তিনজনের মধ্যে একজন হলো, বুখারার গভর্নর আলাফতোগীন, দ্বিতীয়জন আবুল আব্বাসের দ্বিতীয় শ্বশুর সেনাপতি আবু ইসহাক, তৃতীয়জন বুখারা অঞ্চলের সেনাপতি খমরতাশ।
এই দুজনকে এর চেয়ে বেশী সতর্ক ও জ্ঞান দেয়ার কোনই প্রয়োজন ছিলো । কারণ এরা উভয়েই দুটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা শাখার প্রধান। তারাই খাওয়ারিজমের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের কথা তাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন। এই দুই ব্যক্তি যখন জুরজানিয়ার বিয়ে অনুষ্ঠানে হাজির হলেন, তাদের দেখে কারো বোঝার উপায় ছিলো না, এরা সুলতান মাহমূদের গোয়েন্দা শাখার প্রধান এবং মাটির নিচের ঘটনাবলীও এরা দিব্যচোখে দেখতে পারে। তারা একনজর তাকালেই যে কারো ভেতরের মনোভাবও বুঝতে পারে। তারা উভয়েই ব্যবসায়ীদের মতো ঢিলেঢালা পোশাকে সজ্জিত ছিলো।
উভয়েই আলাফতোগীন, খমতাশ ও আবু ইসহাকের পিছনের সারিতে গিয়ে বসলেন। রাতের প্রজ্জ্বলিত মশালের আলোয় ঘোড়দৌড় শুরু হবে হবে অবস্থা। বিশাল মাঠের চতুর্দিকে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। এক পাশে বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে বাদশা, নতুন রাণী এবং রাষ্ট্রীয় অতিথিদের আসন। তরবারী প্রতিযোগিতা, মল্লযুদ্ধ ছাড়া নানা ধরনের সামরিক কলা-কৌশল প্রদর্শনীর আয়োজন সম্পন্ন।
হঠাৎ তীব্র ও উচ্চ রণসঙ্গীত বাজিয়ে জানানো হলো নব বরবেশী বাদশা আবুল আব্বাস ও নতুন রাণীবেশী নাহিদার আগমনীবার্তা। আবুল আব্বাস নববধূ নাহিদাকে নিয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছেন। নাহিদা দীর্ঘাঙ্গি, সুন্দরী যুবতী। তার প্রতিটি পদক্ষেপে রাজকীয় গাম্ভীর্যতা ও অবয়বে দীপ্তিময় আভা। যুবক বাদশা আবুল আব্বাসও অপূর্বসাজে সজ্জিত।
দৃঢ় পদক্ষেপে নাহিদাকে নিয়ে তিনি রাজকীয় আসনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সেনাবাহিনীর বাদক দল আকাশ-বাতাস মুখরিত করে আগুন ঝরানো বাজনা দিচ্ছে। চতুর্দিকে লাখো জনতার কণ্ঠে হর্ষধ্বনি। মহামান্য বাদশা আবুল আব্বাস দীর্ঘজীবী হোক, সুখময় হোক তাদের নতুন দাম্পত্য, দীর্ঘতর হোক মামুনী শাসন। আবুল আব্বাস ও নাহিদার পিছনে পিছনে আবুল আব্বাসের প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীও রাণীর পোশাকে সজ্জিত হয়ে আসছিলো। তবে তাদের চেহারায় তেমন কোন জৌলুস ছিলো না, ছিলো না কোন আনন্দ-ফুতি আবেগ ও উচ্ছ্বাসের চিহ্ন।
সুলতান মাহমূদ তার বোনের বিনিময়ে শুধু খাওয়ারিজম শাহকে নয় গোটা খাওয়ারিজম সালতানাতকেই খরিদ করতে চাচ্ছে। বিদ্রুপাত্মক কণ্ঠে বললো আবুল আব্বাসের দ্বিতীয় শ্বশুর এবং সেনাবাহিনীর অন্যতম সেনাপতি আবু ইসহাক।
