“তোমার এই কথাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।” বললো আবুল আব্বাস। তুমি যা বলছে তার সবই সত্য। কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলার জন্য তো আরো অনেক সময় পাওয়া যাবে। আজকের শুভ রাতে তুমি এসব জটিল বিষয়ের অবতারণা করছো কেন? তুমি কি আমার প্রেম-ভালোবাসা, আবেগ-উচ্ছ্বাস সবকিছুকে আজ রাতেই রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দিতে চাও?”
“হ্যাঁ, তুমি যদি তাই মনে করো, তবে আজ রাতেই আমি তোমাকে রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দিতে চাই। কারণ, বিয়ের প্রথম রজনীটি যে কোন মানুষের জন্য খুবই পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। সে কথা তুমি জানো আবুল আব্বাস! বাসর রাত তোমার জন্য নতুন কিছু ন। আমার জন্যও এ রাতটি জীবনের প্রথম নয় । আমি তোমার প্রেম-ভালোবাসা, আবেগ-উচ্ছ্বাস কিছুতেই নষ্ট হতে দেবো না। আমাকে পেয়ে যদি তোমার জীবনের স্বপ্নগুলো আরো রঙিন হয়ে থাকে, তাহলে সেই রঙিন স্বপ্নগুলোকে আমি স্বযত্নে আরো বর্ণিল করে তুলব। আমার মনের গহীনে পুষে রাখা জটিল কথাগুলো আমাকে বলতে দাও আর তোমার স্বপ্নগুলো আমাকে বুঝবার অবকাশ দাও। এখনও তো রাত অনেক রয়ে গেছে। জীবনে আরো কতো রাত আসবে। আমি তোমার প্রতিটি রাতকেই মোহনীয় করে তুলবো। কিন্তু একটু ধৈর্য ধরে আমার কটি কথা শুনে নাও।
আজকের যে রাতে আমরা সুখসাগরে সাঁতার দিতে যাচ্ছি, এ রাতটি গযনীর হাজারো কন্যা-জায়া-জননীর জন্য বিষাদে ভরা। গযনীর হাজারো যুবতী আজকের এ রাতেও তাদের প্রাণপ্রিয় স্বামীদের বিরহ যাতনা নিয়ে নির্মুম নিষ্পেষণে অতিবাহিত করছে, যাদের স্বামীরা আর কোন দিন তাদের কাছে ফিরে আসবে না। আল্লাহর সেই সৈনিকেরা আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিতে আল্লাহু আকবার স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে হিন্দুস্তান গিয়েছিলো। সেখানে গিয়ে তারা সম্পূর্ণ বৈরী আবহাওয়া ও প্রতিকূল পরিবেশে আটকে পড়ে। যেখান থেকে তাদের অনেকের পক্ষেই ফিরে আসা সম্ভবপর হয়নি। যাওয়ার আগে তারা শপথ করে গিয়েছিলো, তারা যেখানেই যাবে, সেখানে মসজিদ আবাদ করবে, আল্লাহর জমিন থেকে মূর্তিপূজাকে উৎখাত করবে। তারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়ে দিয়েছে। আমি আজ রাতের সকল ঐ প্রেম-ভালোবাসা, সুখ ও আনন্দকে তাদের পবিত্র ত্যাগের জন্য উৎসর্গ করছি…।
আবুল আব্বাস! এদের বিপরীতে তুমি সেইসব ক্ষমতালি রাজন্যবর্গের রাজসিকতার দিকে তাকিয়ে দেখ, যাদের ক্ষমতালিপ্সর জন্য প্রতিটি মুসলিম জনপদ মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। প্রতিটি মুসলিম রাজ্যেই বিরাজ করছে গৃহযুদ্ধ। আজকের এই পবিত্র রাতে যদি তুমি আমার কথা ধৈর্য সহকারে শোন, তাহলে মুসলিম রাজ্যগুলোতে ভাইয়ের তরবারী ভাইয়ের মাথা দ্বিখণ্ডিত করতে থাকবে। ভাইয়ের ধনুক