অবশ্য আমারও এ ব্যাপারে সন্দেহ হতো, তোমার ভাইকে এমন কোন বিষ হয়তো খাওয়ানো হয়েছে, যা খুব ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে বিষক্রিয়া ঘটিয়েছে। ফলে দিন দিন তার অসুখ বেড়েই যাচ্ছিল। যদি সত্যিই তাকে বিষ খাওয়ানো হয়ে থাকে, তবে সেই কুচক্রীরাই তাকে বিষ খাইয়েছে, যারা খাওয়ারিজম ও গযনীর মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধানোর চেষ্টা করছিল।
“তোমার মতে কারা সেই কুচক্রী? কে এই বিষ প্রয়োগের সাথে জড়িত?” নাহিদার প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো আবুল আব্বাস।
“মূল কাজটি মুসলমানরাই করেছে। কিন্তু ওদের পিছনে হাত রয়েছে ইহুদী ও ফিরিঙ্গীদের” বললো নাহিদা। ইহুদী ও খৃস্টান চক্রান্তকারীদের সম্মিলিত চক্রান্তের ফসলই মুসলিম দেশসমূহের মধ্যকার গৃহযুদ্ধ। তাছাড়া কারামতি উপজাতিদেরও এতে হাত আছে। কারণ, আমার ভাই কারামতিদের শীর্ষনেতাকে খতম করে ওদের আখড়া গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন।”
“নাহিদা! আমি অকালে নিহত হতে চাই না।” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো আবুল আব্বাস।
“এমনটি বলো না। বরং বলল, আমি আল্লাহর পথে নিহত হতে চাই।” বললো নাহিদা।
“দেখছে না, আমার ভাই বারবার হিন্দুস্তানের প্রতিকূল পরিবেশে গিয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে চায়। আমিও এটিই চাই এবং আল্লাহ ও তাই ভালোবাসেন। তুমি আমার ভাইয়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রণাঙ্গন চষে বেড়াও। আল্লাহর পথে তোমাকে উৎসর্গ হতে দেখলে আমি আমার সকল সুখ-স্বপ্ন কুরবান করে দিতেও প্রস্তুত। যদি তুমি এতোটা না-ই পারো, অন্তত গযনী সালতানাতের বিরুদ্ধে কোন তৎপরতা না চালিয়ে গযনীর সাথে মৈত্রী সম্পর্ক শক্তিশালী করো।”
“ঠিকই বলেছো নাহিদা। এ মুহূর্তে সুলতানের একজন শক্তিশালী মিত্র দরকার। কারণ, তাঁর সামরিক শক্তি খুবই দুর্বল হয়ে গেছে।” বললো আবুল আব্বাস।
“তোমার কথা পুরোপুরি ঠিক নয়। গযনীর শক্তি এতোটা দুর্বল হয়ে যায়নি, যতোটা তোমরা মনে করছো।” বললো নাহিদা। এখনো যথেষ্ট সৈন্য রয়েছে গযনীতে। তাছাড়া হিন্দুস্তানী সৈন্যদের ব্যারাক সম্পূর্ণ অব্যবহৃত। তাদেরকে কখনো হিন্দুস্তানের কোন যুদ্ধে ব্যবহার করা হয় না। তাদেরকে এদিকে ব্যবহার করার জন্য রিজার্ভ রাখা হয়েছে।
গযনী সুলতানের অধীনে ওরা খুবই সুখে আছে এবং ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নিয়ে মুসলমান হচ্ছে। হাজার হাজার গযনীবাসী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়েছে। এরপরও যে সামান্য ঘাটতি আছে, তাকে পুষিয়ে নেয়ার মতো আত্মশক্তি ও মনোবল গযনী সেনাদের রয়েছে। কাজেই গযনী সালতানাতকে কোন বহিঃশত্রুর আগ্রাসন থেকে রক্ষার জন্য সুলতান মাহমূদের কোন সামরিক শক্তির সাথে মৈত্রী গড়ে তোলা জরুরী এই ভুল ধারণা মনের ভেতর থেকে দূর করে দাও। সুলতানের চেয়ে বরং তোমার একজন শক্তিশালী মিত্রের খুব প্রয়োজন।”
