কাছাকাছি গিয়ে আজমীর হিন্দুদের শাসিয়ে বলল, “বন্দীদের এখানেই ছেড়ে দিয়ে তোমরা চলে যাও।”
হিন্দুরা আজমীরের হুমকির কোন মৌখিক জবাব না দিয়ে মোকাবেলার প্রস্তুতিতে সারিবদ্ধ হয়ে গেল। সাথে সাথে আজমীরের নেতৃত্বে সহযোদ্ধারা হিন্দুদের উপর হামলে পড়লো। হিন্দু ও মুসলমান উভয় পক্ষের সবাই ছিল অশ্বারোহী। হিন্দুদের হাতে বন্দী সারওয়াগের সাথীদের সবাইকে ওরা পায়ে হেঁটে যেতে বাধ্য করেছিল। শুরু হয়ে গেল দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ। অল্পক্ষণের মধ্যে বন্দীদেরকে মুক্ত করতে সক্ষম হলো আজমীরের দল। উভয় পক্ষের মধ্যেই হতাহতের ঘটনা ঘটলো।
এক পর্যায়ে হিন্দুবাহিনী পালিয়ে গেলে বন্দীদশা থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত সারওয়াগ ও তার সাথীরা নিহত যযাদ্ধাদের ঘোড়াগুলো ধরে সেগুলোতে সওয়ার হয়ে নিকটবর্তী মুসলিম সেনাচৌকির দিকে রওয়ানা হলো। কিন্তু এই দলের মধ্যে কমান্ডার আজমীরকে দেখা গেল না।
কমান্ডার আজমীরের ঘোড়া আহত হয়ে রণাঙ্গন থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। আজমীর ঘোড়া না ছেড়ে এটিকে নিয়ে চৌকিতে ফেরার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পলায়নপর সাত-আটজন হিন্দু সৈন্য পেয়ে গেলো তাকে। ওরা আজমীরকে একাকী পেয়ে ঘেরাও করে ফেলল। ঘোড়াটি দুর্বল হয়ে পড়ায় তার পক্ষে পালানো সম্ভব ছিলো না। একাকী এতোজনের মোকাবেলা করাও সম্ভব ছিলো না তার। অগত্যা অসহায় আজমীরকে গ্রেফতারী বরণ করতে হলো। হিন্দুরা তাকে ঘোড়ার পিঠে বেধে কালাঞ্জর নিয়ে গেল। পথিমধ্যে আরো হিন্দু সৈন্য এদের সাথে মিলিত হলো। তারাও দু’জন মুসলিম সৈন্যকে বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছিল।
মুহূর্তের মধ্যে দুর্গে রটে গেল, কয়েকজন মুসলিম সৈন্যকে বন্দী করা হয়েছে। রাজমহলের ভেতরের রক্ষিতা ও নর্তকীদের কাছে চলে গেল মুসলিম সৈন্য গ্রেফতার করে আনার খবর। বন্য শূকরের আক্রমণ থেকে আজমীরের উদ্ধার করা নর্তকী এ খবর শুনে তৎক্ষণাৎ বের হয়ে এলো। কারণ, মুসলমান সৈন্যদের বন্দীশালায় বেশ কিছুদিন কাটিয়েছে সে। মুসলমানদের উন্নত মানসিকতা, ধর্মনিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা ও সর্বোপরি আদর্শের পরাকাষ্ঠা সে গযনী বাহিনীর মধ্যে দেখেছে। এখন সেই গযনী বাহিনীর সৈনিককে হিন্দুদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার খবরে সে তাদের নিজ চোখে দেখার আগ্রহ দমাতে পারলো না। কমান্ডার আজমীরের বীরত্ব, হৃদ্যতা, মানবিকতা, উন্নত নৈতিকতার কারণে গোটা গযনী বাহিনীর প্রতিই সেই তরুণীর হৃদয়ে শ্রদ্ধা ও ভক্তির আসন সৃষ্টি হয়েছিল। ধর্মীয় চাপে মুসলমানদের প্রতি যতই হিংসা থাকুক না কেন, হৃদয়ের গভীরে শ্রদ্ধার আসনটিকে সে সরিয়ে দিতে পারছিলো না। তাই নিজ চোখে মুসলমান বন্দীদের দেখার জন্য যখন সে বন্দীদের কাছে পৌঁছল, আজমীরকে দেখে হতচকিয়ে গেল তরুণী, তখন মুহূর্তের মধ্যে সে সিদ্ধান্ত নিল, যে লোক হিংস্র জন্তুর আক্রমণ থেকে আমাকে বাঁচিয়েছে, তাকে বাঁচাতে আমি সম্ভাব্য সব কিছুই করব। যেই ভাবনা সেই কাজ।
