কমান্ডার আজমীর যে কয়জনকে গ্রেফতার করেছিল, তাদের জীবন ভিক্ষা এবং বিনা শাস্তিতে মুক্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কুচক্রী দলের অন্য সদস্যদেরও ঠিকানা-পরিচয় জেনে নিয়েছিল।
তরুণীকে ব্যবহার করে আজমীর তার পুরুষ ও অন্য সাথীদের যেভাবে পাকড়াও করে, ঠিক একই কৌশলে অন্যান্য কুচক্রীদেরও সে পাকড়াও করতে সমর্থ হয়।
একদিন আজমীর কয়েক গ্রামের লোকজনকে একত্রিত করে কুচক্রী দলকে তাদের সামনে দাঁড় করিয়ে বলতে বাধ্য করল, এ পর্যন্ত দেবদেবীদের নামে তাদের কাছে যা প্রচার করা হয়েছে, তার সবই ছিলো শুধুই গুজব, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। গ্রামের অনেকেই অপকর্মকারীদের চিনে ফেলল। চক্রান্তকারীরা গ্রামের লোকদের কাছে তাদের আসল পরিচয় প্রকাশ করে দেয়। সন্ধ্যার পর আজমীর কুচক্রীদেরকে রাতের বিজলী চমকানোর মহড়া দিতে এবং তরুণীদেরকে প্রেতাত্মারূপে আবির্ভূত হয়ে দেখাতে বাধ্য করে।
মহারাজা নন্দরায় যখন দেখতে পেলেন, তার চক্রান্ত ভণ্ডুল হয়ে গেছে, তখন তিনি যেসব ইমাম ও প্রশিক্ষক নওমুসলিমদেরকে ইসলাম শিক্ষা দিচ্ছে এবং ইবাদত-বন্দেগীর তালিম দিচ্ছে, তাদের হত্যা করে লাশগুলো এমনভাবে গুম করার নির্দেশ দেন, যাতে এর কোন আলামত কেউ খুঁজে না পায়। যেসব ক্যাম্পে গযনী বাহিনীর সৈন্যরা অবস্থান করছে, তাদেরকে ক্যাম্প থেকে একজন দু’জন করে বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলার নির্দেশ দেন রাজা নন্দরায়।
এক রাতে আজমীর তার ক্যাম্পের একটি কক্ষে একাকী বসে ছিল। তার পাশেই একটি কক্ষে চক্রান্তকারী পুরুষ ও তরণীদের আটকে রাখা হয়েছিল। ওদের কক্ষের সামনে কমান্ডার আজমীর প্রহরার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল। বন্দীদের একথাও বলে দিয়েছিল সে আগামীকালই তোমাদের দলের পুরুষদের বালনাথ পাঠিয়ে দেয়া হবে। আঞ্চলিক কমান্ডার সেনাপতি সারওয়াগের হাতে তোদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। আর তরুণীদেরকে সেনাপ্রহরায় কালাঞ্জর পাঠিয়ে দেয়া হবে।
রাতের মধ্যভাগে এক সিপাহী কমান্ডার আজমীরকে এসে জানালো, এক বন্দী তরুণী আপনার সাথে কথা বলতে চায়।
কমান্ডার আজমীর তরুণীকে ডেকে পাঠাল। সে যে তরুণীকে নদী থেকে তুলে এনেছিল, সে-ই ছিল সাক্ষাত প্রত্যাশী।
“সম্মানিত কমান্ডার, আজ রাতেও কি আপনি আমাকে কাছে ডাকবেন না? অন্তত আজ রাতটি আপনার কাছে কাটাতে ইচ্ছে করছে আমার।”
তরুণীর কথায় হাসি পেল আজমীরের। সে বলল, আমি অনুভব করি, তুমি অস্বাভাবিক সুন্দরী। আল্লাহর কসম, তোমার মতো রূপসী নারী আমি জীবনে দ্বিতীয়টি দেখিনি। তোমার বিস্মিত হওয়ার বিষয়টিকে আমি বুঝি না এমন নয়। আমার মতো একজন যুবকের পক্ষে দীর্ঘদিন স্ত্রীসঙ্গবিহীন জীবন কাটানোর পর তোমার মতো রূপসীকে হাতের নাগালে পেয়ে একটুও আকৃষ্ট না হওয়ার ব্যাপারটি তোমাকে অবাক করেছে। অথচ তোমরা প্রত্যাশা কর, আমি
