সকালে যখন তাদের ঘুম ভাঙল, তখন উভয় গাইড উধাও। খোঁজাখুঁজি করে তাদের কোথাও পাওয়া গেল না। খোঁজাখুঁজি করাও সহজ ছিল না। চতুর্দিকে উঁচু পাহাড়। ঘন ঝোঁপ-ঝাড়ে ঢাকা পাহাড়। গাছ গাছালী ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। তারা কোথায় এসেছে, কোন দিকে যেতে হবে কিছুই জানে না তারা। যে পথে এসেছে এই পথে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোন পথ তাদের জানা নেই।
আফসোস! হিন্দুদের চক্রান্তের শিকার হয়েছি আমরা। এরা দু’জন জানতো, আপনি আমাদের এই এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নানা গল্প বলছিলেন, এরা এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়েছে। ইমামের উদ্দেশ্যে বললেন সেনাপতি সরওয়াগ।
“আমরা যখন বালনাথ দুর্গের পাশ দিয়ে আসছিলাম, তখন আমি দু’জন অশ্বারোহীকে দূরে দেখতে পেয়েছিলাম। আমি মনে করেছিলাম, ওরা হয়তো কোন পথিক। কে জানে ওরাই কি সেই পথিক কি-না?” বললো এক সিপাহী।
“প্রথম যখন আমরা সাপ দেখি, তখন আমি ওদের দেখেছিলাম, কিন্তু তাদের চেহারা দেখা যাচ্ছিল না।” বললো অপর এক সিপাহী।
“তোমাদের দেখা লোকেরা এরাই হোক বা অন্য কেউ হোক, তাতে কী আসে যায়?” বললেন সারওয়াগ। আসল কথা হলো, আমরা এক ভয়ানক প্রতারণার শিকার হয়েছি। এখন এখান থেকে কিভাবে বের হওয়া যায় চিন্তা কর। আর একটা কাজ কর, আমাদের পুটলীতে খাওয়ার মতো যা কিছু আছে সব ফেলে দাও। এতে ওরা বিষ মিশিয়ে রেখে যেতে পারে। সেনাপতির নির্দেশে খাবার যা কিছু ছিল বিষ সব ফেলে দেয়া হলো।
এবার শুরু হলো অজানা-অচেনা পথে কঠিন এক সফর। এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে সারা দিন কেটে গেল। রাতটা কোনমতে কেটে গেল বটে; কিন্তু অত্যধিক ঠাণ্ডায় কেউই স্বস্তি পেল না। পরদিনও এভাবেই অজানা অচেনা পথে ঘুরে ঘুরে কেটে গেল। পরদিন রাতে যে সময় সারওয়াগের কাফেলা ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার জন্য একটু উষ্ণ জায়গা খুঁজছিল, ঠিক সেই সময় প্রতারক দুই হিন্দু গাইড লোহাকোট দুর্গে বসে দুর্গপতির কাছে তাদের কাজের বর্ণনা দিচ্ছিল, কিভাবে তারা সারওয়াগের কাফেলাকে অচেনা পাহাড়ী জায়গায় ফেলে এসেছে। সেখান থেকে ওদের বেরিয়ে যাওয়া মোটেও সহজ ব্যাপার নয়।
“তোমরা ওদের হত্যা করে এলে না কেন?” দুর্গপতি আফসোস করে বলল। সুলতান মাহমূদ কোন সাধারণ লোককে আঞ্চলিক কমান্ডারের দায়িত্ব দেয়নি। তোমরা খুবই মূল্যবান শিকার হাতে পেয়েছিলে। তোমাদের কাজে আমি খুবই খুশী। কিন্তু ওদের ইহলীলা সাঙ্গ করে আসতে পারলে বেশী খুশী হতাম।’
“কালাঞ্জর থেকে আমাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কোন মুসলমান সেনাকে যেন কেউ হত্যা না করে। আমরা জানি না এ নির্দেশ কেন দেয়া হয়েছে। নয়তো খুব সহজেই আমরা ওদের খাবারে বিষ মিশিয়ে দিতে পারতাম।
“কালাঞ্জরের মহারাজা ভেবেচিন্তেই বলেছেন, তিনি হয়তো সুলতান মাহমূদকে এই বার্তাই দিতে চান, চুক্তি অনুযায়ী এখানে তার সৈন্যরা নিরাপদেই আছে। তবে তারা নিজেরাই যদি অচেনা জায়গায় গিয়ে ঘুরে ঘুরে মারা যায়, তাতে আমাদের কি করার আছে?”
