১০১৫ সালে অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে ব্যর্থ ও পযুদস্ত হয়ে কাশ্মীর থেকে হাতেগোনা মুষ্টিমেয় সহযোদ্ধাকে নিয়ে পরাজিতের বেশে সুলতানের গযনী ফিরতে হয়েছিল। বিশাল এই ক্ষয়ক্ষতি সামলে উঠার জন্য এবং সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠনের জন্য টানা কয়েকটি বছর প্রয়োজন ছিল সুলতানের। কারণ, কাশ্মীরের লোহাকোট দুর্গের ব্যর্থতা প্রাকৃতিক বৈরীতা এবং চক্রান্তকারী হিন্দু গাইডের চক্রান্তে সুলতান মাহমূদের সামরিক শক্তি একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তখন সাধারণ কোন যুদ্ধের মোকাবেলা করার সামর্থও তার বাহিনীর ছিলো না। রাজধানী গযনীর নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত সৈনিক এবং সীমান্তের অস্থায়ী চৌকিগুলোতে প্রহরারত যোদ্ধারা ছাড়া তার কেন্দ্রীয় কমান্ড প্রায় জনবলশূন্য হয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় বহিরাক্রমণ প্রতিহত করার সামর্থ তার থাকলেও প্রতিআক্রমণ করার মতো জনবল সেনাবাহিনীতে ছিলো না।
হিন্দুদের পক্ষ থেকে আক্রমণের তেমন আশঙ্কা তার ছিলো না। কারণ, তখনো পর্যন্ত হিন্দুদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। কাশ্মীরের লোহাকোট দুর্গে পরাজয় মেনে নিয়ে মুষ্টিমেয় সৈন্য নিয়ে টিলাযুগিয়া ক্যাম্পে কয়েক দিন অবস্থান করলেও রাজা ভীমপাল ও নন্দরায় তার উপর আক্রমণের সাহস পায়নি। অথচ এ সময় বিপুল সংখ্যাধিক্যে প্রবল হিন্দুবাহিনী আক্রমণ করলে হয়তো তাদের হাতে সুলতানকে বন্দিত্ব বরণ, নয়তো শাহাদাঁতের পেয়ালা পান করতে হতো। কিন্তু হিন্দু রাজা-মহারাজারা তাঁকে আহত বাঘের মতোই ভয়ানক ভেবে তাঁর কাছ থেকে নিজেদেরকে নিরাপদ দূরত্বে রেখেছেন।
এমতাবস্থায় চিহ্নিত শত্রু হিন্দুদের পক্ষ থেকে কোন ঝুঁকির আশঙ্কা না থাকলেও স্বগোত্রীয় মুসলিম ক্ষমতালি প্রতিবেশী ক্ষুদ্র শাসকদের পক্ষ থেকে ঝুঁকির আশঙ্কা প্রবল হতে থাকলো। অধিকাংশ প্রতিবেশী মুসলিম শাসক এককভাবে কিংবা যৌথভাবে সুলতানের বিরুদ্ধে লড়াই করে এক বা একাধিকবার পরাজিত হয়েছিল। স্বগোত্রীয় এসব ক্ষমতালিন্দুদের প্রতিবারই সুলতান ক্ষমা করে দিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রত্যাশায় ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু মসনদ ও ক্ষমতার পূজারী, নীতি-আদর্শবিচ্যুত এসব শাসক সুলতানের শক্তিশালী অবস্থানকে সব সময় তাদের বিপদ জ্ঞান করতো। তারা শয়নে-স্বপনে, নিদ্রায়-জাগরণে সব সময়ই সুলতানের ধ্বংস কামনা করতো। সুলতানকে হীনবল ও নিশ্চিহ্ন করার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে পরস্পর চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারে লিপ্ত থাকতো। কুচক্রী প্রতিবেশীদের জন্য সুলতানের এই বিপর্যয় মহাসুয়োগ সৃষ্টি করে দিল। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে উঠে-পড়ে লেগে গেল তারা।