আবু ইসহাকের এ কথায় পিছনের দিকে তাকালেন বুখারার গভর্নর আলাফতোগীন। তাদের পেছনেই সুলতান মাহমুদের দুই শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ব্যবসায়ী বেশে বসে পরস্পর কথা বলছে।
“আপনারা কোত্থেকে এসেছেন?” স্মিত হেসে পিছনের দুজনকে জিজ্ঞেস করলেন গভর্নর আলাফতোগীন।
উভয়েই স্মিতহাস্যে আলাফতোগীনের প্রত্যুত্তরে মাথা দোলালেন। তারা উভয়েই মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলেন আলাফতোগীনের ভাষা তারা বুঝতে পারছেন না। অথচ তাদের মাতৃভাষাই ছিলো ফারসী। আলাফতোগীন ফারসী ভাষাতেই তাদের পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। আলাফতোগীন, খমরতাশ ও আবু ইসহাক প্রত্যেকেই নানাভাবে তাদের পরিচয় জানার চেষ্টা করছিলেন কিন্তু দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিপুণতার সাথেই তাদের বোঝাতে সক্ষম হলেন, তাদের কোন কথাই তারা বুঝতে পারছেন না। এক পর্যায়ে তাদের একজন বললেন, ‘ফিরকতাগ। ফিরকতাগ জুরজানিয়া থেকে পূর্বদিকে অনেক দূরে অবস্থিত একটি পাহাড়ী এলাকার নাম। ওখানকার ভাষা ছিলো ভিন্ন।
“এরা আমাদের ভাষা বোঝে না”। দুসঙ্গীকে বললেন বুখারার গভর্নর আলাফতোগীন। আমি ওদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম। ঠিক আছে…। আবু ইসহাক! আপনি কি যেনো বলতে চাচ্ছিলেন?”
“বলছিলাম, এ বিয়ে শুধু আবুল আব্বাস আর নাহিদার মধ্যে হয়নি। এই সম্পর্কের মাধ্যমে গোটা খাওয়ারিজমকেই বোনের বিনিময়ে খরিদ করতে চাচ্ছে সুলতান মাহমূদ। এখান থেকে সুলতান মাহমূদ আর তার বোন আবুল আব্বাসকে আঙুলের ফাঁকে ঘোরাবে, আঙুলের ইশরায় নাচাবে। সে বুঝতেই পারবে না খাওয়ারিজমের উপর গযনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আপনি কি এমন ন্যাক্কারজনক অধীনতা মেনে নেবেন আলাফতোগীন?”
“আরে, সেই সময়টা আসতে দাও না”। বললেন আলাফতোগীন। খাওয়ারিজমের মাটিতে কোন গযনী সৈন্যের পা পড়লে ওদের চিহ্নও কেউ খুঁজে পাবে না।”
“আগে থেকেই এজন্য প্রস্তুতি নেয়া দরকার।” বললেন সেনাপতি খমরতাশ।
“সেনাবাহিনী আপনার নিয়ন্ত্রণে। সৈন্যদেরকে আপনি নিজের আয়ত্তে রাখুন।”
“দেখো, এসব কথা কি এখানে আলোচনা করা ঠিক হবে?” উদ্বিগ্নকণ্ঠে বললেন সেনাপতি আবু ইসহাক।
“চিন্তার কারণ নেই। আমাদের সবচেয়ে কাছে বসা লোক দু’জন আমাদের ভাষা বোঝে না।” বললেন সেনাপতি খমতাশ।
“ওরা আমাদের ভাষা না বুঝুক, ডানে-বামে কথা চলে যেতে পারে। সতর্কতার বিকল্প নেই।” বললেন আলাফতোগীন।
আচ্ছা আবু ইসহাক! আবুল আব্বাসের উপর আপনার মেয়ের কি কোন প্রভাব আছে?”
“আছে বৈকি। কিন্তু এখন কতটুকু থাকবে সেটাই চিন্তার বিষয়। মাহমূদের বোন নাহিদা খুবই চালাক। মনে হয় এখন আর আমার মেয়ে তার প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে না।
