পরদিন সন্ধ্যার আগেই চতুর্দিকে প্রচন্ড অন্ধকার নেমে এলো। হিমশীতল রাতের অন্ধকারে শুরু হলো প্রবল তুষারপাত আর সেই সাথে ঝড়ো হাওয়া। তীব্র ঝড়ো হাওয়া আর প্রচণ্ড তুষারপাতে মানুষ তো দূরে থাক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গি ঘোড়াগুলোও টিকতে পারছিলো না। জীবন বাঁচানোর জন্য জঙ্গি ঘোড়াগুলো এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে শুরু করলো; কিন্তু আশ্রয় নেয়ার মতো কোথাও কোন আড়াল ছিলো না।
সমতল-অসমতল সব জায়গা বরফে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল। কোনটা খাদ কোনটা টিলা বোঝা যাচ্ছিল না। তুষারপাত ও ঝড়ের গতি যেদিকে ছিল, সেদিকে ছিল কাশ্মীরের বিখ্যাত ঝিলম নদী। প্রবল বাতাসের ধাক্কা অশ্বারোহী ও ভারবাহী সব জন্তু ওদিকেই হটতে বাধ্য হচ্ছিল। ঝিলম নদীর তীর ছিল সরু; কিন্তু উঁচু ও খাড়া। নদী ছিল অপ্রশস্ত, গভীর ও তীব্র স্রোতস্বিনী। নদী তীরের সবকিছু বরফে ঢাকা পড়ে গেল। বাতাসের ধাক্কায় অশ্বারোহী, আরোহীহীন জন্তু সবই নদী গর্ভে গড়িয়ে পড়ছিল। তীব্র স্রোত আর বরফঢাকা খাড়া তীর বেয়ে কারো পক্ষে উপরে উঠে আসার উপায় ছিল না। সেই রাতের অন্ধকারে কতো সিপাহী আর কতত ভারবাহী জন্তু ঝিলম নদীর স্রোতে ভেসে গিয়েছিল, তার প্রকৃত হিসেব রাখা সম্ভব ছিল না।
রাত শেষে যখন ভোরের সূর্য উচিত হল, তখন কারো পক্ষে বলার উপায় ছিলো না, এটিই গতকালের ঝিলম তীর আর লোহাকোট দুর্গের চারপাশ। হাজার হাজার মুসলিম যোদ্ধা বরফের নিচে তলিয়ে গেল। উঁচু বরফের আস্তরণ পড়ে গেল সবখানে। সুলতানকে বেঁচে থাকা কমান্ডারগণ বিনয়ের সাথে বললেন-টানা বিজয়ের নেশায় আমরা এই অভিযানকে সেইভাবে বিবেচনা করিনি। এটাই হয়তো আল্লাহর ইচ্ছা ছিলো। এবার ক্ষান্ত হওয়া যাক। আল্লাহ চাহে তো আমরা আবার আসবো। যারা এখনও বেঁচে আছে, তাদের জীবন রক্ষার দিকটিই প্রাধান্য দেয়া হোক।
সুলতান মাহমূদ কমান্ডারদের পরামর্শ মেনে নিয়ে সৈন্যদের ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। ব্যর্থতার দায়ও নিজের কাঁধেই তুলে নিলেন তিনি। কিন্তু ফিরে যাওয়ারও পথ ছিলো না। সবকিছু বরফে তলিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এমন বেগতিক অবস্থায় পথিমধ্যে যোগ দেয়া গাইডেরা এগিয়ে এলো। তারা এই দুঃসময়ে সুলতানকে আশ্বাস দিলো, মাননীয় সুলতান! দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই, এখনো ফেরার একটি পথ পরিষ্কার আছে।
সেনাবাহিনী তখন বিক্ষিপ্ত। তারা প্রধান তিনটি অংশে বিভক্ত। পরিচয়, গোপনকারী হিন্দু গাইডেরা তিনভাগে বিভক্ত হয়ে গাইডের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো।
তীব্র তুষারপাত রাতের বরফে তুফান আর সুড়ং খননের ব্যর্থ অভিযানে অর্ধেকের চেয়ে বেশী সৈন্য আগেই নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। বাকী অর্ধেকের কম সৈন্য তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পরিচয় গোপনকারী শত্রু গাইডের দেখানো পথে যখন গযনী ফিরতে রওনা হলো, এর পরিণতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক কারিশমা লিখেছেন–
