ঐতিহাসিক হায়দার কিরগানী ‘তারিখে রাশেদী’ গ্রন্থে লিখেছেন, “হতে পারে অতীতের অব্যাহত বিজয়ের মনোবল ও শত্রুদের চক্রান্তের ক্ষুব্ধতায় সুলতান অভিযানের সময়, ক্ষেত্র, অবস্থা ও প্রতিবন্ধকতার কথা বিবেচনা না করেই সৈন্যদের রওনা হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিংবা কাশ্মীরের প্রাকৃতিক অবস্থা, শীতকালে সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ-পরিস্থিতির ব্যাপারে তাঁর বাস্তব কোন ধারণা ছিল না। কাশ্মীরের পথঘাট সম্পর্কেও তার ধারণা ছিল অস্বচ্ছ।
বস্তুত পেশোয়ার থেকে আরো কিছু সৈন্য সাথে নিয়ে স্বভাবজাত দ্রুততার চেয়ে আরো বেশী ক্ষিপ্রতায় তিনি কাশ্মীরের সীমানায় পৌঁছেন। ১০১৫ সালের জানুয়ারী মাসের প্রথম দশকে সুলতান তার সৈন্যদল নিয়ে কাশ্মীর পৌঁছেন। তখন পাহাড় ও সমতল সবজায়গা তুষারপাতের কারণে বরফে ঢাকা পড়ে গেল। সুলতানকে তাঁর গোয়েন্দা সূত্র খবর দিল, রাজা ভীমপাল ও নন্দরায় এখন কালার দুর্গে নয়, লোহাকোট দুর্গে অবস্থান করছে। কালার দুর্গ অবরোধ করে কালক্ষেপণ না করে লোহাকোট দুর্গ অবরোধের পরামর্শ দেয়া হলো। কারণ, লোহাকোট দুর্গ দখলে এসে গেলে কালাঞ্জর অবরোধ ছাড়াই দখলে এসে যাবে।
এদিকে লোহাকোট দুর্গে অবস্থানকারী মহারাজাদের কাছে খবর এলো, সুলতান মাহমূদ এসে গেছে। মহারাজা নন্দরায় চক্রান্ত ও দুষ্কৃতিকারী দলের প্রধানকে ডেকে বললেন, “তোমার সেই লোকদের নিয়ে এসো।” কিছুক্ষণের মধ্যে রাজা নন্দরায়ের সামনে দশ-বারোজন লোকের একটি দলকে এনে দাঁড় করানো হলো।
“তোমাদের কী করতে হবে তা কি তোমাদের জানা আছে?” সামনে দণ্ডায়মান লোকদের জিজ্ঞেস করলেন রাজা নন্দরায়।
“জি মহারাজ! আমরা আমাদের কর্তব্য সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত। আমরা সুলতানের কাছে গিয়ে বলবো, আমরা এই এলাকার মুসলমান। এই অঞ্চলের পোশাক পরেই আমরা তার সামনে যাবো। আমরা তার কাছে আবেদন করবো, আমরা আপনার অভিযানে শরীক হতে চাই এবং আপনার সেনাদের গাইড দেয়ার প্রয়োজনেই আমরা এসেছি। কারণ, মৌসুমী তুষারপাত পথঘাট সবই তলিয়ে দিয়েছে। বহুল ব্যবহৃত পথের কোনই চিহ্ন নেই। এমন অবস্থায় লোহাকোট কোন পথে যাওয়া যাবে আমরা সেই পথ জানি। আমরা নিষ্ঠাবান মুসলমানের মতোই কথাবার্তা বলবো। তাদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য আমরা শুদ্ধ উচ্চারণে কলেমা ও নামায শিখে নিয়েছি।”
“সাবাস! যেভাবেই হোক তোমরা ওকে লোহাকোট নিয়ে আসবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, লোহাকোট থেকে তাকে ব্যর্থ হয়েই ফিরতে হবে। ফিরে যাওয়ার পথে তোমরাই হবে তাদের পথপ্রদর্শক। তখন তোমরা তোমাদের আসল উস্তাদী দেখাবে।”
এই দশ-বারোজন লোক ছিল কট্টর হিন্দু। এরা ছিল প্রশিক্ষিত দুষ্কৃতিকারী। এরা সুলতান মাহমূদকে বিভ্রান্ত করার জন্য দাড়ি রেখেছিল। চালচলন, কথাবার্তা, পোশাক-পরিচ্ছদে তারা প্রত্যেকেই সাচ্চা মুসলমানরূপে নিজেদের উপস্থাপন করার সব কৌশল রপ্ত করেছিল।