আসলেও তাই হলো। সারওয়াগকে তার কাফেলাসহ অচেনা পথে ঘুরে ঘুরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া থেকে কে রক্ষা করবে? তারা নিজেরাই তো ওখানে গিয়েছে। দুদিন একটানা ঘুরেও তারা না পেল কোন পথের সন্ধান, না পেল কোন জনবসতির চিহ্ন। দূরে কাছে কোথাও কোন জনমানবের চিহ্ন তাদের চোখে পড়ল না। পানাহারবিহীন এই নির্জন জঙ্গলে প্রায়ই তাদের চোখে পড়ে জোড়ায় জোড়ায় পাহাড়ী বাঘ। সিংহের গর্জনও কানে আসে। পৃথিবীর এতো সৌন্দর্যমণ্ডিত মায়াবী এই জমিন তাদের কাছে এখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো।
খুবই কার্যকর একটা চাল দিয়েছে হিন্দু চক্রান্তকারীরা। সারওয়াগ ছিলেন এই এলাকার আঞ্চলিক সেনাপ্রধান। প্রধান সেনাধ্যক্ষের অনুপস্থিতিতে নওমুসলিমদেরকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য তারা যে চক্রান্তের আয়োজন করেছিল, সারওয়াগের অনুপস্থিতিতে সেই কর্মকাণ্ড চালানোর প্রধান প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে গেল। হিন্দু যোগী-সন্ন্যাসী ও পুরোহিতরা চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে খুবই দক্ষ ও নিপুণ। মন্দিরগুলোতে পুরোহিতরা পূজারীদের বলতে লাগল, গোমা-তা যেমন পবিত্র, মুসলমানরা তেমনই অপবিত্র। মুসলমানদের হত্যা করে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা ধর্মের প্রধান কাজ। মন্দিরের পুরোহিতরা মুসলমান হত্যাকে ধর্মের সবচেয়ে বড় পুণ্যের কাজ বলে ঘোষণা করে। সেই দিনের পুরোহিত আর নব্য ভারতের হিন্দু নেতাদের নীতির আদর্শের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আজো ভারতকে মুসলমানশূন্য করার ব্যাপারে সকল হিন্দুই এক ও অভিন্ন মত পোষণ করে।
১০১৪ খৃস্টাব্দের একদিন। রাজা নন্দরায় কালার দুর্গে বসে দুষ্কৃতকারী দলপতির কাছ থেকে তাদের কর্মকাণ্ডের রিপোর্ট শুনছিলেন। রাজা নন্দরায় দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা বিজিত এলাকাসমূহের নওমুসলিমদের বিভ্রান্ত করে পুনরায় হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনা এবং মুসলিম শাসকদের উৎখাত করার চক্রান্তের জাল বুনেছিলেন, তা মুসলিম সৈন্য ও শাসকদের কাছে ধরা পড়ে যায়। তারা যাদুটোনা এবং সুন্দরী নারীদেরকে প্রেতাত্মারূপে গ্রামের অশিক্ষিত মানুষের কাছে হিন্দু দেবদেবীদের গযবের আলামত হিসেবে উপস্থাপন করতে পাহাড়ের উপর থেকে কৃত্রিম আলো ফেলে বিজলী তৈরী করে। দুষ্কৃতকারী দলের নেতা বলছিলো, আমাদের প্রশিক্ষিত দলের দুই পুরুষ সদস্য ও তিন কিশোরীকে মুসলিম সৈন্যরা আসবাবপত্রসহ পাকড়াও করেছে এবং তাদেরকে গ্রামে গ্রামে নিয়ে গিয়ে মানুষকে সবকিছু দেখিয়ে বলেছে, এরাই হলো তোমাদের দেখা আসমানী গজবের প্রতীকী প্রেতাত্মা আর এইসব আসবাব হলো আসমানী বিজলীর রসদ।
