ধর্মবিশ্বাসে আমরা খৃস্টান। কিন্তু আপনাদের ধর্মের প্রতিটি বিধিবিধান সম্পর্কে আমরা অবগত। আমরা আপনাদের সৈন্যদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করেছি। আমাদের প্রশিক্ষিত মুসলিম অনুচরেরা আপনাদের সেনাশিবিরগুলোর অলিগলি ঘুরে ঘুরে নানা গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারা এ কথা খুবই সাফল্যের সাথে প্রচার করছে, খাওয়ারিজমকে সুলতান মাহমূদের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার নেতৃত্বের উপযুক্ত একমাত্র ব্যক্তিত্ব বুখারার গভর্নর আলাফতোগীন।
খাওয়ারিজম শাহ আবুল আব্বাস এবং তার নতুন স্ত্রী নাহিদা সম্পর্কে এমনই দুর্নাম ছড়ানো হয়েছে যে, সৈন্যরা আবুল আব্বাসকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। আমরা আশা করছি, অল্পদিনের মধ্যেই সৈন্যরা আবুল আব্বাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য উন্মত্ততা শুরু করবে।
“আপনার দুজন সহকারী সেনাপতি- যারা আবুল আব্বাসের কট্টর ভক্ত ছিলো- দু’জন প্রশিক্ষিত তরুণীকে তাদের পিছনে লাগিয়ে দিয়ে আমরা তাদেরকে আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। আপনার হয়তো জানাই ছিলো না, এই দুই প্রভাবশালী সেনাকর্মকর্তা আপনাকে মোটেও পছন্দ করতো না। এখন তারাও আপনাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে। এ ছাড়াও যদি আপনার কোন সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তবে আমাদের বলতে পারেন। আমরা আপনাকে আর্থিক, সামরিক ও পরিবহনের জন্য উপযুক্ত জন্তু দিয়ে সহযোগিতা করতে পারি।
“সেটি এখনই নয়।” বললেন আলাফতোগীন। এখনই যদি আপনাদের এসব সহযোগিতা নিই, তাহলে খাওয়ারিজম শাহ জেনে যেতে পারে। আমি একটা সুযোগের অপেক্ষা করছি, যাতে আমি আবুল আব্বাসের বিরুদ্ধে সৈন্যদের বিক্ষুব্ধ করে আমার পক্ষে নিয়ে আসতে পারি। আমি যদি খাওয়ারিজম শাহের গদি উল্টে দিতে পারি, তাহলে আপনাদের সহযোগিতার প্রয়োজন হবে।
“আমরা আপনার কাছে কোন প্রতিদান চাই না।” বললো অপর ফিরিঙ্গী। আমরা শুধু আপনার বন্ধুত্ব চাই। আপনার সাথে আমাদের শাসনতান্ত্রিক বন্ধুত্ব ও মৈত্রীস্থাপন হলেই বুঝতে পারবেন, গির্জা ও মসজিদের সম্পর্ক কতোটা হৃদ্যতাপূর্ণ। আমাদের এই স্বর্গীয় বন্ধুত্ব ও মৈত্রীর পথে সুলতান মাহমূদই একমাত্র বাধা। এই ঝগড়াটে লোকটির বিনাশ খুবই জরুরী।”
“আমিও তার ধ্বংস চাই।” বললেন আলাফতোগীন। এই যুদ্ধবাজ লোকটি তার সাম্রাজ্যকে আরো বিস্তৃত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
“আপনি হয়তো জানেন, আপনার সৈন্যরা কোন মুসলিম রাষ্ট্রের সৈন্যদের সাথেই যুদ্ধ করতে সম্মত নয়। বিশেষ করে গযনীর সৈন্যদের সাথে যুদ্ধের কথা তারা ভাবতেই পারে না।” বললো এক ফিরিঙ্গী।
“সৈন্যদের এই মনোভাব আবুল আব্বাসের তৃতীয় স্ত্রী নাহিদার প্রভাবে সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের চোখ আবুল আব্বাসের শয়নকক্ষের ভেতরের খবরও রাখে। আবুল আব্বাস তার আগের দুই স্ত্রীকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে সুলতান মাহমূদের বোনের প্রেমে পড়ে নিজের বিবেক-বুদ্ধি খুইয়ে ফেলেছে। এমনও হতে পারে, আবুল আব্বাস গযনীকে সামরিক সহযোগিতা দিয়ে বসবে; কিন্তু সে কিছুতেই গয়নী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হবে না।”
“অনিন্দ্য সুন্দরী দুই তরুণী বুখারার শাসক আলাফতোগীনসহ দুই ফিরিঙ্গীকে সুরা ঢেলে দিচ্ছিল। এই দুই তরুণী ছিলো ফিরিঙ্গীদের সঙ্গী। আলাফতোগীন শরাবের নেশার চেয়ে তরুণীদের রূপ সৌন্দর্যে বেশী আসক্ত হয়ে পড়েছিলো। সে বারবার তরুণীদের দিকে তাকাচ্ছিলো। তরুণীদের ভুবনমোহিনী মুচকি হাসি আর মনকাড়া চাহনীতে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলো। এদিকে দুই ফিরিঙ্গী অতিকৌশলে নেশাগ্রস্ত আলাফতোগীনের মন-মগজে খাওয়ারিজমের একচ্ছত্র অধিপতি তথা বাদশাহ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করে তুলেছিল।
গয়নী থেকে নাহিদার একান্ত ফুটফরমায়েশের জন্য জেবীন নামের মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তিকে পাঠানো হলো। নাহিদা আবুল আব্বাসকে জানালো, জেবীন ছিলো আমার একান্ত কর্মচারী। ভাইয়া তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। জেবীন খুবই বিশ্বস্ত এবং সমঝদার।
সত্যিকার অর্থেই জেবীন ছিলো অনুগত, দ্র, মেধাবী এবং পরিচ্ছন্ন মনের মানুষ।
কয়েক দিনের মধ্যেই জেবীন আবুল আব্বাসের মন জয় করতে সক্ষম হয়। জেবীন আবুল আব্বাসের রাজপ্রাসাদের অন্যান্য কর্মচারী ও সেবক সেবিকার উপর নজরদারী এবং তাদেরকে বশে রাখার ব্যাপারে খুবই দক্ষতার পরিচয় দেয়। অবশ্য একাজে আগে থেকেই জেবীন ছিলো পরীক্ষিত এবং অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ।
একদিন বিকেল বেলায় প্রাসাদের বাগানে বসেছিলো নাহিদা। জেবীন নাহিদার সামনে মাথা নীচু করে দু’হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিলো। অবস্থাদৃষ্টে যে কেউ মনে করবে, সে নাহিদার কথা শুনছে। বস্তুত জেবীন বলছিলো আর নাহিদা গভীর মনোযোগ দিয়ে জেবীনের কথা শুনছিলো।
“একটা কিছু ঠিকই ঘটে চলছে নাহিদা! আমাদের লোকেরা বুখারা ও হাজারাশীপ থেকে যেসব খবর আনছে, তা থেকে বোঝা যায় ওখানে কোন শয়তানী কারসাজী শুরু হয়েছে। হাজারাশীপের নদীর তীরে এক ফকির আস্তানা গেড়েছে, সে নাকি বিস্ময়কর সব ভবিষ্যদ্বাণী করছে। সে এমন ধরনের চক্রান্তমূলক কথাবার্তা বলছে যে, সেনাবাহিনীর সব লোক তার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েছে। সে এক হাতে কুরআন শরীফ আর একহাতে তসবীহ নিয়ে সারাক্ষণ ওয়াজ করে।”