লোহাকোট দুর্গের দিকে অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন সুলতান। পথের দুর্গমতা, অত্যধিক ঠাণ্ডা এবং তুষারপাতকে উপেক্ষা করলেন তিনি। কাশ্মীরে তার যেসব সেনাচৌকি ছিল, তারা লোহাকোটে পৌঁছানোর জন্য অভিজ্ঞ গাইড বাছাই করে রেখেছিল। কারণ, সেই যুগের রীতি ছিল কোন সেনাবাহিনী যদি কোন অচেনা জায়গায় আক্রমণ চালাতো, তখন স্থানীয় লোকদের থেকে গাইড সগ্রহ করতো।
লোহাকোটের দিকে অগ্রসর হলে পথিমধ্যে দশ-বারোজনের একটি কাফেলা এসে সুলতানের বাহিনীতে যোগ দিল। এই দলের লোকেরা সুলতানের সহযোগিতার ব্যাপারে খুবই উচ্ছ্বাস দেখাচ্ছিল। তারা নিজেদেরকে নিষ্ঠাবান মুসলমান হিসেবে সুলতানের সামনে নিখুঁতভাবে পেশ করে। তারা এও বলে, আমরা দীর্ঘদিন এসব হিন্দুরাজাদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছি। আজ আমরা ওদের জুলুমের প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর। তাদের আবেগময় আবেদন আর মুসলমান হিসেবে নিখুঁত ভাবভঙ্গিমায় আশ্বস্ত হয়ে তাদের একেকজনকে গাইড হিসেবে প্রত্যেকটি সেনা ইউনিটে ভাগ করে দিলেন সুলতান। সেনাপতিদের বললেন, তাদের কথামতো অগ্রসর হতে।
লোহাকোট দুর্গ সম্পর্কে অনেক কাহিনীই শুনেছিলেন সুলতান। কিন্তু যখন লোহাকোর্ট দুর্গকে প্রত্যক্ষ করলেন, তখন তার মনে হলো, তাকে লোহাকোট দুর্গ সম্পর্কে খুব কমই বলা হয়েছে।
সুলতান মাহমূদ ছিলেন দুর্গজয়ের উস্তাদ। কিন্তু লোহাকোট দুর্গ দেখে তিনি বিরাট এক ধাক্কা খেলেন। দেখেই তিনি বুঝতে পারলেন কেন লোহাকোট দুর্গ অজেয় দুর্গ হিসেবে খ্যাত। দুর্গটি ছিল বিশাল এক পাহাড়ের উপর অবস্থিত। এটি যেমন ছিল দুর্ভেদ্য, দ্রুপ এর গঠনও ছিল মজবুত। সম্পূর্ণ পাথর ও মাটির মিশ্রণে বিশাল পুরুত্বে তৈরি ছিল দুর্গের প্রাচীর। তাছাড়া দুর্গের চারকোণে ছিল চারটি সুউচ্চ বুরুজ। এই বুরুজ থেকে যে কোন আক্রমণকারী দলকে সহজেই তীরের আঘাতে ঘায়েল করা সহজ ছিল। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল, প্রাকৃতিকভাবেই দুর্গের চতুর্দিকে ছিল গভীর খাদ। প্রতিটি ফটকের সামনের ত্বর ছিল অনেক ঢালু। ফটকগুলো বিশালকায় লোহার ডাণ্ডা দিয়ে তৈরি। হাতির কাঁধে শক্ত গাছের কাণ্ড রেখে এগুলোকে আঘাত করলেও ভাঙ্গা সম্ভব ছিল না।
সুলতান মাহমূদ দুর্গকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সকল সৈন্যকে এক জায়গায় একত্রিত করলেন। একটি অশ্বপৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে কাছের একটি টিলার উপরে দাঁড়িয়ে তিনি তার সৈন্যদের সাহস জোগানো এবং হিম্মত বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বললেন, হে আল্লাহর সৈনিকেরা! তোমরা গযনী সালাতানের জন্য নয়, আল্লাহ ও রাসূল সা. এর উদ্দেশ্যে যুদ্ধে এসেছে। আমরা এই এলাকার লোকজনকে ইসলামের দীক্ষা দিয়ে আল্লাহর নাফরমানী থেকে ফিরিয়ে এনেছিলাম। কিন্তু শুধু মুসলমান হওয়ার অপরাধে এখানকার বেঈমান রাজা-মহারাজারা এদের উপর নির্যাতনের তুফান চালাচ্ছে। আজকে তোমাদেরকে এই বেঈমানদের রক্তে ইসলামের প্রদীপ জ্বালাতে হবে।
