“তাদের পিছনে বসে সুলতান মাহমূদের দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তা তাদের কথাবার্তা শুনছিলো। আলাফতোগীন ও তার সাথীরা যখনই তাদের দিকে তাকাতো, তখনই তারা উভয়কেই ময়দানের খেলা দেখায় মগ্ন দেখতে পেতো। তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে লাখো দর্শক জনতার হৈ চৈ আর উল্লাস ধ্বনিতে গোটা এলাকা সরগরম। এরই মধ্যে সুলতান মাহমূদের দুই গোয়েন্দা গভর্নর আলাফতোগীন ও তার সাথীদের কর্থাবার্তা শোনার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু তারা বেশীক্ষণ আর সেই বিষয়ে আলাপ করলো না। প্রসঙ্গ বদল করে অতি সাধারণ মজলিসী কথাবার্তা বলতে শুরু করলো। কিন্তু প্রাথমিক কথাবার্তা শুনেই সুলতানের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছিলো এরা এই বিয়েতে মোটেই খুশী হতে পারেনি। ভয়ঙ্কর কোন চক্রান্তের আয়োজনে তারা ব্যস্ত। অচিরেই তারা বাদশা আবুল আব্বাসের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেবে।
মাঝরাত পর্যন্ত চললো আবুল আব্বাসের বিবাহোত্তর জাকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। মাঝরাতের পর অনুষ্ঠান শেষে সবাই যার যার মতো ঘরের পথ ধরলো। দূরের অতিথিরা তাদের জন্য নির্দিষ্ট অতিথিশালায় ঘুমোতে গেলো।
সবাই যার যার মতো শয়নকক্ষে চলে গেলেও বুখারার গভর্নর আলাফতোগীন, প্রবীণ সেনাপতি আবু ইসহাক ও সেনাপতি খমতাশ একই কক্ষে সমবেত হলেন। মধ্যরাতের পর হঠাৎ ভেতর থেকে তাদের কক্ষের দরজা খুলে একজন বোরকা পরিহিতা মহিলা প্রবেশ করলো। ঘরে প্রবেশ করেই মহিলা তার চেহারার নেকাব খুলে ফেললো। এই মহিলা আর কেউ নয়, আবুল আব্বাসের দ্বিতীয়া স্ত্রী সেনাপতি আবু ইসহাকের কন্যা আলজৌরী।
গতরাতের সব কথাই আমি জানতে পেরেছি। একটি আসনে বসতে বসতে বললো আলজৌরী। নাহিদার বাসর রাতের জন্য যে সেবিকাকে নির্দিষ্ট করা হয়েছিলো, তাকে আমি আগেই হাত করে নিয়েছিলাম। সে আমার কথামতো বাসর রাতে আবুল আব্বাস ও নাহিদার কথাবার্তা শোনার জন্য দরজার সাথে কান লাগিয়ে রেখেছিলো। সে রাতে তার দায়িত্ব ছিলো আবুল আব্বাসের দরজার পাশে থাকা। ফলে তাকে দরজায় কান লাগিয়ে বসে থাকতে দেখেও কারো কিছু বলার ছিলো না।
সেবিকা বুদ্ধি করে কক্ষের একটি জানালার একটি পাল্লা ঈষৎ খুলে রেখেছিলো। কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই আবুল আব্বাস নিজেই সেবিকাকে ডেকে ভেতরে নিয়ে নেয়। সেবিকার উপস্থিতিতেই নাহিদা ও আবুল আব্বাসের কথাবার্তা চলতে থাকে। সেবিকার মুখে যা শুনলাম, তা আমি আপনাদের বলে দিচ্ছি। নাহিদা আবুল আব্বাসের ঘরে শুধু বউ হয়েই আসেনি- সে একটি কঠিন উদ্দেশ্য এবং ফাঁদ হয়ে এসেছে।
