“আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি এই এলাকার কোন লোক নও। তোমার কথাবার্তা এই এলাকার মনে হয় না। তোমার চালচলনও এই অঞ্চলের মানুষের সাথে মিলে না। তাছাড়া তুমি কোন গরীব গ্রাম্য বাবার সন্তানও নও।”
“আমি যদি আপনাদের কোন প্রশ্নেরই জবাব না দিই, তাহলে আমার সাথে কী আচরণ করা হবে?”
“তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া ছেড়ে দেবো না। তোমাকে পবিত্র আমানতের মতো সযত্নে এখানে রাখবো।” বললো আজমীর।
খিক খিক্ করে হেসে ফেলল তরুণী। হঠাৎ সে আজমীরের সাথে এভাবে কথা বলতে শুরু করল, আজমীর তার কতো দিনের চেনা-জানা লোক। সে স্বেচ্ছায় আজমীরের কাছে নিজেকে সঁপে দিচ্ছিল।
তরুণীর এই বিগলিত ও স্বেচ্ছা সমর্পণের মনোভাব দেখে আজমীর বললো, “আমি একজন মুসলমান। আমি আমার সুলতান ও দায়িত্বের সাথে গাদ্দারী করতে পারি না। তুমি ভাবাবেগ সম্পর্কে আমাকে একটা পাথর মনে করতে পার।”
তরুণী আজমীরকে তার মায়াজালে আবদ্ধ করার জন্য আরো কিছু কৌশল প্রয়োগ করল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারল, প্রকৃতপক্ষেই আজমীর একটা পাথর।
অবশেষে তরুণী আজমীরের উদ্দেশ্যে বলল, আপনি আমার জীবন বাঁচিয়েছেন। আমি যেমনটি আপনাকে ভেবেছিলাম, আপনি মোটেও তেমন নন। এখন আমার কর্তব্য আমার সত্যিকার অবস্থা আপনাকে জানানো। এরপর আপনার যা ইচ্ছা আপনি করতে পারেন।…
“আমি সেই প্রেতাত্মাদের একজন, যারা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সুন্দরী তরুণীর বেশে গোচরীভূত হয়। কিন্তু আমি প্রেতাত্মা নই মানুষ। আমার সাথে আরো যে দু’জন তরুণী ছিল, তারাও মানুষ। কালাঞ্জর দুর্গ আমাদের ঠিকানা। আমাদের অস্থায়ী ঠিকানা যেখান থেকে আপনি আমাকে উঠিয়ে এনেছেন, সেখান থেকে কিছুটা দূরের পাহাড়ের উপর। আজ রাত আমাদের উপর দায়িত্ব ছিল বিপরীত পাশে অবস্থিত পাহাড়ের উপর থেকে বিজলী চমকানো এবং আলোকরশ্মির বিচ্ছুরণ ঘটানো।
“বিজলী চমকানোর রহস্যটা আসলে কী?”
“আপনি ইচ্ছা করলে ওইসব লোকদের পাকড়াও করতে পারেন। অবশ্য সমস্যা হলো, ওরা এততক্ষণে হয়তো আমাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে। ওরা যদি আমাকে জীবিত বা মৃত উদ্ধার করতে না পারে, তাহলে তাদের গোপন রহস্য প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা এ জায়গা ছেড়ে চলে যেতে পারে। আপনি কি এদের পাকড়াও করার ব্যাপারে কিছু ভাবছেন?”
