্তা বলে?”
“না, প্রকাশ্যে সে খাওয়ারিজম শাহীর বিরুদ্ধে বলে না।” বললো জেবীন। কিন্তু সৈনিক ও কমান্ডারদের আচার-আচরণ ও কথাবার্তা এবং তাদের মনোভাব খাওয়ারিজম শাহীর জন্য খুবই ভয়ানক।…
বুখারার পার্শ্ববর্তী নদীতীরেও এমন এক দরবেশ আস্তানা গেড়েছে। সেখানে শুধু দরবেশই নয়, তার সাথে রয়েছে কিছুসংখ্যক পুরুষ ও সুন্দরী নারী। বুখারা জুড়ে এ খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে যে, দরবেশ এমন এক তাবিজ ও ওষুধ দেয়, যা সেবন ও ধারণ করলে মানুষ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে এবং জীবনে কখনো বার্ধক্য স্পর্শ করে না। ওই দরবেশের সাথে যেসব সুন্দরী তরুণী রয়েছে, রাতের বেলায় তাদেরকে সেনাকমান্ডারদের সাথে আপত্তিকর আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় নদীতীর ও জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
বুখারার সেনাদের কথাবার্তায়ও মারাত্মক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ওই ফকিরকে ঘিরে ওখানে মানুষের সমাগম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ওখানে রীতিমতো মেলা জমে গেছে। ওই ফকিরও কুরআন-হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াজ করে আর গযনী সালতানাতের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে।
মোদ্দাকথা হলো, গযনী ও খাওয়ারিজমের মধ্যে একটা শক্তিশালী শত্রুতা তৈরীর অপচেষ্টা চলছে। আমাদের লোকেরা উভয় সেনা শিবিরের সৈন্যদের সাথে উঠাবসা করে এবং ফকিরের মুরীদ সেজে তাদের কথাবার্তা শুনেছে এবং সৈন্যদের মনোভাব চিন্তা-ভাবনার খবর নিয়েছে।
যে বুখারা ও হাজারশীপের সাধারণ সৈন্যরা কোন কাজকর্ম না থাকায় অলস বসে বসে সারাক্ষণ অশ্লীল কথাবার্তা ও নোংরা আলাপচারিচায় সময় কাটাতে, তাদের প্রত্যেকের মুখে এখন গযনীর প্রতিটি প্রাসাদ থেকে ইট খুলে নেয়ার বিষোদগার। গযনীর ধ্বংসই এখন আলোচনার একমাত্র বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া একথাও শোনা গেছে, ওখানে বহু নারীর সমাগম হয়েছে। যারা অনেকটা জ্ঞাতসারেই দেহ ব্যবসার পসরা সাজিয়ে সৈনিক ও যুবকদের চরিত্র হনন করছে।
আমাদের একজন গোয়েন্দা এমন এক তরুণীর সাথে মিলিত হয়েছিলো। সে জানিয়েছে, এসব তরুণী শুধু দেহ ব্যবসাই করে না, এরা গযনী সালতানাত ও খাওয়ারিজম শাহ আবুল আব্বাসের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াচ্ছে। পর্দার অন্তরালে এসব দেহপসারিণীদের সম্পর্ক রয়েছে ওই দুই দরবেশের সাথে। তাদের কথাবার্তায় এ বিষয়টি একেবারে দিবালোকের মতো পরিষ্কার।…
আমাদের এক গোয়েন্দা বলেছে, বুখারার ফকিরের সাথে থাকা এক তরুণী একদিন নদীর তীরে তাকে একাকী পেয়ে ঘনবনের দিকে নিয়ে যায় এবং তাকে প্রেম নিবেদন করে। তখন ছিলো সন্ধ্যা। বেলা ডুবে গেলে তরুণী তার গলা জড়িয়ে ধরে প্রেম নিবেদন করে তার পরিচয় জানতে চায়। আমাদের গোয়েন্দা নিজেকে খাওয়ারিজম সেনাবাহিনীর কমান্ডার বলে পরিচয় দেয়। সেনাকমান্ডারের পরিচয় পাওয়ার পর তরুণী এমনভাবে নিজেকে তার সামনে মেলে ধরলো যে, সে যেনো যুগ যুগ ধরে তাকেই ভালোবাসে।
আমাদের গোয়েন্দা জানিয়েছে, এসব তরুণী খুবই সুন্দরী ও প্রশিক্ষিত । আমাদের গোয়েন্দা বলেছে, আমার যদি কর্তব্যবোধ না থাকতো, আর আল্লাহর কাছে জবাবদিহির প্রশ্ন ও পাপাচারের শাস্তির ভয় না হতো, তাহলে এই তরুণীকে আমি জীবনসঙ্গিনী করার জন্য সম্ভব সবকিছুই করতাম। আমাদের গোয়েন্দা আরো বলেছে
তরুণী তার মধ্যে কামোদ্দীপনা জাগিয়ে দিয়ে গলা জড়িয়ে বললো, “তোমাদের খাওয়ারিজম শাহ তো তার তৃতীয় স্ত্রীর গোলামে পরিণত হয়েছে। গযনী সুলতানের বোন নাহিদা খাওয়ারিজম শাহের জ্ঞানবুদ্ধি সবই গিলে ফেলেছে। সে এখন আঙুলের ইশারায় খাওয়ারিজম শাহকে নাচাচ্ছে।”
“আমাদের গোয়েন্দা তরুণীকে জিজ্ঞেস করলো, “রাজমহলের কথা তুমি কিভাবে জানলে?”
তরুণী জানালো, “আমি রাজমহলেরই রক্ষিতা ছিলাম। কিন্তু গযনী ঔ সুলতানের বোন নাহিদাকে আবুল আব্বাস বিয়ে করার পর একের পর এক
সুন্দরী তরুণীদের আগমন শুরু হয়। প্রতিদিন দলে দলে গযনী থেকে সুন্দরী ও তরুণীরা খাওয়ারিজমে আসতে শুরু করে। নাহিদা একেক রাতে আবুল আব্বাসের কাছে একেক সুন্দরীকে হাজির করে। নাহিদার চক্রান্তের কারণে আবুল আব্বাস হারেমের সকল সেবিকা ও রক্ষিতাকেই তাড়িয়ে দিয়েছে।” একথা বলে তরুণী কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং বলে… তুমিই বলো, এখন আমরা কোথায় যাবো?
“আমাদের বেঁচে থাকার এখন একটাই পথ।” আচ্ছা, তুমি কি আমাকে আশ্রয় দিতে পারো? আমাকে কি এই পঙ্কিল পথ থেকে বাঁচাতে পারবে? একথা শুনে আমাদের গোয়েন্দা তাকে সান্ত্বনা দিলো এবং পরবর্তীতে তার সাথে আবারো মিলিত হওয়ার কথা বলে সেখান থেকে সরে এলো।