“তীব্র তুষারপাত ও তুষার ঝড়ের পরদিন সুলতান মাহমূদ অবরোধ প্রত্যাহার করে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন। কিন্তু ফেরার পথে হিন্দু পথপ্রদর্শকরা তাদেরকে ভুল পথে নিয়ে এতোটাই বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয় যে, টানা এক সপ্তাহ গোটা বাহিনীকে তারা অচেনা-অজানা তুষার পথে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হত্যা করে। তীব্র ঠাণ্ডা, অপর্যাপ্ত পানাহার, ব্যর্থতার গ্লানি আর সহযোদ্ধা হারানোর শোকে এমনিতেই মুসলিম যোদ্ধারা ছিলো ক্লান্ত, হতোদ্যম ও মনোবলহারা। এমতাবস্থায় বরফে ঢাকা পিচ্ছিল পথে বেশিরভাগ সৈন্যকে পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হচ্ছিল। যুদ্ধাস্ত্র ও জরুরী সামানপত্র কাঁধে করে বহন করতে হচ্ছিল তাদের। শত্রু পক্ষের গুপ্ত গাইড ঝিলম নদীর সংকীর্ণ তীর ধরে তাদের নিয়ে যাচ্ছিল। অগ্রসর হতে গিয়ে বারংবার পা পিছলে গভীর নদীর অতলে গড়িয়ে পড়ছিল মুসলিম যোদ্ধারা। তাছাড়া জায়গা জায়গায় ছিল বরফের ফাঁদ। দৃশ্যত সমতল দেখা গেলেও হালকা বরফের নিচে লুকিয়ে ছিল গভীর গর্ত। এসব ফাঁদে পা দিয়ে বহু যোদ্ধা বরফের চোরাবালিতে তলিয়ে যেতে থাকে। বহু ঘোড়া ও ভারবাহী জন্তুও বরফের চোরাবালিতে পড়ে জীবন ত্যাগ করতে থাকে। তীব্র ঠাণ্ডায় যেসব যোদ্ধা চলার শক্তি হারিয়ে বসে পড়তো, তার পক্ষে আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হতো না। এভাবে সুলতানের অসংখ্য যোদ্ধাকে জীবন দিতে হলো। অথচ এরা প্রত্যেকেই ছিল সুলতান মাহমুদের বাহিনীর চৌকস যোদ্ধা।
দুর্গজয় তো সম্ভব হলোই না, তদুপরি ব্যর্থতা মেনে নিয়ে ফিরতে গিয়ে শক্র গাইডের পাল্লায় পড়ে শত শত যোদ্ধাকে কুরবানী দিতে হলো। বন্ধুবেশী শত্রু গাইডেরা এক দিন গোটা বাহিনীকে ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। বরফঢাকা পাহাড়ী পথে চক্কর খেয়ে সিংহভাগ সহযোদ্ধাকে হারিয়ে সুলতান মাহমূদ যখন টিলাযুগিয়ায় অবস্থিত সেনাপতি সারওয়াগের সেনাক্যাম্পে পৌঁছলেন, তখন তার সাথে মাত্র হাতে গোনা কয়েকশত যোদ্ধা। ব্যর্থ, ক্লান্ত, শোকাহত সুলতান কয়েকদিন সারওয়াগের ক্যাম্পে অবস্থান করে গযনী ফিরে এলেন।
৩.৩ লক্ষ্য যখন ক্ষমতা ও সিংহাসন
লক্ষ্য যখন ক্ষমতা ও সিংহাসন
১০১৭ খৃস্টাব্দের ৩রা জুলাই মোতাবেক ৪০৮ হিজরী সনের ৫ সফর। স্বগোত্রীয় ঈমান বিক্রেতাদের সম্মিলিত চক্রান্তের বিরুদ্ধে সুলতান মাহমূদকে এক ভয়ানক রক্ষক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত হতে হলো। এই সংঘাত ছিল সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টিকারী। যে সংঘাতের নেপথ্যে ছিল ইহুদী, খৃষ্টান ও মুসলিম কুচক্রীদের জোটবদ্ধ ষড়যন্ত্র।