থেকে ছোঁড়া তীরে ভাইয়ের বুক ঝাঁঝরা হতেই থাকবে। আজকের এই পবিত্র রাতে আমার সেইসব মা-বোন ও তরুণী স্ত্রীদের কথা মনে পড়ছে, যাদের সকল সুখ-আহ্লাদ, স্বপ্ন-সাধনা ক্ষমতালোভী রাজন্যবর্গের অন্যায় বিদ্বেষের আগুনে জ্বলেপুড়ে ভস্ম হয়ে গেছে। আবুল আব্বাস! তুমি একজন টগবগে যুবক। আমিও যুবতী। এসো, ক্ষণিকের জন্য আমরা বাসর রাতের রঙিন স্বপ্ন ও যৌবনের উচ্ছ্বাস পাশে রেখে কয়েকটি জরুরী কথা আলোচনা করি।
আবুল আব্বাস! তুমি কি আমাকে বলবে, খাওয়ারিজম শাহ কেন আজো গযনী আক্রমণ করেনি? তোমার জান্নাতবাসী পিতা কেন হত্যার শিকার হয়েছিলেন? তুমি কি জানো, গযনী আক্রমণ করার জন্য তাকে উস্কানী দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু তিনি কিছুতেই গযনী আক্রমণ করতে সম্মত হননি। ফলে তাকে হত্যা করা হলো। তোমার বড় ভাই পিতার অকাল মৃত্যুতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন। দিন দিন তার দেমাগ খারাপ হতে লাগলো। আমাকে বিয়ে করার প্রথম রাতেই আমি তাকেও এসব কথাবার্তাই বলেছিলাম। তিনি আমার প্রতিটি কথা হৃদয়ের মণিকোঠায় গেঁথে নিয়েছিলেন।”
“আচ্ছা নাহিদা! তুমি কি একথা জানতে যে, ভাইয়াকে নাকি তোমার ভাই মাহমূদ বিষ পান করিয়েছিলো? সুলতান মাহমূদের অধীনতা সে মেনে নেয়নি বলেই নাকি তাকে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছে।”
“তুমি কি একথায় বিশ্বাস করো?” জিজ্ঞেস করলো নাহিদা।
“ঠিক বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু আমার মধ্যে সংশয় ঠিকই তৈরী হয়েছিলো।” বললো আবুল আব্বাস।
“এখানে সংশয়-সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। যে সমরনায়ক শত্রুবাহিনীর সংখ্যার তুলনায় এক-চতুর্থাংশ কিংবা এক-পঞ্চমাংশ সৈন্য নিয়ে সব সময় শত্রুদের প্রবল সামরিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম, তার মতো বীর বাহাদুর কাউকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে পারে না। এটা কাপুরুষের কাজ, বীর পুরুষের নয়।
আমার ভাইয়ের যদি প্রয়োজন হতো তোমার ভাইকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার, তাহলে তিনি জুরজানিয়া এসে এখানকার প্রতিটি ইট বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারতেন এবং তোমার ভাইকে কয়েদ করে জিন্দানখানায় ভরে রাখা তার পক্ষে মোটেও কঠিন ব্যাপার ছিলো না। আমি তোমাকে বলছিলাম, আমাকে বিয়ে করে আনার পর আমি যখন দেখতে পেলাম, এখানে গযনী সালতানাতের বিরুদ্ধে রণপ্রস্তুতি চলছে, কতিপয় কুচক্রী তোমার ভাইকে গযনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর উস্কানী দিচ্ছে, তখন তোমার ভাইকে আমি এ ভয়াবহতা ও ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে বোঝালাম। তিনি আমার কথায় আশ্বস্ত হলেন এবং কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রে পা দিতে রাজী হলেন না।
