“ওই যে দুর্গ তোমরা দেখছো, এই দুর্গ তোমাদের দেখে উপহাস করছে। এখানকার মৌসুমও তোমাদের কুটি করছে। তোমরা মরুময় পাথুরে ময়দানে লড়াই করে অভ্যস্ত। আজ এখানে প্রমাণ করে দাও, শীত ও বরফে যদি আসমান-জমিন সব কিছুও জমাট বেধে যায়, তারপরও মুসলমানের রক্ত জমে না। ঈমানের উষ্ণতা বরফের পাহাড়কেও গলিয়ে পানি করে দিতে পারে।
দেখো, আমরা বহুদূর থেকে এসেছি। আমরা এখানে এসেছি আল্লাহর পয়গাম তার বান্দাদের কাছে পৌঁছে দিতে। আল্লাহকে সাক্ষী রেখে শপথ নাও, কঠিন দুর্ভেদ্য এ দুর্গে ইসলামের পতাকা না উড়িয়ে আমরা ফিরে যাবো না।”
সরাসরি সৈন্যদের সামনে এমন আবেগী ভাষণ সুলতান তেমন দিতেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি কমান্ডারদের মাধ্যমে সৈনিকদের উজ্জীবিত করার পয়গাম দিতেন। কঠিন ও কঠোর ট্রেনিং দিয়ে সুলতান মাহমূদ তার প্রতিজন সৈন্যকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ত্যাগী, কষ্ট সহিষ্ণু ও সাহসী করে গড়ে তুলতেন। তাদেরকে আবেগী বক্তৃতা দিয়ে উজ্জীবিত করার তেমন কোন প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু লোহাকোট দুর্গের অবস্থা ও তুষারপাতের বিরূপ পরিস্থিতি সুলতানের মনে যুদ্ধজয়ের সম্ভাবনাকে এতোটাই দুঃসাধ্য করে তুলেছিল যে, কঠিন থেকে কঠিনতর বিপদেও যার মধ্যে কখনো কোন ভাবান্তর দেখা যায়নি, রণাঙ্গনের কঠিন পরিস্থিতিও যাকে পেরেশান, উদ্বিগ্ন ও আশাহত করতে পারেনি, সেই পাহাড়সম সাহসিকতার অধিকারী সুলতানের হৃদয়ে লোহাকোট দুর্গ জয় এতোটাই দুঃসাধ্য মনে হচ্ছিল যে, তার কণ্ঠের আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। ভাষণ দিতে গিয়ে তাঁকে বারবার থামতে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, তিনি যথার্থ শব্দটি বলার জন্য স্মৃতিপট হাতড়ে বেড়াচ্ছেন।
যে কোন রণক্ষেত্রে যুদ্ধ শুরুর আগে সুলতান দু’রাকাত নফল নামায পড়তেন। কিন্তু এদিন ঘোড়া থেকে নেমে তিনি তা করেননি। এমন কিছুও বলেননি যে, আমি জয়ের ইঙ্গিত পেয়েছি, বিজয় আমাদেরই হবে। অনেক রণাঙ্গনে তিনি এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। ভাষণ শেষে তিনি তার ঘোড়াকে টিলার উপর থেকে নিচে নামিয়ে আনলেন।
লোহাকোট দুর্গের চারপাশে আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চকিত হতে লাগলো। যে পাহাড়ের উপর দুর্গ অবস্থিত এর বাইরে উঁচু নীচু অসংখ্য টিলা। এসব টিলা ও সমতল সব জায়গাতেই প্রচুর গাছগাছালী। দুর্গের বাইরের ঢালুতেও প্রচুর বৃক্ষাদি ছিল। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে দুর্গের ঢালের বৃক্ষাদি কেটে সাফ করা হয়েছে।
সুলতান মাহমূদ দুর্গের চতুর্দিক ঘুরে পর্যবেক্ষণ করলেন। দুর্গ প্রাচীর ও বুরুজের উপর থেকে হিন্দু সৈন্যরা তাকে হুমকি দিচ্ছিলো এবং নানা তিরস্কারসূচক বাক্য ছুঁড়ে দিচ্ছিলো। হিন্দু সৈন্যরা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলছিল, “মাহমূদ! তোমার খোদা তোমার ভাগ্যে বরফের কবর লিখে রেখেছে।”
