সুলতান মাহমূদ রাজধানীবাসীর মনোবল বাড়িয়ে দিয়ে শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন বটে; কিন্তু তাঁর নিজের মনের গভীরে ব্যর্থতা
ও হতাশার যে কাঁটা বিদ্ধ হয়েছিলো তা তিনি কিছুতেই সরাতে পারছিলেন না। কাশ্মীর যুদ্ধের সকল ব্যর্থতা তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি বাহিনীর বেঁচে থাকা সেনাপতি এবং গযনীতে অবস্থানকারী সেনাকমান্ডারদের ডেকে বললেন, “জয়-পরাজয় মূলত আল্লাহর হাতে। কিন্তু লোহাকোট অভিযানের যাবতীয় ব্যর্থতার দায় আমার। আমি এর সকল দায়-দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিচ্ছি। কারণ, আমি সেখানকার মৌসুমী প্রভাবকে মোটেও বিবেচনায় নিইনি। স্থানীয় সংবাদ প্রেরকদের কাছ থেকে ওখানকার অবস্থা যাচাই করিনি। সর্বোপরি হিন্দু প্রতারকদের ধোঁকায় আমি প্রতারিত হয়েছি। জাতির এই কলঙ্ক, এই ক্ষয়ক্ষতিকে বিজয়ে রূপান্তরিত করে দেখানোর দায়-দায়িত্ব এখন আমি কাঁধে তুলে নিচ্ছি।
রাজা হিসেবে রাজ্য শাসন করা আমার কাজ নয়। আমার কাজ ইসলামের বাণী বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়া। তোমরা আমার একটি কথা খুব মনে রেখো। তা হচ্ছে, এখন যদি কেউ তোমাদেরকে পরাজয়ের জন্য তিরস্কার করে, তবে সেই তিরস্কারকে হাসিমুখে বরণ করে নিয়ে তাকে আশ্বস্ত করো, তোমাদের সমর্থন-সহযোগিতা থাকলে গযনী বাহিনী অচিরেই পরাজয়ের গ্লানি মুছে দেবে।
ব্যর্থতার পুরো দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেয়ার পরও স্বস্তি পাচ্ছিলেন না সুলতান মাহমূদ। ক্রমেই তার মন অত্যন্ত অস্থিরতায় পেরেশান হয়ে উঠছিলো। মনের অস্বস্তি অস্থিরতা ও পেরেশানী থেকে মুক্তি পেতে অবশেষে তিনি তার শায়খ আবুল হাসান খারকানীর সাক্ষাতে রওনা হলেন।
গযনী থেকে একদিন ও অর্ধেক রাতের দূরত্বে অবস্থান করতেন খারকানী। অল্প কজন নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে অস্বাভাবিক দ্রুতবেগে স্বীয় মুর্শিদের কাছে পৌঁছলেন সুলতান মাহমূদ।
বিমর্ষ, ভগ্নহৃদয় ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সুলতানকে দেখে খারকানী বললেন, “অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সুলতান পরাজিত হয়ে এসেছেন। কিন্তু তাই বলে তার চোখে পানি কেন?”
“অপমান আর ব্যর্থতার গ্লানি মুর্শিদ” বললেন সুলতান। আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আমি হাজার হাজার সহযোদ্ধাকে কাশ্মীরের বরফের নিচে রেখে এসেছি, এদের রূহ আমাকে রাতে ঘুমোতে দেয় না। ওরা যেন আমাকে কানে কানে বলে যায়, “একি করলেন সুলতান কোন অপরাধে আমাদের কাশ্মীরে এনে বরফ চাপা দিলেন? আমরা তো মর্দে-ময়দান ছিলাম, আমরা তো আপনার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বেঈমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতাম।”
“বিভ্রান্তি। মানসিক অপরাধবোধ থেকে এই বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন আপনি। যে যোদ্ধারা সহযোদ্ধাদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ শাহাদত বরণকারীদের আত্মা তাদেরকে বিভ্রান্ত করে না, কোন ধরনের পেরেশানী সৃষ্টি করে না। দেখবেন, এই শহীদদের আত্মা জীবন্ত সৈনিকে রূপান্তরিত হবে। আল্লাহর নামে এখন থেকে আপনারা যেখানেই লড়াই করবেন, এসব রূহ আপনাদের শক্তি জোগাবে। আপনার মতো একজন দৃঢ়চেতা লড়াকু রণনায়কের পথে এ ধরনের বিভ্রান্তি প্রতিবন্ধক হতে পারে না। এসব নিতান্তই আবেগাশ্রয়ী বিষয় সুলতান। হতোদ্যম হবেন না। হিন্দুস্তানের অসংখ্য মজলুম আপনার পথ চেয়ে আছে, শত শত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া মসজিদ আপনার আগমন অপেক্ষায় প্রহর গুণছে।”
“আমি মারাত্মক ধোঁকায় পড়ে গিয়েছিলাম। প্রথমত মৌসুম আমাকে ধোঁকা দেয়, দ্বিতীয়ত প্রশিক্ষিত কুচক্রী হিন্দুরা মুসলমান সেজে আমাকে গাইড হিসিবে ধোকায় ফেলে।”
“হিন্দুদের এসব ধোকাবাজী কোন নতুন বিষয় নয় সুলতান!” বললেন খারকানী। ইসলামের গোড়া থেকেই কুফরীশক্তি মুসলমানদের ধোকা দিচ্ছে। ভবিষ্যতেও এই ধোকাবাজী অব্যাহত থাকবে। আপনার কাজ হলো ভবিষ্যতে যাতে এমন ধোকার শিকার হতে না হয়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা। ভারতের আগেই হয়তো আপনাকে নিজ ভূমিতে স্বগোত্রীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে।
ইহুদী ও খৃস্টশক্তি সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের মৈত্রী ও ঐক্যের শিকড় কেটে দিচ্ছে। যে খলীফা ছিলেন মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক, সেই খলীফাই এখন ক্ষমতা ও মসনদের লিলায় অন্ধ। মুসলিম উম্মাহর কেন্দ্রীয় শক্তি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। আপনি যদি ইসলামের স্বার্থে যুদ্ধ-জিহাদে আগ্রহী হয়ে থাকেন। তাহলে সুলতানীর উষ্ণতা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন। চেনা-অচেনা শত্রুদের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখুন। স্বজাতি ও স্বদেশের জনগোষ্ঠীকে ভীতসন্ত্রস্ত না করে সামরিক শক্তি দিয়ে শত্রুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিন। তাজ ও তরবারী সহাবস্থান করতে পারে না। ভালোবাসা হয় তরবারীর সাথে থাকবে, নয়তো তখতের সাথে। যে তরবারী তাজ ও তক্তের হেফাযতের জন্য ব্যবহৃত হয়, সেই তরবারী ঘৃণ্য। মাত্র একটি পরাজয়ে হতোদ্যম হয়ে যাবেন না সুলতান! উঠে সে-ই, যে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। এই হোঁচট খাওয়ার পর পুনরায় গা ঝাড়া দিয়ে আবার সেই শক্তি নিয়ে দাঁড়ান, যে। অবস্থায় আপনি পড়ে গিয়েছিলেন। নিজের ভুলত্রুটি নিজের কাঁধে নিন, এ ব্যাপারে জাতিকে ভুল তথ্য পরিবেশ করবেন না।”
“আপনি বলেছেন, ইহুদী ও খৃস্টানরা আমাদের শিকড় কাটছে? এটা বলে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন?” খারকানীর দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন সুলতান।
