একটানা ঘোড়া হাঁকিয়ে পরদিন অপরাহ্নে নিজের চৌকিতে পৌঁছল আজমীর। সেনাপতি সারওয়াগ ও তার যেসব সঙ্গী হিন্দুদের হাতে বন্দী হয়েছিল, তারা মুক্ত হয়ে আজমীরের সেনাচৌকিতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। কারণ, সব কাছের চৌকির মধ্যে আজমীরের চৌকিই ছিল সবচেয়ে মজবুত ও নিরাপদ।
“আরে আজমীর যে! এ দুদিন তুমি কোথায় ছিলে? এখন কোত্থেকে এলে? দুদিন পর আজমীরকে চৌকিতে ফিরতে দেখে জানতে চাইলেন সেনাপতি সারওয়াগ।
“আগে জরুরী কথা শুনুন।” বললো কমান্ডার আজমীর। আমার ঘোড়া অচল হয়ে গিয়ে আপনাদের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম। আমার একাকীত্ব ও ঘোড়র অচলাবস্থা আমাকে বন্দিত্ব বরণ করতে বাধ্য করে। একজনের সহায়তায় আমি কালাঞ্জর দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসেছি। এখানকার অবস্থা খুবই খারাপ। কালাঞ্জরের রাজা এখানকার মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে রেখেছিল, আপনি তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। আল্লাহর মেহেরবানী যে, তাদের এ চক্রান্ত ভণ্ডুল হয়ে গেছে। আপনাকে গ্রেফতার করে কালাঞ্জর নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাই প্রমাণ করে, এখানকার ছোট ছোট সব হিন্দু রাজারা আর আমাদের করদরাজা হিসেবে থাকতে রাজি নয়। এরা গোপনে সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। কালার দুর্গ থেকে আমি জানতে পেরেছি, কালার দুর্গে দু-তিনজন রাজার সকল সৈন্য একত্রিত হচ্ছে। লাহোরের মহারাজা ভীমপাল নিজে বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে কালার দুর্গে আসছেন। সম্ভবত সম্মিলিত বাহিনীর কমান্ড ভীমপালের হাতে থাকবে। মহারাজারা কালার দুর্গে একত্রিত হয়েই সুলতানকে কর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে পয়গাম পাঠাবে। এরপর আমাদের ছোট ছোট চৌকিগুলো ধ্বংসের কাজ শুরু হবে।”
“এমনটা হওয়াই তো স্বাভাবিক।” বললেন সেনাপতি সারওয়াগ। যে কোন পরাজিত শক্তি প্রতিশোধ নিতে চেষ্টা করতেই পারে। হিন্দু এমন এক দ্বিমুখী জাতি যে, এরা পরাজয় অবশ্যম্ভাবী মনে হলে তোমার সামনে তরবারী ফেলে দিয়ে পায়ে পড়ে, ভিক্ষুকের মতো প্রাণভিক্ষা চাইবে। তখন যদি ওদের মুক্তির বিনিময়ে বলো তোমাদের সকল কন্যা, জায়া, ভগ্নিকে আমাদের হাতে তুলে দিতে হবে, তাতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না। কিন্তু কোনমতে তোমার তরবারীর কামুক্ত হতে পারলেই বিষাক্ত সাপের মতো ছোবল মারবে। হিন্দুদের সাথে আমাদের যুদ্ধ রাজত্বের সীমা কিংবা ধন-সম্পদ নিয়ে নয়, আমাদের সাথে হিন্দুদের সংঘাতের একমাত্র কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস। এ যুদ্ধ যতদিন পর্যন্ত হিন্দুস্তানে একজন হিন্দু কিংবা মুসলমান থাকবে, ততোদিন পর্যন্তই অব্যাহত থাকবে। কিন্তু এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, হিন্দুরা কখন আমাদের আক্রমণ করে।”
“আমি আপনাকে অনুরোধ করবো, হিন্দুদের আক্রমণ দেখার জন্য আমাদের নিষ্ক্রীয় বসে থাকা ঠিক হরে না। আজই একজন দূত গযনী সুলতানের কাছে এই আশঙ্কার সংবাদ দিয়ে পাঠানো দরকার। আমাদের উচিত হবে শত্রুদের শক্তি ও সামর্থের ব্যাপারে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর না ভোলা। কারণ, যখন ওদের আক্রমণ শুরু হয়ে যাবে, তখন অল্প কজন লোক দিয়ে আপনি ওদের বিশাল বাহিনীর মোকাবেলা কিভাবে করবেন? বললো কমান্ডার আজমীর।
