কমান্ডার আজমীর ঝুপড়ীতে উঁকি দিয়ে দেখলো, ঝুপড়ীর ভেতরে একটি বিশালকায় কাঠের ফ্রেমে স্বচ্ছ আয়না। আরো আছে আয়নার চেয়েও আরো বেশী স্বচ্ছ বিশালাকার গ্লাস।
“এগুলো কী?” পুরুষ দু’জনকে জিজ্ঞেস করল আজমীর।
“এগুলো কিছু না। আমরা এমনিতেই এদিকে এসেছি।”
পুরুষ দুজনকে টালবাহানা করতে দেখে বন্য শূকরের আক্রমণ থেকে প্রাণে বাঁচানো তরুণীর দিকে তাকাল আজমীর। এই তরুণী এর আগেই জীবন বাঁচানোর জন্য আজমীরের প্রতি কৃতজ্ঞ। সেই সাথে একান্তে পেয়েও তার সাথে কোন পাশবিক আচরণ না করে তাকে আমানতের মতো পবিত্র জ্ঞানে নিরাপত্তা দেয়ায় সে আজমীরের কাছে ওয়াদা করেছিল, তার কাছে তাদের সব রহস্যই প্রকাশ করে দেবে। প্রদত্ত প্রতিশ্রতি অনেকটাই ইতোমধ্যে পূরণ করেছে সে। বাকীটুকু পূরণ করতে সঙ্গী পুরুষদের উদ্দেশ্যে তরুণী বলল, এখন আর টালবাহানা করা নিষ্ফল। কারণ, আমাদের অনেক কিছুই জেনে গেছে এরা।
তারা কমান্ডার আজমীরকে উপরে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে চতুর্দিকে তাকিয়ে আজমীর দেখতে পেল, গাছগাছালীর উপর দিয়ে তার চৌকি দেখা যাচ্ছে। গাছের ফাঁক দিয়ে আজমীর নদীর তীরের যে জায়গাটায় গিয়েছিল, সেই জায়গাটাও আবছা মতো দেখতে পেল।
আজমীরকে জানানো হলো, ওই যে শুকনো কাঠের স্তূপ দেখা যাচ্ছে, খাড়া পাহাড়ের এই জায়গায় রাতের বেলায় এই শুকনো কাঠের স্থূপে আগুন জ্বালানো হবে। এই আগুন পাহাড়ের নিচের গ্রামবাসীর দৃষ্টির আড়ালে থাকবে। এরপর বিশাল এই আয়নাটি সমতল পাহাড়ের যে জায়গাটায় তারা দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে রাখা হবে। জ্বলন্ত আগুনে ঢেলে দেয়া হবে তেল। তাতে আগুনের শিখা বহু উঁচুতে উঠে যাবে। জ্বলন্ত আগুনের ঝলক পড়বে আয়নার উপর। তখন আয়নাটিকে দু’-তিনবার বিরতি দিয়ে সেনাচৌকি ও গ্রামের দিকে ঘুরানো হবে। জ্বলন্ত আগুনের ঝলক আয়নায় প্রতিবিম্বিত হয়ে সেনাচৌকি ও গ্রামে প্রতিফলিত হবে। খুব অল্প সময়ে আয়নাটি ঘুরানোর কারণে আয়নায় প্রতিবিম্বিত আলোর ঝলকানীকে অজ্ঞাত লোকের কাছে বিজলীর ঝলক মনে হবে।
এদের কথার মর্ম উপলব্ধি করা আজমীরের পক্ষে মোটেও কঠিন ছিল না। কারণ, তরুণী তাকে আগেই জানিয়েছিল, আজ রাত তাদের পরিকল্পনা ছিল গ্রামের উপর বিজলী চমকানো এবং পাহাড়ে আগুন জ্বালানো। কয়েক দিন আগে অন্য পাহাড় থেকে গ্রামের উপর বিজলী চমকানোর বিষয়টিও এখন আজমীরের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
“এটা বুদ্ধির খেলা” বলল দু’ পুরুষের একজন।
রাতের অন্ধকারে আগুনের আলো এই আয়নায় প্রতিবিম্বিত হলে আলোর ঝলক সৃষ্টি করে। আর প্রতিবিম্বিত আলোকে পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী গ্রামের লোকজন দেখে মনে করে আসমানের বিজলী। পাহাড়ের উচ্চতা সম্পর্কে জ্ঞাত লোকেরাও এটা ভাবতে পারে না, এই আলোর ঝলকানী পাহাড়ের চূড়া থেকে এসেছে। রাতের অন্ধকারে আলোর ঝলক দেখিয়ে দিনের বেলায় আমাদের প্রশিক্ষিত লোকজন গ্রামের মানুষের মধ্যে এই আলোকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের অলৌকিক কাহিনী প্রচার করে। আর লোকদের মধ্যে এসব কাহিনী বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে, জন্ম নেয় কল্পনা আর অবাস্তবতা মিলিয়ে ভৌতিক সব কল্পকাহিনীর গুজব।