হিন্দু সৈনিকদের কমান্ডারকে হাতের ইশারায় একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে তরুণী তার কানে কানে আজমীরকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করলো। সে কমান্ডারকে জানালো, এই মুসলিম সৈনিক কিভাবে তার জীবন বাঁচিয়েছিলো এবং এর প্রতিদানে নিজেকে পেশ করার পরও সে তা গ্রহণ করেনি। তরুণী কমান্ডারকে বললো, তুমি এ কাজ করলে তোমাকে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশী পুরস্কার দেবো এবং তাকে এমনভাবে দুর্গের বাইরে পাঠাবো যে, কেউ ঘুণাক্ষরেও তা জানতে পারবে না।
তখনও পর্যন্ত বন্দীরদেরকে কোন সরকারী উচ্চ মহলের কাছে পেশ করা হয়নি। তখন সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়ে গেছে। বন্দীদেরকে তখন বন্দীশালায় রেখে দেয়ার কথা। হিন্দু কমান্ডারকে ছলে-বলে-কৌশলে আজমীরের মুক্তিদানে সম্মত করিয়ে তরুণী অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে আজমীরকে একটি ঘন ঝোঁপ-ঝাড় ও গাছগালাছীর আড়ালে নিয়ে গেল। আজমীরকে এখানে বসিয়ে রেখে তরুণী দৌড়ে চলে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে কিছু কাপড় ও একটি ঘোড়া নিয়ে এলো। তাড়াতাড়ি আজমীরের গায়ে পরিয়ে দিল হিন্দু ঋষি-পুরোহিতদের কাপড় এবং তাকে একজন বয়স্ক পুরোহিতের পোশাকে সজ্জিত করে মাথায় বিশেষ পাগড়ী বেধে দিল এবং ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে অগ্রসর হতে বলে নিজে আগে আগে চলল।
শাহী নর্তকী এগিয়ে গিয়ে প্রধান ফটকে প্রহরারত দায়িত্বশীল অফিসারকে বললো, “বাবাজি আমাদের কাছে এসেছিলেন। এখন জরুরী কাজে তাকে দুর্গের বাইরে অবস্থিত কাছের গ্রামে যেতে হচ্ছে। সেখানে দু’জন লোক মারা গেছে। তিনি পৌঁছুলে পরেই শুরু হবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। অন্দরমহল থেকে আমাকে দ্বার খুলিয়ে দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।”
দ্বাররক্ষী জানতো, এই তরুণী রাজমহলের নর্তকী। রাজপ্রাসাদ ও মহলে এই তরুণী প্রভাব-প্রতিপত্তি সম্পর্কেও অবহিত দ্বাররক্ষী। তাই কোন ধরনের দ্বিধা-চিন্তা না করে দ্বার খুলে দিল সে। পুরোহিতবেশী আজমীর বিনা বাধায় ফটক পেরিয়ে গেল। তাকে বের করে দিয়ে পুনরায় বন্ধ করে দিল ফটক। আজমীর দুর্গ থেকে বেরিয়ে ঘোড়া না হাঁকিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হলো। দুর্গ থেকে অনেক দূরে গিয়ে সে পুরোহিতের বেশধারী জামা খুলে ফেলল এবং পেট মোটা করার জন্য জামার নিচে গুঁজে দেয়া কাপড়ও ছুঁড়ে ফেলে দিল। মাথার বিশেষ পাগড়ীও ফেলে দিয়ে স্বাভাবিক হয়ে চৌকির উদ্দেশ্যে ঘোড়া হাঁকাল আজমীর।