আবুল আব্বাসও তাকে শুধু বউ মনে করে না। আবুল আব্বাসের কথাবার্তা থেকে অনুমিত হচ্ছে, সে নাহিদার প্রেমে অন্ধ এবং নাহিদাকেই সে মনে করে মনের সম্রাজ্ঞী।
সে যুগের রাজকীয় সংস্কৃতি এবং রাজ-রাজাদের একান্ত সেবিকাদের জন্য তাদের বাসর ঘরের একান্ত কথাবার্তা শোনার বিষয়টি বর্তমানের আলোকে উদ্ভট মনে হলেও সে যুগে তা মোটেও অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো না। সেবিকা আলজৌরীর টোপ গিলে আলজৌরীকে আবুল আব্বাস ও নাহিদার যেসব অন্তরঙ্গ কথাবার্তা পাচার করেছিলো, তা ছিলো অনেকটা এরকম
আবুল আব্বাসের উদ্দেশে নাহিদা বললো, “আবুল আব্বাস! একজন তৃতীয় স্ত্রীর প্রয়োজনে যদি তুমি আমাকে বিয়ে করে থাকো, তাহলে খোলাখুলি আমাকে সেই কথা বলে ফেলো। তোমার প্রেমকে হৃদয়ের মণিকোঠায় ধারণ করে আমি অনুতাপের কান্না কেঁদে নেবো।”
“না না নাহিদা! তোমাকে আমার প্রয়োজন ছিলো। নয়তো স্ত্রী হিসেবে নারীর অভাব আমার ছিলো না। কেননা, তুমি আমার ভাইয়ের স্ত্রী থাকা অবস্থাতেও তো আমাকে প্রাণাধিক স্নেহ করতে।”
“তখন ঠিকই তোমাকে ভালোবাসতাম। তবে সেই স্নেহ-ভালোবাসা ছিলো ভিন্ন। মূর্তি সংহারী এক মুজাহিদের বোনের মধ্যে চারিত্রিক স্খলন থাকতে পারে না। স্বামীকে সে ধোকা দিতে পারে না। তখন তোমার চলাফেরা
ও কথাবার্তা সবকিছুই আমার ভালো লাগতো। সেটি ছিলো একজন গুণমুগ্ধ ভাবীর দেবরের প্রতি পবিত্র মমত্ববোধ, যার মধ্যে কোন পঙ্কিলতা ছিলো না।”
“তাহলে আমি কি এটাই বুঝবো যে, আমাকে তোমার খুব ভালো লাগতো বলেই তুমি আমাকে বিয়ে করেছো?” নাহিদার উদ্দেশ্যে বললো আবুল আব্বাস।
“না, আমি শুধু এজন্য তোমার সাথে বিয়েতে রাজী হইনি। বললো নাহিদা। তোমার যেমন স্ত্রীর অভাব ছিলো না, বিয়ের প্রশ্নে আমারও পুরুষের ঘাটতি ছিলো না। গযনী সালাতানাতে শত শত বীর বাহাদুর সুশ্রী যুবক আমাকে পাওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিলো। তোমাকে বিয়ে করার মধ্যে আমার ভালোবাসা ছাড়া আরো উদ্দেশ্য আছে। আমি শুধু তোমার জন্য ভালোবাসাই নিয়ে আসিনি, এনেছি একটি পবিত্র পয়গাম। এ পয়গাম কোন জাগতিক পয়গাম নয় কিংবা আমার ভাইয়ের পক্ষ থেকে কোন রাজকীয় বার্তাও নয়। এ পয়গাম আল্লাহর দেয়া পয়গাম।
আবুল আব্বাস! তুমি কি এ ব্যাপারে আমার সাথে একমত হবে না যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গযনীকে মূর্তি সংহারীদের শহর বলে জানবে? একথা কি তুমি অস্বীকার করতে পারবে যে, সালতানাতে গযনী প্রতিবেশী মুসলিম রাজন্যবর্গের জন্য কাঁটা হয়ে বিরাজ করছে। তারা সবাই মিলে ইসলামের এই আলোকিত অধ্যায়কে কালিমাযুক্ত করতে উঠে পড়ে লেগেছে?”
