হঠাৎ তরুণী বললো, “আমি তাজা রক্তের গন্ধ পাচ্ছি। মনে হচ্ছে আপনি কোন গভীর বেদনায় আক্রান্ত। আজমীর, আপনি কি আহত?”
আস্তে করে বামহাতটি উপরে উঠালো আজমীর। তার হাতে একটি ধারালো খঞ্জর। খঞ্জরের অগ্রভাগ রক্তমাখা। তরণী তার ডানপাশে বসে ছিল। সে দেখতে পায়নি, সে যখন আজমীরের গলা জড়িয়ে গায়ে গা এলিয়ে দিয়ে আজমীরের দেহে কামনার আগুন জ্বালাতে চেষ্টা করছিল, এই প্রমোদনা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য অতি সন্তর্পণে আজমীর তার কোমরে রক্ষিত খঞ্জর কোষমুক্ত করে ধীরে খোলাপায়ের উপরিভাগে বিদ্ধ করল। তরুণী রক্তমাখা খ র দেখে বসা থেকে উঠে আজমীরের মুখোমুখি দাঁড়াল। তখন আজমীরের পায়ের ক্ষতস্থানের দিকে তার নজর পড়ল। ফিনকী দিয়ে সেখান থেকে রক্ত বেরোচ্ছে। অবাক বিস্ময়ে সেদিকে কতোক্ষণ তাকিয়ে রইল তরুণী।
“এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই সুন্দরী।” আমি মানুষ, ফেরেশতা নই। আমি পুরোপুরি সক্ষম একজন যুবক। তোমার শরীরের স্পর্শ ও রেশমী চুলের ছোঁয়া আমাকে স্বীয় কর্তব্য থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছিল। আমি শুধু সুলতানের চাকুরী করি না, আল্লাহর দরবারেও আমার কর্তব্য সম্পর্কে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। এ ভূখণ্ডে একজন সুলতান আর মহারাজাদের সংঘাত রাজ্য দখল নিয়ে নয়, এটি সত্য ও ন্যায় এবং অসত্য ও অন্যায় মতবাদের সংঘাত।
আমি সাময়িক একটু সুখ ভোগের জন্য আমার আজীবন লালিত স্বপ্ন ও আদর্শকে জলাঞ্জলী দিতে পারি না। তোমার রূপ-সৌন্দর্য ও সমর্পিত নিবেদন উপেক্ষা করে মনের মধ্যে চাপও সৃষ্টি করতে চাই না। এজন্য তোমার দিকে থেকে দৃষ্টি ফেরাতে নিজের পায়েই খঞ্জর বিদ্ধ করেছি।… ঠিক আছে তুমি এখন নিজের কক্ষে চলে যাও।…
তরুণী আজমীরের একটি হাত টেনে নিয়ে তার চোখে স্পর্শ করাল এবং তাতে চুমো খেয়ে নিজ কক্ষে চলে গেল।
পরদিন সকালে তিন তরুণীকে তিনটি ঘোড়ায় সওয়ার করে দশজন অশ্বারোহী সহযোদ্ধাকে সাথে নিয়ে কমান্ডার আজমীর কালারের পথে রওনা হয়ে গেল। তরুণীরা বারবার তাদের ঘোড়া আজমীরের ঘোড়ার পাশে নিয়ে আসছিল। কিন্তু আজমীর তাদের প্রতি মুচকি হাসি উপহার দেয়া ছাড়া কোন কথা বলেনি।
মধ্যরাতের পরে কালার দুর্গের প্রধান ফটকের সামনে পৌঁছলো আজমীরের কাফেলা। দুর্গের অনতিদূরে তরুণীদের নামিয়ে দিয়ে সঙ্গীদের নিয়ে ফিরে আসতে উদ্যত হলো আজমীর।
জীবন বাঁচানোর কৃতজ্ঞতায় আজমীরের কাছে নিজেকে সমর্পণকারী মেয়েটি আজমীরের পথ আগলে দাঁড়িয়ে বিনীত কণ্ঠে বললো, “আপনার উপকারের কোন প্রতিদান আমি দিতে পারিনি। আমার দেহ ছাড়া আপনাকে দেয়ার মতো আর কিছু ছিলো না আমার। এজন্য আজীবন একটা দুঃখবোধ আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে।”
“আমি কোন প্রতিদান চাই না। আমাকে আমার প্রভু উত্তম প্রতিদান দিবেন। তুমি তোমাদের রাজাকে গিয়ে বলো, যুদ্ধ হয় রণাঙ্গনে পুরুষে-পুরুষে। নারীকে দিয়ে কখনো যুদ্ধ জেতা যায় না।”