“যেখান থেকে আমি তোমাকে তুলে এনেছি, আমি তোমাকে সেখানে ছেড়ে দিয়ে আড়ালে বসে থাকবো। ওরা হয়তো তোমাকে খুঁজতে আসবে, তখন ওদের আমি পাকড়াও করবো।” বলল আজমীর।
তুমি যদি আমাকে ধোকা দিতে চেষ্টা করো, তাহলে মনে রাখবে তুমি সব সময় আমার তীরের নিশানার মধ্যেই থাকবে।”
“আমি আপনাকে ধোঁকা দেবো না। আপনি আমার জীবন বাঁচিয়েছেন। ওঁ আমি আপনাকে এর প্রতিদান দেব।”
কমান্ডার আজমীর তরুণীকে যেখান থেকে তুলে এনেছিল, সেখানে পৌঁছে দিল। আজমীরের বর্শার আঘাতে নিহত বন্য শূকরটি মরে সেখানেই পড়ে আছে। অল্প পানি থাকায় স্রোত সেটিকে ভাসিয়ে নিতে পারেনি।
তরুণী ছাড়া পেয়ে নদীর তীর ধরে উজানের দিকে অগ্রসর হতে এবং এদিক-ওদিক তাকিয়ে তাদের লোকজনকে তালাশ করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর নদীর অপর তীরে দু’জন পুরুষকে দেখতে পেল তরুণী। তারা তরুণীকে ডাকল। তরুণী তাদেরকে হাতের ইশারায় এ পাড়ে আসার জন্য ডাকল। উভয়ে পাহাড়ী নদীর হাঁটুসমান পানি ভেঙে এ পাড়ে এসে তরুণীকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কোত্থেকে এসেছে, এতোক্ষণ কোথায় ছিলে?”
এরা যখন দাঁড়িয়ে পরস্পর কথা বলছিল, তখন নদীর তীরের ঘন ঝোঁপের আড়াল থেকে চারসঙ্গী সিপাহীসহ আজমীর ময়দানে বেরিয়ে এলো। তরুণীর পরিচিত পুরুষ দুজন আজমীরকে দেখে ঘাবড়ে গেল। আজমীরের হাতে তাক করা তীর-ধনুক। সে হুমকির স্বরে ওদের বলল, “পালাতে চেষ্টা করো না, যেখানে আছে, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাক।”
আজমীরের হুমকি ও তার সাথে সশস্ত্র সঙ্গীদের দেখে তরুণীর দলের লোকজন ঘাবড়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। ইতোমধ্যে আজমীরের সাথীরা তাদের ঘিরে ফেলল।
“আমাদেরকে তোমাদের আস্তানায় নিয়ে চল।” তরুণীর দলের লোক দুজনকে নির্দেশের স্বরে বলল আজমীর।
তারা আজমীরের কথার কিছুই বুঝতে পারেনি এমন হাবভাব দেখিয়ে কৌশলে নির্দেশটি এড়িয়ে যাওয়ার ফন্দী করল। কিন্তু আজমীর তাদের বলল, কোন ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিলে তোমাদের হত্যা করা হবে। যদি ভালো চাও, তবে আমার নির্দেশ মতো তোমাদের আস্তানায় নিয়ে যাও।
আজমীরের কাছে তাদের সব চক্রান্তের জাল ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তরুণীকে তাদের আঞ্চলিক ভাষায় গালমন্দ ও তিরস্কার করতে লাগল দুই পুরুষ। “হারামজাদী, তুই আমাদের সবকিছু প্রকাশ করে দিয়েছিস!”
ওদের কথাবার্তায় পাত্তা না দিয়ে আজমীর তরবারী কোষমুক্ত করে তাড়া দিয়ে বলল, বাঁচতে চাও তো আগে আগে আমাদের নিয়ে চলো।
আজমীরের নির্দেশে আগে আগে পথ দেখিয়ে ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আরো গহীন জঙ্গলের দিকে যেতে লাগল লোক দুজন। কিছুক্ষণ পর লোক দু’জন একটি টিলার উপরের দিকে চড়তে লাগল। ঘন গাছ গাছালী ও লতাগুল্মে আকীর্ণ জায়গাটিতে কোন জনমানুষের পা পড়েনি। অনেকক্ষণ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠার পরও পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানো গেল না। অনেকটা উপরে এসে দেখা গেল এ জায়গাটায় পাহাড় দেয়ালের মতো খাড়া। এ জায়গায় পাহাড়ের উপর শুকনো কাঠ দিয়ে তৈরী করা হয়েছে একটি ঝুপড়ী। ঝুপড়ীর কাছে বিশাল একটি শুকনো কাঠের স্তূপ। ঝুপড়ীর বাইরে লোকজনের কথাবার্তা শুনে ঝুপড়ী থেকে দুই তরুণী বেরিয়ে এলো। আজমীর উভয় তরুণীকে নদীতে জলকেলী করতে দেখেছিল। এরা বাইরে বেরিয়ে তাদের লোকজনকে ঘিরে রাখা সৈনিকদের দেখে ঘাবড়ে গেল।