কাশ্মীরের ব্যর্থ অভিযান শেষে সুলতান মাহমূদ যখন গযনীতে ফিরে এলেন, তখন তার অবস্থা অনেকটাই ডোরকাটা ঘুড়ির মতো। বাতাসের দয়ার উপর ভর করে ঘুড়ি যেমন উড়তে থাকে, সে জানে না জমিনে পড়বে না কোন গাছের ডালে পড়ে ফেটে যাবে। সুলতান মাহমূদের সাথে কাশ্মীর অভিযান শেষে যে সামান্যসংখ্যক সৈন্য ছিলো, তারা শোক-মিছিলের আবহে রাজধানীতে ফিরছিলো। গযনীর যেসব লোক সেনাবাহিনীর আগমনবার্তা পেয়ে রাস্তায় তাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য জড়ো হয়েছিলো, সৈন্যদের বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে তাদের মুখে আর কোন শব্দ উচ্চারিত হলো না। বিজয়োল্লাসের তাকবীর ধ্বনি তাদের বুকের পাজরে যেন আটকে গিয়েছিল। যেসব নারী দরজা-জানালায় দাঁড়িয়ে সেনাবাহিনীর প্রত্যাবর্তন দেখছিলো, সৈন্যদের বিপর্যস্ত দৃশ্য দেখে তারা দাঁতে আঙুল কামড়ে ধরলো।
সুলতান মাহমূদ রাজধানীর অধিবাসীদের এমন শোকাবহ নীরবতা দেখে ঘোড়া থামিয়ে তাঁর প্রধান সেনাপতি আলতানতাশকে ডেকে পাঠালেন।
“আলতানতাশ! কী হয়েছে, রাজধানীর উৎসুক সব মানুষ নীরব হয়ে গেলো কেন? সৈন্যদের মৃত্যুতে ওদের স্লোগান হারিয়ে গেলো কেন? তাদের বলল, জাতির প্রয়োজনেই সৈন্য বেঁচে থাকে। এজন্য তোমাদের সবার মরে গেলে চলবে না। তোমাদের স্লোগান বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তোমরা স্লোগান দাও, ইসলাম জিন্দাবাদ”
“সালতানাতে গযনী জিন্দাবাদ”। তোমরা আহত সৈন্যদের উজ্জীবিত করো। তোমাদের উৎসাহ ও প্রাণোচ্ছলতা তাদেরকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। যারা শাহাদাত বরণ করেছে, তারা তাদের জীবন জাতির সেবায় দান করে গেছে। তাদের কুরবানীর মর্যাদা আমাদের রক্ষা করতে হবে।”
সেনাপতি আলতানতাশ উচ্চ আওয়াজে সুলতানের কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করলেন। মাঝে মাঝে গযনীর আকাশ-বাতাস সালতানাতে গযনী জিন্দাবাদ, ইসলাম জিন্দাবাদ, ইসলামের সৈনিকেরা জিন্দাবাদ, মূর্তি ধ্বংসকারী সুলতান জিন্দাবাদ, ইত্যাকার স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠলো।
সুলতান মাহমূদ আবারো সেনাপতির উদ্দেশে বললেন, “মহিলাদের বললো, ইসলাম তোমাদের কাছে তোমাদের ভাই-বেটাদের কুরবানী দাবী করছে। আপনজন হারানোর শোকে মাতম করলে চলবে না। তোমাদেরকে ইসলামের প্রয়োজনে স্বামী-সন্তান, ভাই-পুত্রদেরকেও কুরবানী দিতে হবে।”
সেনাপতি আলতানতাশ সুলতানের একথাগুলোও উচ্চ-আওয়াজে পুনরাবৃত্তি করলেন। একথা শুনে যেসব নারী তাদের সংগৃহীত ফুল লুকিয়ে ফেলেছিলো, আহত সৈনিকদের উপর তা ছিটিয়ে দিতে শুরু করলো। সেই সাথে নারীদের কষ্ঠ থেকে ভেসে এলো, “কোন অসুবিধা নেই, ইসলামের প্রয়োজনে আমাদের ভাই-পুত্র-স্বামীদের তোমরা নিয়ে যাও।”