চতুর্দিকের টিলা ও পাহাড়ের উপর তীরন্দাজ নিযুক্ত করে সুলতান দুর্গপ্রাচীরে অবস্থানকারী সৈন্যদের উপর তীর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন। তীরন্দাজদের তীরের সহায়তা নিয়ে প্রাচীর ভাঙায় পারদর্শী সৈন্যদেরকে তিনি দুর্গ প্রাচীরের নিচে সুড়ং খননের জন্য নির্দেশ দিলেন। তিনি জানতেন, কাশ্মীরের পাহাড়গুলো নিরেট পাথরের নয়, পাথুরে মাটির হয়ে থাকে। কাজেই এতে খননকাজ তেমন কঠিন হবে না। সুলতান মাহমূদ ভেবেছিলেন, কয়েক গজ সুড়ং খনন করতে পারলেই খননকারীরা দুর্গ প্রাচীরের উপরের তীর থেকে নিজেদের হেফাজত করতে পারবে এবং নির্বিঘ্নে খননকাজ চালাতে পারবে।
প্রাচীর ভাঙা ও সুড়ং খননকারী দল নির্দেশ পেয়েই খননকাজে এগিয়ে গেল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের তৎপরতা থেমে গেল। একজনের পক্ষেও জীবন নিয়ে ফিরে আসা সম্ভব হলো না। দুর্গ প্রাচীর থেকে বৃষ্টির মতো তীর এসে তাদের সবাইকে বিদ্ধ করলো । সুলতানের তীরন্দাজরা আশপাশের পাহাড় ও টিলার উপর থেকে যেসব তীর নিক্ষেপ করছিলো, বেশী দূরত্বের কারণে তা দিয়ে দুর্গ প্রাচীরের শত্রু তীরন্দাজদের দমানো সম্ভব হলো না।
কয়েক সৈনিক জীবনবাজী রেখে প্রধান ফটকে অগ্নিসংযোগ করার জন্য দাহ্য পদার্থ এবং ফটক ভাঙার জন্যে হাতুড়ী-শাবল নিয়ে ফটকের দিকে অগ্রসর হলো। কিন্তু ফটকের সামনের চত্বর ছিলো ঢালু এবং বরফে ঢাকা। মুসলিম সৈন্যরা ঢালু বেয়ে উপরে উঠতে গিয়ে পা পিছলে বরফের মধ্যে পড়তে লাগল আর উপর থেকে শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তীরবিদ্ধ হয়ে গড়িয়ে নিচে পড়তে লাগল। তাদের মধ্যেও দু-চারজন ছাড়া কারো পক্ষে ফিরে আসা সম্ভব হলো না।
অন্যান্য ফটকেও অনুরূপ হামলা করার চেষ্টা হলো। একটি ফটকে কিছু জানবাজ আঘাত করতে শুরু করেছিল। কিন্তু দুর্গপ্রাচীরের উপর থেকে ফটক ভাঙচুরকারীদের উপর জ্বলন্ত কাঠ এবং আগুনের সলিতা নিক্ষেপ করলো শত্রুবাহিনী। তাদের সবার শরীরই ঝলসে গেলো।
ঐতিহাসিক উবী, গারদিজী, ইবনুল আছীর এবং দুজন ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ লিখেছেন, রাতের বেলায়ও সুলতানের সৈন্যরা দুর্গ প্রাচীরের নিচে সুড়ং খননের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল। কিন্তু দিনের বেলায় সুলতান দেখতে পেলেন, দুর্গ প্রাচীরের নিচের খাড়িতে মুসলিম সৈন্যদের লাশের স্তূপ জমে গেছে। অবস্থা দেখে সুলতানের চেহারা রাগে-ক্ষোভে কালো হয়ে গেলো। তিনি পাগলের মতো দুর্গের চতুর্দিকে দৌড়াচ্ছিলেন আর সুড়ং খননের জন্য নির্দেশ দিচ্ছিলেন। সুলতানের নির্দেশে মুসলিম কমান্ডার ও সৈন্যরা অকাতরে তাদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছিল।
