“এই ঘটনা থেকেই আপনি আন্দাজ করতে পারেন, সেখানে কী চলছে।” বললো জেবীন।
“আমাদের গোয়েন্দারা আরো খবর দিয়েছে, বুখারার গভর্নর আলাফতোগীনের প্রাসাদে দু’জন ভিনদেশী লোক বসবাস করছে, এদের চামড়া দেখে মনে হয় তারা ফিরিঙ্গী ইংরেজ। এরা ধর্মীয়ভাবে ইহুদীও হতে পরে কিংবা খৃষ্টানও হতে পারে। এখন আপনিই আমাদের বলুন, আমাদের কি করতে হবে? আপনি কি খাওয়ারিজম শাহকে এ ব্যাপারে জানাবেন, এখানে এসব ঘটছে?”
“না, তাকে এসব ব্যাপারে জানানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, এসব খবর আমি তাকে জানালে আমাকে জবাব দিতে হবে এসব খবর আমি কি করে কার মাধ্যমে পেলাম।”
“আবুল আব্বাস আমার হাতে আছে। আমি তাকে বলতে পারতাম, আপনি হাজারাশীপ ও বুখারার সকল সৈন্যকে রাজধানীতে বদলী করুন এবং রাজধানীর সৈন্যদেরকে সেখানে বদলী করুন। এরফলে এক জায়গায় থেকে থেকে সৈন্যরা অলস ও নিফর্ম হয়ে যাবে না। কিন্তু এ মুহূর্তে তাকে এমন কোন পরামর্শ দেয়া ঠিক হবে না। ওখানকার সৈন্যরা দুই ফকিরের সংশ্রবে যেভাবে বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে, এখানকার সৈন্যরা সেখানে গেলে এরাও খারাপ হয়ে যাবে।
তোমাদের প্রতি আমার নির্দেশ হলো, তোমরা কৌশলে ওই দুই ফকিরকে গায়েব কিংবা হত্যা করে ফেলল। গযনীতে এমন কিছু ঘটলে এদের গ্রেফতার করে শাস্তির মুখোমুখি করা যেতো। কিন্তু এখানে তা সম্ভব নয়। আচ্ছা,
আমাদের লোকেরা কি এদের হত্যা করার মতো ক্ষমতা রাখে? জেবিনকে জিজ্ঞেস করলো নাহিদা।
“ফকির দু’জনকে হত্যা করা আমাদের গোয়েন্দাদেরকে জন্য তেমন কোন কঠিন ব্যাপার নয়। আমাদের দরকার এ ব্যাপারে দিক-নির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতা।” বললো জেবীন।
“ঠিক আছে, আমি এই নির্দেশ দিলাম। তোমাদের প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপারটিও আমি নিশ্চিত করবো। তবে এই কাজের সাথে সাথে গযনী সুলতানের কাছে খবর পাঠিয়ে দাও, আমার নির্দেশে দুই চক্রান্তকারী ফকিরকে হত্যা করা হচ্ছে এবং হাজারাশীপ ও বুখারাতে যা ঘটছে এর বিস্তারিত খবরও দিয়ে দাও।” জেবিনকে বললো নাহিদা।
* * *
কয়েকদিন পর নদীর তীরবর্তী দরবেশের আস্তানা থেকে লোজন বাড়ী ফিরতে শুরু করে। রাত বাড়ার সাথে সাথে দরবেশের আস্তানা থেকে লোকজন সরে যেতে থাকে।
এক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের ভিড় কমে যায়। অর্ধরাতে সাধারণ মানুষের ভিড় কমে যাওয়ায় দেহপসারিণী তরুণীরা খদ্দের সাথে নিয়ে দূরের নদী তীরের ঝোঁপ-ঝাড়ের আড়ালে চলে যায়।
দরবেশের আস্তানায় মানুষের ভিড় কমে গেলেও দু’জন লোক আস্তানার ধারে পাশেই ঘোরাফেরা করছিলো। দরবেশ বাইরের মশাল নিভিয়ে দিয়ে তাঁবুর ভেতরে চলে গেল। তাঁবুর বাইরে দু’জন প্রহরী প্রহরা দিচ্ছিলো। প্রহরী দু’জন প্রহরা দেয়ার লক্ষ্যে অনড় বসে ছিলো আর অজ্ঞাত দুজন লোক তাঁবুর অদূরে থেকে প্রহরীদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছিল। তাদের একজন সঙ্গীর উদ্দেশ্যে বললো