সহযোদ্ধাদের নিয়ে ফিরে আসার পথে আজমীরের মন ছিল ফুরফুরে। আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে নিজেকে সমর্পণ করার পর আল্লাহ তার আবেদন মঞ্জুর করেছেন। তার ঈমানের নূর সে প্রত্যক্ষ করেছে। সেই সাথে অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পালন করতে পেরেছে সে।
এদিকে সেনাপতি সারওয়াগ অচেনা পাহাড়ের ঘূর্ণিপাকে ঘুরে ঘুরে হয়রান। তিন-চারদিন বিরতিহীন ঘুরে-ফিরেও পাহাড়ের বেষ্টনী থেকে বেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার কোন পথ পায়নি তারা। এই এলাকায় যদি খাওয়ার উপযোগী সুমিষ্ট ফলজ গাছের সমারোহ এবং সুপেয় পানির প্রাচুর্যতা না থাকতো, তাহলে এতোদিনে তাদের পক্ষে জীবন বাঁচানোই অসম্ভব হয়ে যেতো।
লোহাকোট দুর্গের হিন্দু রাজাকে প্রথম এ খবরটি দেয়া হলো যে, বালনাথ দুর্গের মুসলিম দুর্গপতি এবং গযনী সুলতানের আঞ্চলিক প্রশাসক সেনাপতি সারওয়াগ একজন ইমাম ও কয়েকজন সৈন্য নিয়ে পাহাড়ের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদেরকে হিন্দুরা বিভ্রান্ত করে পাহাড়ের মধ্যে এনে ছেড়ে দিয়েছে। লোহাকোট দুর্গের দুর্গপতি কালবিলম্ব না করে এ খবরটি রাজা নন্দায়কে জানাল। রাজা নন্দরায় এ খবর শুনেই নির্দেশ দিলেন, ওদের সবাইকে পাকড়াও করে দুর্গে নিয়ে আসা হোক।
এক দিন পর পার্শ্ববর্তী একটি মুসলিম সেনাচৌকির এক সিপাহী কমান্ডার আজমীরের চৌকিতে এসে সেই চৌকির কমান্ডারের পক্ষ থেকে জানাল
“আমি খবর পেয়েছি, কালাঞ্জর দুর্গের একটি সেনাদল আমাদের সেনাবাহিনীর একটি ছোট্ট কাফেলাকে গ্রেফতার করে কালাঞ্জর নিয়ে যাচ্ছে। আমার পক্ষে এটা জানা সম্ভব হয়নি যে, এই মুসলিম সৈন্যরা কারা এবং কোন চৌকির সৈনিক? আমি ওদের উদ্ধার করতে যাচ্ছি, কিন্তু আমার জনবল খুবই কম। যথাসম্ভব জনবল দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করুন।”
“সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে তার চৌকির বাছাই করা দশজন সিপাহীকে নিয়ে আজমীর নিজেই রওনা হলো। পথ ছিল দুর্গম এবড়ো-থেবড়ো। তারপরও আজমীর ও সাথীরা চার-পাঁচ ঘণ্টর মধ্যে সংবাদ প্রেরণকারী চৌকির কমান্ডারের কাছে পৌঁছে গেল।
গযনী বাহিনীর কয়েকজন সদস্যক কালারের সৈন্যরা গ্রেফতার করার খবরটি দিয়েছিল স্থানীয় একজন অধিবাসী। সে জানালো, হিন্দুদের দলের সৈন্য সংখ্যা পঞ্চাশ-ষাটজনের কম হবে না। আজমীর ও সংবাদদাতা কমান্ডার ত্রিশজন সিপাহী নিয়ে উদ্ধার অভিযানে রওনা হলো। সংবাদদাতা লোকটিই ছিল তাদের গাইড। বেশী দূর যেতে হলো না তাদের। ঘন্টাখানিক অগ্রসর হওয়ার পর ময়দান পেরিয়ে একটি পাহাড়ী উপত্যকায় পৌঁছে তারা দেখতে পেল হিন্দুবাহিনীর বেষ্টনীতে গমনকারী কয়েকজন মুসলিম যোদ্ধাকে। দূর থেকেই তারা সেনাপতি সারওয়াগকে চিনতে পারল। সেই সাথে অন্য সিপাহীরাও ছিল তাদের পরিচিত।