“তোমার ভাইয়ের সাথে আমি মৈত্রী স্থাপন করবো ঠিক; কিন্তু তার অধীনতা মেনে নেবে না। সে যদি খুৎবায় তার নাম উচ্চারণের প্রস্তাব করে, তবে তো আমি কখনোই তা মেনে নেবে না। নাহিদা! তোমাকে আজ একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, তোমার প্রতি ভালোবাসা ছাড়াও আমার তোমাকে বিয়ে করার অন্যতম উদ্দেশ্যে তোমার ভাইয়ের সাথে মজবুত মৈত্রী গড়ে তোলা। কারণ, ভেতরে বাইরে আমি চরম শত্ৰুবেষ্টিত। এমতাবস্থায় তার মতো একজন শক্তিশালী মিত্রের আমার খুবই প্রয়োজন। আমি আশা করি, তিনি বন্ধুত্বের হক পুরোপুরিই আদায় করবেন।”
“তার কাছ থেকে বন্ধুত্ব ও মৈত্রীর অধিকার আদায় করার দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছি আবুল আব্বাস। কিন্তু মৈত্রী বড় কথা নয়। মৈত্রী তখনই অর্থবহ হবে, যখন যে কোন দুর্যোগ ও বহিরাক্রমণে খাওয়ারিজম ও গযনীর সৈন্যরা একত্রে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় অবতীর্ণ হবে।”
“এমনটিই হবে নাহিদা, এমনটিই হবে।” বললেন আবুল আব্বাস।
এরপর আবুল আব্বাস নাহিদাকে বুকে জড়িয়ে আবেগপূর্ণ কথাবার্তা ও আচরণ করতে শুরু করলেন। সেবিকা আলজৌরীকে জানাল, সে মনে করেছিল, যে নারী বাসর রাতে রসকষহীন জীবনমৃত্যু যুদ্ধ-জিহাদের মতো নীরস ওয়াজ নিয়ে মেতে উঠেছিলো, সেই নারীর মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা, আবেগ-সোহাগের বালাই থাকতে পারে না। কিন্তু এক পর্যায়ে যুদ্ধ-বিগ্রহের কথায় বিরতি দিয়ে নাহিদাও আবুল আব্বাসের কামোদ্দীপক বাসনায় এভাবে সাড়া দিলো যে, তার প্রতিটি শব্দ ও বাক্য ছিল উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনায় ভরপুর। অল্পক্ষণের মধ্যেই সে আবুল আব্বাসকে কামনার উচ্ছ্বসিত আবেগ ও কামোদ্দীপক উত্তেজনাপূর্ণ কথায় নেশাগ্রস্ত করে ফেললো। ত্রিশের কোঠায় পা দেয়া নাহিদা যেনো সতেরো বছরের তরুণীতে রূপান্তরিত হলো। তার প্রতিটি হাসি ও কথায় যেন টপকে পড়ছিলো মোহনীয় মধুময় সুধা। এমনই যাদুমাখা ছিলো নাহিদার প্রতিটি কথা, যেন তা কঠিন সীসাকেও মোমের মতো গলিয়ে দিতে সক্ষম ছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে আবুল আব্বাসকে শান্ত-সুবোধ শিশুর মতোই প্রেমের অক্টোপাসে বেঁধে ফেলেছিলো নাহিদা। নাহিদার এই দুর্দান্ত তৎপরতার কাছে মনে হলো আবুল আব্বাস নিতান্তই আনাড়ী বালক।
বুখারার গভর্নর আলাফতোগীন সেবিকাকে দেয়ার জন্য আলজৌরীর হাতে দুটি স্বর্ণমুদ্রা দিলেন। আলজৌরীকে বললেন, তুমি সেবিকাকে বাগে রেখে ওর কাছ থেকে আবুল আব্বাস ও নাহিদার মধ্যকার সব কথাই জানতে চেষ্টা করবে। গুরুত্বহীন কথা হলেও তা শুনতে অবহেলা করবে না।”