“মনে হয়, তাঁবুর বাইরে অপেক্ষমাণ এই লোক দুটি দরবেশের প্রহরী। এরা তাঁবুর সম্মুখ থেকে সরবে না।”
“এরা তাঁবুর ভেতরে চলে গেলে আমাদের কাজ কঠিন হয়ে যাবে।” বললো অপরজন।
“একটা পরীক্ষা করা যেতে পারে।” বললো প্রথমজন । তুমি ওদের কাছে গিয়ে নিজেকে সেনাবাহিনীর কমান্ডার পরিচয় দেবে আর এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবে যে, তুমি দরবেশের খুব ভক্ত। আর এদিকে আমি কাজ সমাধা করার চেষ্টা করবো।”
দ্বিতীয় ব্যক্তি সঙ্গীর কথামতো প্রহরীদের কাছে গিয়ে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক গল্প জুড়ে দেয়। লোকটি যখন নিজেকে সেনাবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে পরিচয় দেয়, তখন দরবেশের প্রহরীরা তার সাথে কথা বলতে বেশ উৎসাহবোধ করে। লোকটি প্রহরীর উদ্দেশ্যে বললো, বাবাজী হয়তো শুয়ে পড়েছেন, এখানে আমরা কথা বললে তার ঘুমের ব্যাঘাত হবে, আমাদের একটু দূরে গিয়ে কথাবার্তা বলা উচিত ।
এই বলে সে দুই প্রহরীকে একটু দূরে সরিয়ে নিলো।
দরবেশ চতুর্দিকে পর্দা ঘিরে দিয়েছিলো। অপরদিকে তার সঙ্গী অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে তাঁবুর পিছনে চলে গেলো এবং হামাগুড়ি দিয়ে তাঁবুর পর্দা ফাঁক করে ভেতরটা দেখে নিলো।
তাঁবুর ভেতরের মশালের আলোয় সে দরবেশকে পরিষ্কার দেখতে পেলো। দরবেশরূপী কুচক্রী দেদারছে শরাব গিলছে। গোয়েন্দা যে দিকটা উঁচু করে দরবেশকে দেখছিলো, এ দিকটায় ছিলো দরবেশের পিছন দিক। এই দুই আগন্তুক ছিলো গযনীর দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা।
গোয়েন্দা খুব ধীরে ধীরে তাঁবুর একটি রশি খুলে নিলো এবং হামাগুড়ি দিয়ে তাঁবুর ভেতরে ঢুকে পড়ল। দরবেশ তখন প্রচুর মদ গিলে বেহুঁশ। গোয়েন্দা দুপায়ের উপর ভর করে রশিতে ফাস তৈরী করে দরবেশের গলায় ছুঁড়ে দিলো এবং একটানে ফাঁস আটকে ফেলল। দরবেশের মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হওয়ার অবকাশ ছিলো না।
মুহূর্তের মধ্যেই দরবেশের দেহ নিথর হয়ে গেল। দরবেশরূপী মদ্যপের মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গোয়েন্দা হামাগুড়ি দিয়ে তাঁবুর পিছন দিক দিয়ে দূরে চলে গেলো। এদিকে তার সঙ্গী দরবেশের দুই প্রহরীর সাথে জমিয়ে গল্প করছিল। হঠাৎ তারা পেঁচার ডাক শুনতে পেলো।
পেঁচার আওয়াজ শুনে দরবেশের দুই প্রহরীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার দু’জন সঙ্গীর সাথে এসে মিলিত হলো এবং তাদের উদ্দেশ্য সফল করে অন্ধকারে তাদের গন্তব্যে পা বাড়াল। পেছনে পড়ে রইলো হাজারাশীপের সেনাদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী চক্রান্তকারীর মরদেহ।