তোমাদের রূপের প্রতি আকৃষ্ট হই। কিন্তু তুমি যদি আমার মতো মুসলমান হতে, তোমার উপরে যদি আমার মতো এমন কঠিন দায়িত্ব ন্যস্ত থাকতো, তুমি যদি ঈমানের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হতে, তাহলে আর তোমার কাছে ব্যাপারটি অস্বাভাবিক মনে হতো না। তোমাদের দৃষ্টি মানুষের দেহের প্রতি, এটা তোমাদের ধর্মের শিক্ষা আর আমাদের দৃষ্টি থাকে আত্মার প্রতি। আত্মাকে কেন্দ্র করেই আমাদের ধর্মবিশ্বাস আবর্তিত। এটাই আমাদের ধর্মের শিক্ষা।”
“তোমার ভালোবাসা পেতে আমি যদি মুসলমান হয়ে যাই?”
“কালনাগিনীর বিষ খুলে নিলেও সে কালনাগিনীই থাকে। তাকে যদি মধুও পান করাও, তবুও তার দেহে বিষই উৎপাদিত হবে এবং এক সময় ঠিক নাগিনীর মতোই ছোবল মারবে। কারণ, এটাই তার ধর্ম।…”
আমি এখানে প্রেমপ্রীতির খেলা আর বিয়ে-শাদী করে সুন্দরী নারী নিয়ে ফুর্তি করতে আসিনি। তোমার এই অপরূপ সৌন্দর্য ও আকর্ষণীয় দেহবল্লরীর প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নেই। এটা আমার ঈমানের শক্তি। এ কারণে আমার দৃষ্টি নিজের যৌবনের প্রতি যেমন পড়ে না, তদ্রপ তোমার মতো রূপসীর দেহবল্লরীর প্রতিও আমি আকর্ষণ বোধ করি না। শোন সুন্দরী! আমার ধর্ম আমাকে শিক্ষা দিয়েছে, শত্রুপক্ষের কোন অবলা নারী যদি তোমাদের হাতে বন্দী হয়, তখন তাদের অসহায়ত্বের সুযোগে তাদের রূপরসের স্বাদ নেয়া মহা অপরাধ। নারী বন্দীদেরকে তোমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখবে।”
আজমীরের কথা শুনে তরুণীর চোখে পানি এসে গেল। সে আজমীরের চৌকিতে তার সাথে গা মিশিয়ে বসল। আজমীরের কাঁধে একটি হাত রেখে তরুণী এমনভাবে তার শরীরে গা এলিয়ে দিয়ে বসল যে, তার এলো চুলগুলো আজমীরের নাকে-মুখে স্পর্শ করছিল। বিগলিত কণ্ঠে তরুণী আজমীরকে বলল–
“আপনি আমাকে বন্য শূকরের আক্রমণ থেকে বাঁচিয়েছেন। এখন আপনি আমাকে মুক্ত করে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে আমার ঠিকানায় পৌঁছে দিতে চাচ্ছেন। এতোটা দিন আমাদের মতো তিনটি যুবতী মেয়ে সম্পূর্ণ আপনার ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার উপর আপনার দয়া-অনুগ্রহে কাটালাম, তারপরও আপনি আমাদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া তো দূরে থাক আমাদের রূপ যৌবনের প্রতি একটু গভীরভাবে তাকিয়েও দেখেননি। আপনি পাথর হয়ে রইলেন…।”
কথা বলতে বলতে নীরব হয়ে গেল তরুণী। এক পর্যায়ে দুহাতে আজমীরের চেহারা তার দিকে ঘুরালো। মমতা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আজমীরের প্রতি তার আত্মনিবেদনের ভাব তরুণীর চোখে-মুখে ফুটে উঠলো।