আজমীরের প্রস্তাব খুবই যৌক্তিক মনে হলো সেনাপতি সারওয়াগের। তিনি তখনই মৌখিক পয়গাম দিয়ে গযনীর উদ্দেশ্যে দু’জন সৈনিক পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। তাদেরকে বলা হলো, পথিমধ্যে যথাসম্ভব কম বিশ্রাম নেবে এবং প্রয়োজন হলে প্রত্যেক চৌকি থেকে ঘোড়া বদল করে নেবে।
প্রত্যাশার চেয়েও কম সময়ে দূত গযনী পৌঁছে গেল। সুলতান মাহমুদ তাঁর সেনাবাহিনীর সকল সৈনিকের মধ্যেই এ বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে পেরেছিলেন যে, কয়েক মিনিটের বিলম্ব অনেক ক্ষেত্রে গোটা বাহিনীর পরাজয়ের কারণ হতে পারে। সুলতানের এই শিক্ষার কারণে সংবাদবাহক প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত গযনী পৌঁছে গেল। সংবাদবাহক যখন সুলতানকে কাশ্মীরের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করছিল, তখন তার যবান চললেও মাথা দোল খাচ্ছিল আর যন্ত্রণায় তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। ক্ষুধা-পিপাসা এবং বিরতিহীন ক্লান্তিতে তার দেহ অবসন্ন হয়ে পড়েছিল।
এ প্রসঙ্গে ইংরেজ ইতিহাস গবেষক স্যার হেনরী হোয়াৰ্থ ১৮৯৮ সালে ও লেখা এক নিবন্ধে ঐতিহাসিক ইবনে ইসপান্দেয়ার-এর সূত্রে লেখেন, “কাশ্মীরের গোলযোগ ও সেনাপতি সারওয়াগের গ্রেফতারী এবং রাজা নন্দরায় ও ভীমপালের চক্রান্তের খবর শুনে সাথে সাথেই সুলতান সেনাবাহিনীকে অভিযানে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন। এর আগে কখনো অভিযানের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কৌশল সম্পর্কে সৈন্যদের অবহিত করা ছাড়া তাকে অভিযানের নির্দেশ দিতে দেখা যায়নি। এর কারণ সম্পর্কে বিশ্লেষকগণ বলেছেন, ইসলামের নীতি-আদর্শের প্রশ্নে সুলতান ছিলেন খুবই আপোসহীন ও আবেগপ্রবণ। তিনি তখন বলেন, দক্ষিণ কাশ্মীরের যে এলাকায় তিনি মৌখিকভাবে ইসলামী শাসন জারী করে এসেছিলেন এবং স্থানীয় অধিবাসীদের ইসলাম গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই নির্দেশ মান্য করে স্থানীয় অধিবাসীদের সিংহভাগ ইসলাম গ্রহণ করেছিলো এবং নওমুসলিমদের শিক্ষাদীক্ষার জন্য তার নির্দেশে বহু মসজিদ-মক্তব স্থাপিত হয়েছিল। বহু সংখ্যক ইমাম ও শিক্ষক লাহোর বাটান্ডা ও অন্যান্য জায়গা থেকে কাশ্মীরে পাঠানো হয়। কিন্তু পরাজিত হিন্দু রাজারা বহুমুখী চক্রান্তের জাল বিস্তার করে নওমুসলিমদের বিভ্রান্ত করে ফেলেছে। শুধু তা-ই নয়, আঞ্চলিক প্রশাসক সেনাপতি সারওয়াগকে চক্রান্তকারীরা বন্দী করেছে। সেই সাথে সুলতানের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন সুলতান এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, স্বভাবজাত যুদ্ধ চিন্তা ও পরিকল্পনা করে নেয়ার অবকাশ তার হয়নি। স্বাভাবিক অবস্থায় নিজেকে ফিরিয়ে এনে তিনি ভাবতেই পারেননি, কোথায় কোন অবস্থায় কাদের সাথে মোকাবেলায় রওনা হচ্ছেন তিনি। ফলে তার বাহিনী কাশ্মীরে পৌঁছার আগেই সেখানে প্রচণ্ড শীত ও তুষারপাত শুরু হয়ে যাবে এদিকটি তিনি চিন্তা করেননি। তিনি ভাবতেই পারেননি, অত্যধিক ঠাণ্ডা আর তুষারপাত তার পরাজয়ের কারণ হতে পারে কিংবা অভিযানকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করতে পারে।