আমাদের লোকেরা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে প্রচারণা চালায়, দেবদেবীদের ধর্ম ত্যাগ করার কারণে দেবতাগণ তোমাদের উপর রুষ্ট হয়েছেন। তোমরা আবার স্বধর্মে ফিরে না এলে গযব নেমে আসবে। বিভিন্ন রকম বিপদাপদে পতিত হবে তোমরা। এসব থেকে বাঁচার একটাই উপায়, তওবা করে আবার স্বধর্মে ফিরে এসো এবং দেবদেবীদের সন্তুষ্ট করার জন্য বেশী করে পূজা-অর্চনা করা।
লোকজন নির্জন স্থানে সুন্দরী উলঙ্গ পরীর বেশে যাদের দেখে প্রেতাত্মা কিংবা পরী মনে করেছে, এ তিন তরুণীই ছিল কথিত পরী বা প্রেতাত্মা। এরা এই এলাকার অধিবাসী নয়। লাহোর ও বাটান্ডার রাজমহলের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশিষ্ট তরুণী এরা।
আল্লাহ তাআলা কমান্ডার আজমীরের বিগলিত মোনাজাত কবুল করেছেন। সে তার ঈমানের দ্যুতি এখন নিজ চোখেই দেখতে পাচ্ছে। তার কাছে সব অদ্ভুত ও আসমানী গজবের কাকাহিনীর অন্তরালে এসব যোগীদের ভণ্ডামীর ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন বিভ্রান্ত নওমুসলিম গ্রামবাসীকে এ ব্যাপারে অবহিত করার প্রয়োজন বোধ করল কমান্ডার আজমীর। দুই যোগী পুরুষ ও তিন তরুণীকে পাকড়াও করে সেনাচৌকিতে এনে কঠোর প্রহরায় রাখল আজমীর। সেই সাথে তাদের জিজ্ঞেস করল, আর কোন কোন জায়গায় তাদের লোজন এমন কাণ্ডকারখানা ঘটাচ্ছে?
* * *
এদিকে সেনাপতি সরওয়াগের কাফেলা পথে পাওয়া দুই গাইডের দেখানো পথে অগ্রসর হচ্ছিল। ইমাম সাহেব কয়েকবার দুই গাইডকে উদ্বিগ্নকণ্ঠে বললেন, কী ব্যাপার! এতো সময় লাগছে কেন? এতো দিনে তো আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা!
জবাবে দুই গাইড ইমামকে বোঝালো, অত্যধিক নিরাপত্তার কারণে তারা দীর্ঘপথে অগ্রসর হচ্ছে। কারণ, এ পথটি সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ।
আসলে গাইডদের নিয়ে যাওয়া পথ মোটেও সহজ ছিল না। গাইডদ্বয় কাফেলাকে বিভ্রান্ত করে অচেনা দুর্গম দীর্ঘ পথে নিয়ে যাচ্ছিল।
একদিন রাতের বেলা এক জায়গায় বিশ্রাম করার জন্য যাত্রাবিরতি করল কাফেলা। তখন গাইড দু’জন কাফেলার প্রধান সরওয়াগকে জানাল, “আগামীকাল দ্বিপ্রহরের আগেই তারা গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। বিরতিহীনভাবে দুর্গম পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করার ফলে কাফেলার সবাই ছিল খুবই ক্লান্ত। যাত্রাবিরতি দিয়ে হাল্কা কিছু খাওয়া-দাওয়ার পর গা এলিয়ে দিতেই সবাই ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।
